
- প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে
- সর্বদলীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাবকে ইতিবাচক দেখছে সরকার
রোহিঙ্গা সঙ্কটের টেকসই সমাধানে মিয়ানমারে তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি নাগরিকত্ব, মানবাধিকার, শিক্ষা, জীবিকা ও সম্পত্তির অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সম্পৃক্ততা, মিয়ানমারের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সাথে সমন্বিত আলোচনা এবং বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ ও বাস্তবতা বিবেচনায় একটি জাতীয় শরণার্থী নীতি প্রণয়ন জরুরি। একই সাথে সঙ্কট মোকাবেলায় জাতীয় ঐকমত্য ও সর্বদলীয় উদ্যোগকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
গতকাল রোববার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে নীতি গবেষণা কেন্দ্র আয়োজিত ‘রোহিঙ্গা সঙ্কট : বর্তমান বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় সরকারের নীতিগত অবস্থান ও বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নে এসব বিষয় উঠে আসে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান বলেন, রোহিঙ্গা সঙ্কটকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার নিছক দ্বিপক্ষীয় সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মিয়ানমার থেকে সৃষ্ট একটি সঙ্কট। এর সমাধানে আন্তর্জাতিক মহলের সক্রিয় সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদ এবং জাতিসঙ্ঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) সাথে বৈঠকেও বাংলাদেশ এ অবস্থান তুলে ধরেছে।
তিনি বলেন, শুধু রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে পাঠিয়ে দিলেই প্রত্যাবাসন সম্পন্ন হবে না। সেখানে তাদের নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, মানবাধিকার, শিক্ষা, মর্যাদা ও সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। প্রত্যাবাসন হতে হবে স্বেচ্ছামূলক, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ। এসব অধিকার নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকরভাবে যুক্ত থাকতে হবে।
আইনমন্ত্রী জানান, রোহিঙ্গা সঙ্কট মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কীভাবে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া যায়, কমিটি তা বিবেচনা করবে। রোহিঙ্গাদের শিক্ষা, কাজ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার দাবি যৌক্তিক হলেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সামাজিক বাস্তবতা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। নীতি গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ সরকার গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবে বলেও তিনি জানান।
আলোচনায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধভাবে ‘এক বাংলাদেশ’ হিসেবে বিশ্বের সাথে কথা বলতে পারলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান, দরকষাকষি ও সংলাপের সক্ষমতা আরো শক্তিশালী হবে। সর্বদলীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাবকে সরকার ইতিবাচকভাবে দেখছে। রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ভালো পরামর্শ গ্রহণে সরকার প্রস্তুত।
তিনি বলেন, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসতে শুরু করলে তৎকালীন সরকার প্রথম দিকে তাদের প্রবেশ করতে দিতে চায়নি। পরে মানবিক কারণে আশ্রয় দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে তখনই বলা হয়েছিল, এটি স্থায়ী নয়, সাময়িক ব্যবস্থা। তার মতে, নির্বাচিত ও রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী সরকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক পরিসরে দরকষাকষি এবং চীন, ভারত, মিয়ানমারসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সাথে কার্যকর আলোচনা করা সহজ হয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকারের উদ্যোগে গঠিত জাতীয় কমিটির আওতায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মিয়ানমার সরকারের সাথে আলোচনা চালাচ্ছে। একই সাথে আরাকান আর্মির সাথেও যোগাযোগ স্থাপন করা হয়েছে। কারণ, মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু প্রচলিত কূটনৈতিক চ্যানেলে সমস্যার সমাধান হবে- এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল। তাই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ওপর সমন্বিত আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির প্রয়োজন রয়েছে।
প্রত্যাবাসন কৌশলের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে শামা ওবায়েদ বলেন, প্রথমত, গ্রহণযোগ্য প্রত্যাবাসন কাঠামো তৈরি করতে হবে। জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া দ্রুত করতে হবে এবং প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশের ন্যূনতম শর্ত নির্ধারণ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সমন্বিত কূটনৈতিক রোডম্যাপ প্রয়োজন। মিয়ানমারের সাথে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি জাতিসঙ্ঘ, আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক শক্তি ও প্রভাবশালী অংশীদারদের সক্রিয় করতে হবে। রাখাইনে নিরাপত্তা ও আস্থার পরিবেশ তৈরিতে মিয়ানমারকে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে চাপ দিতে হবে।
তৃতীয়ত, আশ্রিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এবং তাদের আশ্রয় দেয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে। ক্যাম্পে নারী, শিশু ও তরুণ-তরুণীদের স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষার জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক সহনশীলতা বজায় রাখতে হবে। মাদক ও মানবপাচারসহ আন্তঃসীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধে জবাবদিহিমূলক আইন প্রয়োগ, সামাজিক সম্পৃক্ততা এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা জরুরি। পঞ্চমত, গণহত্যা ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। রাখাইনে আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রত্যাবাসনের অন্যতম পূর্বশর্ত।
জাতীয় শরণার্থী নীতির প্রয়োজন
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নীতি গবেষণা কেন্দ্রের উপদেষ্টা ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ সুফিউর রহমান। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সঙ্কটকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরা এবং আন্তর্জাতিক বিচারপ্রক্রিয়ায় বিষয়টি নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সাফল্য রয়েছে। ২০১৭-১৮ সালে মিয়ানমারের সাথে প্রত্যাবাসনসংক্রান্ত সমঝোতা এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) গাম্বিয়ার করা মামলায় বাংলাদেশের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
তবে চুক্তি বা সমঝোতা হলেই তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত হয় না। ২০২৪ সাল পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসঙ্ঘের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনার (জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান-জেআরপি) অর্থায়ন তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক ছিল। অন্য শরণার্থী পরিস্থিতিতে প্রতিশ্রুত অর্থের প্রায় ৫০ শতাংশ পাওয়া গেলেও রোহিঙ্গা সঙ্কটে অর্থায়নের হার ৬৫ থেকে ৭৫ শতাংশে পৌঁছেছিল। কিন্তু বর্তমানে অর্থায়নের ঘাটতি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমন্বয়হীনতা সঙ্কটকে আরো জটিল করছে।
সুফিউর রহমান বলেন, চীনকে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সহায়ক হিসেবে যুক্ত করা হলেও দেশটির কাছ থেকে বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট প্রত্যাশা এবং ব্যর্থতার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য পরিণতি স্পষ্ট করা হয়নি। গত কয়েক বছরে এ উদ্যোগে দৃশ্যমান অগ্রগতিও নেই। একইভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ভারতের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে দিল্লিকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে যথেষ্ট চাপ দেয়া হয়নি। আসিয়ানের সাথেও বাংলাদেশের সম্পৃক্ততায় ঘাটতি ছিল।
ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের উদ্যোগকে তিনি বাংলাদেশের জন্য একটি কূটনৈতিক দুর্বলতা হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, এ উদ্যোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল, যা সঙ্কট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের অবস্থান কিছুটা দুর্বল করেছে।
তিনি আরো বলেন, রোহিঙ্গাদের নিজেদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব ও প্রতিনিধিত্বশীল কণ্ঠস্বর গড়ে তোলা জরুরি। মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের পর ক্যাম্পভিত্তিক নেতৃত্বের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে নারী ও তরুণদের প্রত্যাশা, মতামত ও অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের সমর্থন ছাড়া টেকসই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া গড়ে তোলা কঠিন।
রাখাইনের সমস্যার সমাধান বাংলাদেশে সম্ভব নয়; সমাধান খুঁজতে হবে রাখাইনেই। সেখানে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আলোচনার আওতায় আনতে হবে। প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কীভাবে নির্ধারিত হবে, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে স্পষ্ট ধারণা তৈরি করতে হবে।
নাগরিকত্বের প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থান দাবি
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ইসরাত জাকিয়া সুলতানা বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবর্তনের সর্বজনস্বীকৃত প্রতিষ্ঠিত উদাহরণ পাওয়া কঠিন। তাই শুধু প্রত্যাবাসনের আশায় শিবিরে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার, শিক্ষা ও জীবিকার সুযোগ সীমিত রাখা গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, ২০১৭ সালে চার বছর বয়সে বাংলাদেশে আসা একটি শিশু ২০২৬ সালে প্রায় ১৩ বছর বয়সে পৌঁছেছে। দীর্ঘদিন ক্যাম্পে বেড়ে ওঠা এ প্রজন্মের একটি অংশ শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এতে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি মাদকসহ বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। ক্যাম্পের মানবিক পরিস্থিতি ও তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।
তার মতে, ২০১৭-১৮ সালে মিয়ানমারের সাথে প্রত্যাবাসনসংক্রান্ত যেসব দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছিল, সেগুলো আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি নয়, বরং ‘অ্যারেঞ্জমেন্ট’। এর আইনি বাধ্যবাধকতা আনুষ্ঠানিক চুক্তির তুলনায় ভিন্ন এবং বাস্তবায়ন অনেকাংশে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। তাই বিদ্যমান দলিল পর্যালোচনা করে বর্তমান বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কার্যকর চুক্তি প্রয়োজন।
তিনি রোহিঙ্গাদের পরিচয় ও নাগরিকত্বের প্রশ্নে বাংলাদেশের জোরালো অবস্থান নেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, মিয়ানমার পরিচয় যাচাইয়ের নামে বিভিন্ন তালিকা দিলেও তাদের মৌলিক পরিচয় ও নাগরিকত্বের প্রশ্নের সমাধান করছে না। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয়ের স্বীকৃতি এবং ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন সংশোধনের দাবি জোরালোভাবে তোলা উচিত। অন্যথায় প্রত্যাবাসনের পরও তাদের পরিচয় ও নাগরিকত্বের সঙ্কট থেকে যেতে পারে।
নিজের গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা পরিচয় গোপন করে বা বিকল্প পরিচয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন-এমন ৩৮ জনের তথ্য তার কাছে রয়েছে। প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। সম্প্রতি একজন রোহিঙ্গা তরুণ ইতালিতে স্নাতকোত্তর পড়তে গেছেন বলেও তিনি জানান। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, রোহিঙ্গাদের মধ্যে শিক্ষার আকাক্সক্ষা ও সক্ষমতা রয়েছে। প্রয়োজন বৈধ ও নিয়ন্ত্রিত সুযোগ তৈরি করা।
তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশন ও ১৯৬৭ সালের প্রটোকলে স্বাক্ষরকারী না হলেও নিজস্ব বাস্তবতা ও জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় জাতীয় শরণার্থী আইন ও নীতি প্রণয়ন করতে পারে। এতদিন তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সঙ্কট মোকাবেলার চেষ্টা করায় দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আসেনি।
নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রশ্ন
আলোচনায় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতকে পাঁচবার রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে সহায়তার অনুরোধ জানানো হলেও কার্যকর ফল পাওয়া যায়নি। বরং ভারত থেকে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। সঙ্কট সমাধানে কৌশলগত পদক্ষেপ এবং আরাকান আর্মির সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। চীন ও মিয়ানমারের সাথে অর্থনৈতিক করিডোর চালুর বিষয়টিও বিবেচনায় নেয়ার পরামর্শ দেন।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) হাসান মো: সামসুদ্দীন বলেন, রোহিঙ্গা সঙ্কট মোকাবেলায় কূটনীতির পাশাপাশি প্রতিরোধক্ষমতা প্রদর্শন প্রয়োজন। রোহিঙ্গাদের মানবসম্পদে পরিণত করতে না পারলে ভবিষ্যতে রাখাইনে ফিরে গিয়ে তাদের টিকে থাকা কঠিন হবে। তাদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যা বেশি হওয়ায় আর্থসামাজিক ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) মুহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক- সব দিক থেকে শক্তিশালী ভূমিকা নিতে না পারায় সঙ্কট দিন দিন জটিল হচ্ছে। কূটনৈতিক উদ্যোগ শক্তিশালী করার পাশাপাশি গ্রহণযোগ্য প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের চেয়ারম্যান মো: নুরুল ইসলাম বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের হত্যা-নির্যাতনের জন্য কাউকে জবাবদিহি করতে হচ্ছে না। প্রায় ৮০ শতাংশ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। তাদের আরাকানে ফিরে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করতে রাজনৈতিক ঐক্য ও আন্তর্জাতিক চাপ জরুরি।
সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বোঝাতে হবে, রোহিঙ্গা সঙ্কট দীর্ঘায়িত হলে শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো অঞ্চলই মানবপাচার, মাদকপাচার ও অন্যান্য অপরাধের ঝুঁকিতে পড়বে। রোহিঙ্গা শিশুদের মিয়ানমারের শিক্ষাক্রম অনুযায়ী শিক্ষা দেয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা উচিত, যাতে তারা দেশে ফিরে মানবসম্পদ হিসেবে কাজে লাগতে পারে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি সাইফুল হক বলেন, এ সঙ্কটের কোনো সামরিক সমাধান নেই; রাজনৈতিক সমাধানই একমাত্র পথ। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের নেতা ড. মুশতাক হোসেন এবং এনসিপি নেতা ফরিদুল হকও রোহিঙ্গা সঙ্কট মোকাবেলায় রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ অবস্থান ও আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির পক্ষে মত দেন।
মানবিক সহায়তায় অর্থায়ন ঘাটতি বাড়ছে
আইনমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী উভয়েই জানান, দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার অবস্থানের কারণে কক্সবাজারসহ স্থানীয় জনগোষ্ঠী গুরুতর অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপে রয়েছে। ক্যাম্পে প্রতিদিন প্রায় ৮২ থেকে ৯০টি শিশুর জন্ম হচ্ছে। পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠছে। সীমান্ত এলাকায় মাদক ও মানবপাচার, ক্যাম্পে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যাও জাতীয় নিরাপত্তার উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
নীতি গবেষণা কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক ড. শাকিল আহমেদ বলেন, আলোচনা সভার সুপারিশগুলোকে নীতিগত প্রস্তাব ও পলিসি ব্রিফে রূপ দিয়ে সরকারের কাছে উপস্থাপন করাই এ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য। রোহিঙ্গাদের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশা শুনে তাদের পরিচয় গোপন রেখে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তুলে ধরার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সব মিলিয়ে আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে, রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধান কেবল মানবিক সহায়তা কিংবা দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। প্রত্যাবাসনের বাস্তব পরিবেশ তৈরি, নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণ, আন্তর্জাতিক বিচার ও জবাবদিহি, আঞ্চলিক সহযোগিতা, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় শরণার্থী নীতি- সব কিছুকে সমন্বিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ঐকমত্য ও আন্তর্জাতিক চাপকে কার্যকর কৌশলে রূপ দিতে না পারলে সঙ্কটের দীর্ঘস্থায়িত্ব বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজ ও নিরাপত্তার ওপর আরো বড় বোঝা হয়ে উঠতে পারে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








