
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ- ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেছেন, ‘ছাত্রশিবির চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও দখলদারিত্বের পরিবর্তে সৃজনশীলতা ও জাতি গঠনের রাজনীতি করে।’
তিনি বলেন, ‘ইতিবাচক ও কল্যাণমুখী রাজনীতির মাধ্যমে ছাত্রশিবির একটি আদর্শ প্রজন্ম গড়ে তুলছে, যারা আগামী দিনে ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে নেতৃত্ব দেবে।’
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ২০২৭-এর নববর্ষের প্রকাশনা সামগ্রীর মোড়ক উন্মোচন ও প্রকাশনা উৎসবে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
সাদিক কায়েম বলেন, ‘এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্ল মার্ক্স, লেনিন কিংবা বস্তুবাদী দর্শন নিয়ে অবাধে কথা বলা গেলেও আল্লাহ ও রাসূল সা:-কে নিয়ে কথা বলার সুযোগ ছিল না। কোরআনের আসর করার কারণে শিক্ষার্থীদের নির্যাতন ও শোকজের মুখোমুখি হতে হতো। আজ তাদের উত্তরসূরিরাই এই বটতলায় প্রকাশ্যে উৎসব পালন করছেন।’
ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক আমিরুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন শিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ ও কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম বলেন, ‘ছাত্রশিবিরের নববর্ষের প্রকাশনাগুলো দীর্ঘ গবেষণা ও চিন্তার ফসল। বাংলাদেশের সমৃদ্ধি ও মুসলিম সালতানাতের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে এবারের প্রকাশনার থিম সাজানো হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা নান্দনিকতা, সৃজনশীলতা ও গবেষণাভিত্তিক সমাজ গঠনে বিশ্বাস করি। তরুণ প্রজন্মের নৈতিক অবক্ষয়, মাদকাসক্তি, কিশোর গ্যাং ও সামাজিক অবক্ষয়ের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তাদের নৈতিক ও আদর্শিকভাবে গড়ে তোলা জরুরি, ছাত্রশিবির সে চেষ্টাই করে যাচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘তরুণদের ব্যক্তিজীবন পরিশুদ্ধ করা এবং ইসলামের শিক্ষা ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে ছাত্রশিবির কাজ করে যাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রতি বছর গবেষণালব্ধ প্রকাশনা, বিভিন্ন সাময়িকী, বিজ্ঞান সাময়িকী ও ধর্মীয় বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেয়া হয়। নানা প্রতিকূলতা মাড়িয়ে এ বছরও ইসলামী ছাত্রশিবির সেই ধারা অব্যহত রেখেছে।’
শিবির সভাপতি বলেন, ‘আমাদের প্রকাশনাগুলো কেবল উপহারসামগ্রী বা বিনোদনের উপকরণ নয়; বরং এর মাধ্যমে ছাত্রসমাজ, পরিবার, অভিভাবক ও সুধীমহলের কাছে ইতিহাস, ঐতিহ্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও নৈতিকতার বার্তা পৌঁছে দিতে চাই। নতুন প্রজন্মের মধ্যে চিন্তা, গবেষণা ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটানোই আমাদের লক্ষ্য।’
ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ বলেন, ‘ছাত্রশিবিরের এই পথচলাকে বারবার থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে ছাত্রশিবির কখনোই কাউকে ভয় দেখিয়ে নিজেদের আদর্শের দিকে নিয়ে আসতে চায়নি; বরং শত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ছাত্রশিবির তার ক্রিয়েটিভিটি, সৌন্দর্য ও উৎকর্ষতা দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মন জয় করেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা জানি বিগত ১৬ বছর যে ফ্যাসিবাদী শাসন ছিল সেটা আমাদেরকে আধিপত্যবাদী শক্তির কাছে নতজানু করে রেখেছিল। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি, আমরা এই বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবো। ইসলামী ছাত্রশিবির সেজন্যই ক্যালেন্ডারে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, ইতিহা-ঐতিহ্য, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনাগুলোকে তুলে ধরেছে।’
কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ বলেন, ‘বিগত ১৬ বছরে ছাত্রশিবিরের গঠনমূলক কার্যক্রমগুলো শিক্ষার্থীদের মাঝে উপস্থাপনের সুযোগ দেয়া হয়নি। ছাত্রশিবির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে একটি সভ্যতা বিনির্মাণে কাজ করে যাচ্ছে। এ পথে অবিচল থাকতে গিয়ে তিন শতাধিক ভাইকে নির্মমভাবে শহীদ হতে হয়েছে।’
আয়োজনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় বায়তুলমাল সম্পাদক আনিসুর রহমান, কলেজ কার্যক্রম সম্পাদক হাফেজ ইউসুফ ইসলাহী, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক মো: ফখরুল ইসলাম, প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ, সমাজসেবা সম্পাদক ও রাকসু ভিপি মো: মোস্তাকুর রহমান জাহিদ, এইচআরডি সম্পাদক হেলাল উদ্দিন রুবেল, আইন সম্পাদক শামীম উদ্দীন, স্পোর্টস সম্পাদক মুশফিকুর রহমান, ছাত্র অধিকার সম্পাদক ও জকসু ভিপি রিয়াজুল ইসলামসহ সেক্রেটারিয়েট ও কার্যকরী পরিষদের সদস্যবৃন্দ ও ঢাকাস্থ বিভিন্ন শাখার দায়িত্বশীলবৃন্দ।
মোড়ক উন্মোচনের পর কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম, সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ ও ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েমসহ নেতৃবৃন্দ স্টলগুলো ঘুরে দেখেন।
ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম এসব প্রকাশনা সামগ্রী ছাত্রসমাজ ও সুধীমহলের কাছে পৌঁছে দিতে সংগঠনের সকল স্তরের জনশক্তির প্রতি আহ্বান জানান।
২০২৭ সালের নববর্ষ প্রকাশনায় মুসলিম ঐতিহ্য, ইতিহাস, সমাজ সচেতনতা ও ব্যবহারিক উপযোগিতার চমৎকার সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। এবারের প্রকাশনার তালিকায় রয়েছে নান্দনিক বাংলা ও ইংরেজি ডায়েরি, পকেট ও মাঝারি ডায়েরি, নোটবুক, ইয়ার প্লানার ও বৈচিত্র্যময় ক্যালেন্ডার।
বিশেষ করে বাংলা ডায়েরির প্রচ্ছদ টাঙ্গাইলের ঐতিহাসিক আতিয়া মসজিদের মুঘল স্থাপত্যশৈলীর টেরাকোটা অলঙ্করণের আদলে সাজানো হয়েছে। যেখানে শিক্ষার্থীদের ইতিহাস অনুরাগী করতে প্রতিদিনের বিশ্ব ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও সমকালীন বইয়ের পরিচিতি স্থান পেয়েছে।
পাশাপাশি ডেস্ক ক্যালেন্ডারে ইসলামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের সাক্ষী আয়া সোফিয়া, কর্ডোভা ও মসজিদে কুবাসহ ১২টি ঐতিহাসিক মসজিদের সচিত্র পরিচিতি তুলে ধরা হয়েছে।
এবারের প্রকাশনার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো গবেষণালব্ধ ‘তিন পাতা ক্যালেন্ডার’, যেখানে বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতি, সীমান্ত নিরাপত্তা, নদীর পানির হিস্যা, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব (সুনীল অর্থনীতি), মুসলিম পরিচয়ের শেকড় সন্ধান ও ডাটা সার্বভৌমত্বের মতো যুগোপযোগী ও জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হয়েছে।
এছাড়া শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন সময় ব্যবস্থাপনাকে আরো কার্যকর করতে প্রকাশনায় যুক্ত করা হয়েছে মাসিক ও দৈনিক রুটিন ছক সম্বলিত দৃষ্টিনন্দন ‘ইয়ার প্লানার’, আকর্ষণীয় লেদার ও জেল বাইন্ডিংয়ের ব্যবহারিক ডায়েরি ও সূরা ইব্রাহীমের আয়াতের ক্যালিগ্রাফি সম্বলিত এক পাতা ক্যালেন্ডার।
প্রকাশনা উৎসবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। অনেকে পরিবার-পরিজন নিয়েও উৎসবে অংশ নেন। তারা স্টল ঘুরে প্রকাশনাগুলো দেখেন। কেউ পছন্দের প্রকাশনা সামগ্রী কিনছিলেন, আবার কেউ প্রিয়জনকে উপহার দিচ্ছিলেন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








