
নিজস্ব প্রতিবেদক
গ্রাম পুলিশ সদস্যদের বেতন-ভাতা, অবসরকালীন আর্থিক সুবিধা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সাথে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে নতুন করে দু’জন নারী গ্রাম পুলিশ নিয়োগ, নারী সদস্যদের ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং মোবাইল ফোন ব্যবহারের জন্য মাসিক ভাতা দেয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন তিনি।
গতকাল শনিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে গ্রাম পুলিশ সদস্যদের জাতীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব ঘোষণা দেন।
প্রধানমন্ত্রী জানান, একজন গ্রাম পুলিশের মাসিক বেতন সাত হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার ৫০০ টাকা এবং গ্রাম পুলিশ প্রধানের বেতন আট হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১ হাজার টাকা করা হয়েছে।
অবসরকালীন আনুতোষিকও বাড়ানো হয়েছে। এখন থেকে একজন গ্রাম পুলিশ সদস্য অবসরে গেলে ৮০ হাজার টাকা পাবেন। আগে এ পরিমাণ ছিল ৭০ হাজার টাকা। অন্য দিকে গ্রাম পুলিশ প্রধানের অবসরকালীন আনুতোষিক ৮০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ টাকা করা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রত্যেক গ্রাম পুলিশ সদস্যকে মোবাইল ফোনের খরচ বাবদ মাসে ১৫০ টাকা দেয়া হবে। স্থানীয় থানায় সাপ্তাহিক হাজিরার জন্য যাতায়াত ও সংশ্লিষ্ট ব্যয় নির্বাহে সদস্যদের ভাতা ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ টাকা এবং গ্রাম পুলিশ প্রধানদের ক্ষেত্রে ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নারীর কর্মসংস্থান ও ক্ষমতায়ন বাড়াতে প্রতিটি ইউনিয়নে আরো দু’জন নারী গ্রাম পুলিশ নিয়োগের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। নারী সদস্যদের জন্য ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটিও চালু করা হবে।
গ্রাম পুলিশের পদবিতে পরিবর্তনের কথা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, এত দিন প্রচলিত ‘দফাদার’ পদবি পরিবর্তন করে ‘গ্রাম পুলিশ প্রধান’ এবং ‘মহল্লাদার’ পদবি পরিবর্তন করে ‘গ্রাম পুলিশ’ করা হয়েছে।
গ্রাম পুলিশ সদস্য ও তাদের পরিবারের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তাদের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই সরকার এসব উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকার ১৯৯৫ সালে গ্রাম পুলিশ সদস্যদের জন্য ঈদ বোনাস চালু করেছিল। গ্রাম পুলিশের মর্যাদা ও সামাজিক স্বীকৃতি বাড়াতে প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে সড়কের নাম ‘গ্রাম পুলিশ সড়ক’ রাখার পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। এসব সড়কের পাশে গাছ লাগানো হবে। গাছের নিচে উৎপন্ন ঘাস বিক্রির উপযোগী হলে তা থেকে অর্জিত অর্থ সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বণ্টন করা হবে।
গ্রাম পুলিশ সদস্যদের বাইসাইকেল সরবরাহের সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন থেকে সাড়ে তিন বছর করার বিষয়টি বিবেচনা করতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
অপরাধ দমনে আগাম তথ্য দেয়ার আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গ্রাম পুলিশ সদস্যরা সাধারণ মানুষের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত থাকায় নিজ নিজ এলাকার অপরাধ, অপরাধমূলক তৎপরতা এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি সম্পর্কে অনেক সময় সবার আগে তথ্য পান। এসব তথ্য যথাসময়ে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাতে পারলে অপরাধ প্রতিরোধ এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
তিনি বলেন, ‘দেশের প্রতিটি গ্রাম ও প্রতিটি ইউনিয়ন নিরাপদ থাকলে বাংলাদেশও নিরাপদ থাকবে।’
তারেক রহমান বলেন, দেশের বেশির ভাগ মানুষের শিকড় গ্রামীণ জীবনে। বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি গ্রামের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। তাই উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে গ্রামীণ জনপদে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। তিনি বলেন, অপরাধ কমাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর ভূমিকার পাশাপাশি সামাজিক মূল্যবোধ, সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহমর্মিতা ফিরিয়ে আনতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী গ্রাম পুলিশ সদস্যদের নিরপেক্ষতা ও জনবান্ধব মনোভাব নিয়ে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন, দায়িত্বশীল গ্রাম পুলিশ সদস্য এবং সচেতন নাগরিকদের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন জরুরি পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে গ্রাম পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালনেরও প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী।
পরিচ্ছন্নতা ও বৃক্ষরোপণে গুরুত্ব
নিজ নিজ এলাকার বাড়িঘর, বাজার, সড়ক ও খালপাড় পরিচ্ছন্ন রাখা এবং যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা বন্ধে ভূমিকা রাখার জন্য গ্রাম পুলিশ সদস্যদের নির্দেশ দেন তারেক রহমান। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবুজ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে নিজেরা গাছ লাগানো এবং অন্যদেরও বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করার আহ্বান জানান তিনি।
সমাবেশে দেশের আট বিভাগের আটজন সেরা গ্রাম পুলিশ সদস্যের হাতে সম্মাননা স্মারক ও পুরস্কারের অর্থ তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব মো: শহীদুল হাসান বক্তব্য দেন। প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ও জিয়া রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, সেনাপ্রধান, বিমানবাহিনী প্রধানসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে প্রায় ৪১ হাজার গ্রাম পুলিশ সদস্য এ সমাবেশে যোগ দেন। তাদের ব্যাপক উপস্থিতিতে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে বড় ধরনের জনসমাগম ঘটে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








