
কূটনৈতিক প্রতিবেদক
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির খারাপ ফলাফল ইরানের জন্য কূটনৈতিকভাবে ইতিবাচক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সমঝোতায় পৌঁছাতে ইরান আগের চেয়ে বেশি ইতিবাচক অবস্থান নিতে পারে। একই সাথে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দুই দেশের বিরোধ অব্যাহত থাকবে। কারণ এই কর্মসূচি চালিয়ে যেতে ইরান শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করবে।
এমন মন্তব্য করেছেন ওয়াশিংটনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) প্রেসিডেন্ট হুমায়ুন কবির। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক, ট্রাম্পের অভিবাসননীতি, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সম্পর্ক এবং ইসরাইলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। নিচে বিস্তারিত-
নয়া দিগন্ত : যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি প্রত্যাশার তুলনায় খারাপ ফল করেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বিশেষ করে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ওপর এর কী প্রভাব পড়তে পারে?
হুমায়ুন কবির : ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে ধ্বংস করার জন্য ইরানের যে লক্ষ্য ছিল, তা অনেকটাই পূরণ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের দল খারাপ করেছে। ফলে এখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে ইরান আগের চেয়ে বেশি ইতিবাচক অবস্থান নিতে পারে। সেই বিবেচনায় দুই পক্ষই যুদ্ধ বন্ধ করে হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়ার জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারে।
তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিরোধ থেকেই যাবে। কারণ, ইরান এই কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার জন্য শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করবে। ফলে যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ নেয়া হলেও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা সহজ হবে না।
নয়া দিগন্ত : সামরিক দিক থেকে ইরানের শক্তিমত্তা মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে কী ধরনের পরিবর্তন আনছে?
হুমায়ুন কবির : সামরিক দিক থেকে ইরানের উত্থান উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত (জিসিসি) রাষ্ট্রগুলোকে ভীত করছে। সৌদি আরবসহ জিসিসিভুক্ত দেশগুলো চাইবে, যুক্তরাষ্ট্র কোনো না কোনোভাবে তাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিক এবং ওই অঞ্চলে তার উপস্থিতি বজায় রাখুক। অন্য দিকে ইরান চায়, যুক্তরাষ্ট্র যেন ওই অঞ্চল থেকে বেরিয়ে যায়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক টানাপড়েনের মধ্যেই থাকবে। আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা ও উপসাগরীয় দেশগুলোর স্বার্থ এই দ্বন্দ্বকে আরো জটিল করে তুলবে।
নয়া দিগন্ত : যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল বাংলাদেশের সাথে দেশটির কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারে কি?
হুমায়ুন কবির : এ ধরনের প্রভাব পড়ার খুব বেশি সম্ভাবনা নেই। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে একটি বাণিজ্য চুক্তি সই করেছে। ফলে চুক্তির শর্ত ও বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে হবে।
তবে কংগ্রেস শুল্কনীতি পর্যালোচনা করতে পারে। সেই পর্যালোচনার পর নতুন কোনো আইন হলে বাংলাদেশের জন্য একটি সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের কারণে শুল্কের ক্ষেত্রে আমরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো সুবিধা পাব বলে মনে করছি না।
নয়া দিগন্ত : দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেয়ার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কঠোর অভিবাসননীতি অনুসরণ করছেন। মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল কি এ নীতিতে পরিবর্তন আনতে পারে?
হুমায়ুন কবির : ট্রাম্পের আগ্রাসী অভিবাসননীতির কারণে যেসব হতাহতের ঘটনা ও অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, নতুন কংগ্রেস চাইলে সেগুলো নিয়ে তদন্ত করতে পারে। এ নীতিতে মধ্যপন্থা গ্রহণের জন্য প্রেসিডেন্টের ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বাংলাদেশীসহ অন্যান্য দেশের বৈধ কাগজপত্রহীন কিছু মানুষ কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন।
তবে এখানে চিন্তার বিষয়ও রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গতকাল স্টিফেন মিলারকে হোয়াইট হাউজের চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। তিনি কঠোর অভিবাসননীতির অন্যতম রূপকার হিসেবে পরিচিত। এর আগে মিলার হোয়াইট হাউজের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি তিনি প্রেসিডেন্টের দীর্ঘদিনের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা এবং অভ্যন্তরীণ নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
তবে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে বিরোধী ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ট্রাম্পের আগ্রাসী অভিবাসননীতিতে কিছুটা ভারসাম্য আসতে পারে। জানুয়ারির আগে এইচ-১বি ভিসাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। তবে নতুন নির্বাচিত কংগ্রেস সদস্যরা দায়িত্ব নেয়ার পর নীতিগুলো পর্যালোচনার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইস) দেশব্যাপী অভিযানের কারণে যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছিল, তা থেকেও কিছুটা পরিত্রাণ পাওয়া যেতে পারে।
নয়া দিগন্ত : মধ্যবর্তী নির্বাচনে মার্কিন নাগরিকদের কাছ থেকে পাওয়া বার্তা ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলবে?
হুমায়ুন কবির : মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ভালো ফল করেছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ যেসব বিষয়ে পরিবর্তন প্রত্যাশা করছে, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য তারা ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কংগ্রেস সদস্য ও গভর্নরদের নির্বাচিত করেছে।
ডেমোক্র্যাটরা যদি জনগণের সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে, তাহলে সদ্য সমাপ্ত মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল থেকে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তারা সুফল পেতে পারে।
গত ১০ বছর রিপাবলিকান পার্টি মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়েছে। ট্রাম্পের কট্টর সমর্থকেরা ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা ‘মাগা’ নামে পরিচিত। কিন্তু মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির যেসব প্রার্থী জয়লাভ করেছেন, তাদের বেশির ভাগই নন-মাগা। অর্থাৎ তারা তুলনামূলক কম রক্ষণশীল। সামনের দিনগুলোতে মাগা ও নন-মাগা গোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ দেখা দিতে পারে। ট্রাম্পের কট্টরপন্থী নীতির বাইরে গিয়ে রিপাবলিকান পার্টি যদি নিজস্ব রাজনৈতিক ধারায় ফিরে আসতে পারে, তাহলে ২০২৮ সালের নির্বাচনে দলটি শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারবে।
নয়া দিগন্ত : ইসরাইলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আগামী সরকার গঠনের ক্ষেত্রে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের অবস্থানকে কিভাবে দেখছেন?
হুমায়ুন কবির : প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এবং সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের অবস্থান এখন শক্তিশালী হচ্ছে। কারণ, আরব দলগুলো তাকে সমর্থন দিয়েছে। আমার ধারণা, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আইজেনকট সরকার গঠন করতে পারেন এবং নেতানিয়াহু সরকারের পতন হতে পারে।
এই মুহূর্তে আরব দলগুলো নেতানিয়াহুর পতন চায়। পরবর্তী সময়ে তাদের দাবিগুলো নিয়ে আইজেনকট সরকারের সাথে দর-কষাকষির সুযোগ সৃষ্টি হবে।
নয়া দিগন্ত : ইসরাইলের আরব নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলোর এই সমর্থনের গুরুত্ব কতটা?
হুমায়ুন কবির : আরব নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলো ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্ব করে। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ এই জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।
সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেটে ১২০টি আসনের মধ্যে আরব নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলো ১৯টি আসন পেয়েছে। এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। এখন সরকার গঠনের জন্য নেতানিয়াহু ও আইজেনকট- উভয়েরই তাদের সমর্থন প্রয়োজন। ফলে ইসরাইলের রাজনীতিতে আরব দলগুলোর দর-কষাকষির ক্ষমতা আগের চেয়ে বেড়েছে। নতুন সরকার গঠনের ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








