হৃদয়ের ডাবলে এগিয়ে বাংলাদেশ
হৃদয়ের ডাবলে এগিয়ে বাংলাদেশ।

ক্রীড়া প্রতিবেদক

Advertisement

সিলেট টেস্টের গল্পটা যখন বাংলাদেশের জন্য হতাশার দিকে এগোচ্ছিল, তখন একাই চিত্রনাট্য বদলে দিলেন তৌহিদ হৃদয়! একের পর এক সতীর্থের বিদায়, স্কোরবোর্ডে বড় ব্যবধানের চাপ আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের আধিপত্য- সবকিছুর বিপরীতে এক প্রান্তে অবিচল ছিলেন তিনি। তার ব্যাটেই তৈরি হলো এমন এক ইনিংস, যা শুধু বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসে লিড এনে দেয়নি, বদলে দিয়েছে ম্যাচের গতিপথও!
১৩৮ রানে পাঁচ উইকেট হারিয়ে যখন ধুঁকছিল বাংলাদেশ, তখন ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা ছিল ক্ষীণ। ১৮৪ রানে সপ্তম উইকেটের পতনের পর পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে ওঠে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৩৫৬ রানের সংগ্রহ পেরোতে তখনো অনেক পথ বাকি। কিন্তু হৃদয় যেন পণ করেছেন, লড়াইটা শেষ না করে মাঠ ছাড়বেন না।
শেষ পর্যন্ত সেটিই করে দেখালেন এই ডান হাতি ব্যাটার। ৩৫৯ বলের ধৈর্যশীল ও আক্রমণাত্মক ইনিংসে ২৪২ রান করে অপরাজিত থাকলেন। তার ব্যাটে ভর করেই গতকাল সিলেট টেস্টে ১১১.৫ ওভারে ৩৮৬ রান তুলে প্রথম ইনিংস শেষ করে বাংলাদেশ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের চেয়ে ৩০ রান বেশি করে স্বাগতিকদের সংগ্রহে যোগ হলো মূল্যবান এক লিড। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে দিনের শেষ চার ওভারে সাত রান তুলেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। কোনো উইকেট হারায়নি তারা। ব্র্যান্ডন কিং ৫ এবং জশুয়া দা সিলভা দুই রানে অপরাজিত থেকে চতুর্থ দিনের অপেক্ষায়। ফলে এখনো ২৩ রানে পিছিয়ে রয়েছে ক্যারিবীয়রা।
হৃদয়ের এই ইনিংসের মাহাত্ম্য বুঝতে হলে বাংলাদেশের অন্য ব্যাটারদের দিকে তাকালেই যথেষ্ট। দলের আর কেউ ৩৫ রানের ঘরও ছুঁতে পারেননি। মুশফিকুর রহীমের ব্যাট থেকে এসেছে ৩৪ রান। তাইজুল ইসলাম করেছেন ২২। নাজমুল হোসেন শান্তর ১৮ রানের পাশাপাশি মেহেদী হাসান মিরাজ ও তানজিদ হাসান করেছেন ১৬ রান করে। দলের অন্য ব্যাটারদের অবদান ১৪৪ রান, আর এক হৃদয় একাই করেছেন ২৪২। টেস্টে এটি বাংলাদেশের কারো সর্বোচ্চ স্কোর। আগের সর্বোচ্চ ছিল মুশফিকের ২১৯, যা ২০১৮-তে করেছিলেন জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে।
তৃতীয় দিনের শুরুতে অবশ্য হৃদয়ের পথটা এতটা মসৃণ ছিল না। আগের দিনের তিন উইকেটে ৮৮ রান নিয়ে ব্যাটিং শুরু করা বাংলাদেশকে প্রথম ধাক্কা দেন জোমেল ওয়ারিকান। তার বলে অপ্রয়োজনীয় শট খেলতে গিয়ে শর্ট কাভারে ক্যাচ তুলে দেন মুশফিক। ৩৪ রানে থামেন তিনি। হৃদয়ের সাথে ৭৩ রানের জুটি গড়লেও তার বিদায়ে কিছুটা চাপে পড়ে দল।
এরপর লিটন দাসের কাছ থেকে বড় ইনিংসের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের চেষ্টা শেষ পর্যন্ত কাল হয়ে দাঁড়ায়। ওয়ারিকানের ফুল লেংথের বলে ড্রাইভ করতে গিয়ে কাভারে ক্যাচ দেন তিনি। এরপর হৃদয়ের সাথে ৪১ রানের জুটি গড়ে বিদায় নেন মিরাজ। রোস্টন চেজের বলে প্যাডেল শট খেলতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দেন এই অলরাউন্ডার। একই বোলারের পরের আঘাতে সাজঘরে ফেরেন হাসান মাহমুদও।
১৮৪ রানে সাত উইকেট হারানোর পর বাংলাদেশের সামনে বড় ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা। ঠিক সেই জায়গা থেকেই শুরু হৃদয়ের নতুন লড়াই। অষ্টম উইকেটে তাইজুল ইসলামকে নিয়ে ১১৭ রানের জুটি গড়ে ম্যাচে ফেরার ভিত্তি তৈরি করেন তিনি। তাইজুল ৫৬ বলে ২২ রান করে বিদায় নিলেও তার সঙ্গ হৃদয়ের জন্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এখানেই থামেননি হৃদয়। তাসকিন আহমেদকে নিয়ে আরো ৮৫ রান যোগ করেন তিনি। এই জুটিতেই নিজের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিকে রূপ দেন ডাবল সেঞ্চুরিতে। ৩০৪ বলে ২০০ ছোঁয়ার পরও থামেনি তার ব্যাট। শেষ পর্যন্ত ২৪২ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন তিনি। ফিল্ডিংয়ের সময় চোট পাওয়ায় সাদমান ইসলাম ব্যাটিংয়ে নামতে না পারায় নবম উইকেটের পতনেই শেষ হয় বাংলাদেশের ইনিংস। ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে বল হাতে সফল ওয়ারিকান। ১০৪ রান দিয়ে চার উইকেট নেন তিনি। দু’টি করে উইকেট পান জেডেন সিলস। তবে বোলারদের সব প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত মøান করে দেন হৃদয়। ক্যারিবিয়ারের তৃতীয় টেস্ট খেলা হৃদরের আগের চার ইনিংসে মোট  রান ছিল ৫৪। ছিল না কোনো ছক্কা কাল ১১টি চক্কা হাঁকান- যা টেস্ট বাংলাদেশী কোনো ব্যটারের সর্বাধিক- এ দিন চারও হাঁকান ২২টি।
দিনের শুরুতে দু’টি রিভিউ হারানো বাংলাদেশের সামনে এখন নতুন চ্যালেঞ্জ। সিলেটের উইকেট এখনো ব্যাটিংয়ের জন্য বেশ ভালো। তাই চতুর্থ দিনে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে অল্প রানে আটকে রাখতে না পারলে হৃদয়ের অসাধারণ ইনিংসের পরও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত, তৃতীয় দিনের শেষে সিলেট টেস্টে বাংলাদেশ আর কেবল টিকে থাকার লড়াইয়ে নেই। ১৩৮ রানে পাঁচ উইকেট হারানো দলটি এখন এগিয়ে। আর এই নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের কেন্দ্রে একজনই- তৌহিদ হৃদয়। তার ২৪২ রানের ইনিংস বাংলাদেশকে শুধু লিডই দেয়নি, ম্যাচে জয়ের স্বপ্ন দেখার সাহসও ফিরিয়ে দিয়েছে। 
সংক্ষিপ্ত স্কোর : তৃতীয় দিন
ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১ম ইনিংস : ৩৫৬/১০ 
বাংলাদেশ ১ম ইনিংস : ১১১.৫ ওভারে ৩৮৬/১০ (হৃদয় ২৪২*, মুশফিক ৩৪, তাইজুল ২২, নাজমুল ১৮, মিরাজ ১৬, তানজিদ ১৬, তাসকিন ১২, লিটন ৮, ওয়ারিক্যান ৪/১০৪, সিলস ২/৫৮, চেজ ১/৬৬, জোসেফ ১/৮২, গ্রিভস ১/১০)।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২য় ইনিংস : ৪ ওভারে ৭/০ (কিং ৫*, সিলভা ২*; তাসকিন ০/৭, হাসান ০/০, তাইজুল ০/০)।