‘থ্রিএফফোরডি’ পদ্ধতি উদ্ভাবন নিরাপদ চাল উৎপাদনে
নিরাপদ ধান উৎপাদনের মাঠ পরীক্ষা করছেন কৃষি কর্মকর্তারা : নয়া দিগন্ত।

এম এ রহিম চৌগাছা (যশোর)
যশোরের চৌগাছা উপজেলায় ভূগর্ভের পানিতে আর্সেনিকের ভয়াবহতা ও উচ্চমাত্রার উপস্থিতির পাশাপাশি এবার উৎপাদিত ধান ও চালেও সহনশীল মাত্রার চেয়ে অধিক পরিমাণে আর্সেনিকের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। নিরাপদ ধান উৎপাদন ও চালে আর্সেনিক প্রতিরোধে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) ‘নিরাপদ ও পুষ্টিকর ধান (সানরাইজ)’ প্রকল্পের অধীনে ‘থ্রিএফফোরডি’ (তিন দিন জমি ভেজানো, চার দিন জমি শুকানো) পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে।
মারাত্মক এ ঝুঁকি থেকে উত্তরণে জাপানের জাইকা ও জেএসটির কারিগরি এবং আর্থিক সহায়তায় বেসরকারি সংস্থা ‘এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্ক’ সেচ পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিরাপদ ধান উৎপাদনে বিভিন্ন কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানবদেহের জন্য পানিতে আর্সেনিকের সর্বোচ্চ সহনীয় মাত্রা প্রতি লিটারে ০.০১ মিলিগ্রাম এবং বাংলাদেশে সরকারি মানদণ্ডে তা ০.০৫ মিলিগ্রাম নির্ধারিত রয়েছে। তবে এই উপজেলার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। আন্তর্জাতিক সংস্থা কোডেক্স অ্যালিমেন্টারিয়াস কমিশন (সিএসি) কর্তৃক ঘোষিত ধানে আর্সেনিকের সহনশীল মাত্রা ০.৩৫ পিপিএম হলেও চৌগাছায় সংগৃহীত নমুনায় ৫৬ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ধানে আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ধান ও চালে আর্সেনিকের উপস্থিতি সহনশীল রাখতে সেচ নিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নেই বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
থ্রিএফফোরডি পদ্ধতি বাস্তবায়নে চৌগাছা উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার বিভিন্ন গ্রামে ১২টি মডেল প্লট তৈরি করা হয়েছে। পৌরসভার হুদোপাড়া, চৌগাছার কয়ারপাড়া, সিংহঝুলীর মাজালি, ফুলসারা আড়ারদহ, জগদীশপুরের মাড়ুয়া, পাতিবিলার সাদিপুর, হাকিমপুরের বকশিপুর, নারায়ণপুরের নারায়ণপুর, স্বরূপদাহের স্বরূপদাহ, সুখপুকুরিয়ার মাকাপুর, ধুলিয়ানীর কুষ্টিয়া রামভাদ্রপুর এবং পাশাপোল ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামের মাঠে এ প্লটগুলো তৈরি করা হয়েছে।
এসব প্লটে মোট ১৪৪ জন কৃষক এই কার্যক্রমের সাথে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন। এ ছাড়া প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় মোট ৬০ জন সেচপাম্প মালিকের অধীনে নিজ উদ্যোগে আর্সেনিকমুক্ত ধান উৎপাদনে আসন্ন ইরি-বোরো মৌসুমে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে। ইতোমধ্যে কৃষকদের সচেতন করার লক্ষ্যে সভা, সেমিনার ও প্রশিক্ষণ দেয়া সম্পন্ন হয়েছে।
সংস্থার উপজেলা কো-অর্ডিনেটর আমিরুল ইসলাম জানান, ইরি-বোরো মৌসুমে উপরিভাগে সেচপাম্পের মাধ্যমে ভূগর্ভের পানি উত্তোলন করা হলে পানির পরিমাণ কমে গিয়ে আর্সেনিকের ঘনত্ব বৃদ্ধি পায় এবং ধানে তা জমা হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে ২০ শতাংশ পানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি প্রায় ৮ শতাংশ বেশি ফলন পাওয়া সম্ভব। আড়ারহদ গ্রামের প্লটের কৃষক ইমদাদুল হক ও মাজালি গ্রামের কৃষক হাফিজুর রহমান তপন জানান, ধানেও যে আর্সেনিক থাকতে পারে তা তাদের আগে জানা ছিল না। বর্তমানে তারা জমিতে ‘থ্রিএফফোরডি’ পদ্ধতি ব্যবহার করে বেশ ভালো ফল পাচ্ছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোসাব্বির হুসাইন বলেন, প্রচলিত জলাবদ্ধতার পরিবর্তে থ্রিএফফোরডি প্রয়োগে মাটির রেডক্স পটেনশিয়াল বৃদ্ধি পেয়ে অক্সিডেটিভ পরিবেশ তৈরি হয়। এর ফলে ধান গাছের আর্সেনিক শোষণ উল্লেখযোগ্যহারে কমে যায় এবং চালে অজৈব আর্সেনিকের মাত্রা হ্রাস পায়।
জনস্বাস্থ্য ও প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, ধান বা চালে আর্সেনিক দমনে সরকারি কোনো সরাসরি উদ্যোগ না থাকলেও ভূগর্ভের পানির ক্ষেত্রে কার্যক্রম চলমান রয়েছে। উপজেলা জনস্বাস্থ্য অধিদফতরের সহকারী প্রকৌশলী ফেরদৌসী খাতুন জানান, বিগত রিপোর্টে এ উপজেলায় গড়ে ২০ মিলিগ্রাম আর্সেনিকের উপস্থিতি ধরা পড়েছে এবং ১১টি ইউনিয়নে ৯০টি অগভীর নলকূপ স্থাপন করে পানি পরীক্ষাগারে প্রেরণের মাধ্যমে উচ্চমাত্রার উৎসগুলোতে পরিশোধনের ভ্যাসেল দেয়া হচ্ছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আহসানুল মিজান রুমী জানান, আগে বিভিন্ন জরিপে উপজেলায় প্রায় এক হাজার ৫০০ জন আর্সেনিক রোগী চিহ্নিত হয়েছিল এবং হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফারজানা ইসলাম বলেন, আর্সেনিক সমস্যা এ অঞ্চলে দীর্ঘদিনের এবং টিউবওয়েলের অধিকাংশ পানি নিরাপদ না থাকায় পানি ব্যবহারে সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক হতে হবে।

Advertisement