রাজধানীতে বাড়ছে ককটেল বিস্ফোরণ বাড়ছে আতঙ্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক

Advertisement

রাজধানী ঢাকায় সন্ধ্যার অন্ধকার নামার সাথে সথেই শুরু হয় একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণের তাণ্ডব। শুক্রবার রাত পৌনে ৮টা থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত নগরীর অন্তত ছয়টি পয়েন্টে চলন্ত মোটরসাইকেল ও উড়ালসেতু থেকে ককটেল নিক্ষেপ করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে দুষ্কৃতকারীরা। খিলগাঁওয়ে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদর দফতর, আদাবর থানা ভবন, শাহবাগে টহলরত পুলিশের গাড়ি, শাহবাগের ঐতিহাসিক জুলাই চত্বর, বিমানবন্দর গোলচত্বর এবং মিরপুরের কালশী মোড়ে ঘটা এসব বিস্ফোরণের ধরন পর্যবেক্ষণ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিশ্চিত হয়েছে যে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়- বরং নিরাপত্তা ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার এক সুপরিকল্পিত ‘হিট-অ্যান্ড-রান’ কৌশল।
প্রথম ককটেল বিস্ফোরণের খবর আসে খিলগাঁও থেকে। রাত পৌনে ৮টার দিকে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদর দফতরের বাউন্ডারির ভেতরে বিকট শব্দে ককটেল  বিস্ফোরিত হয়। খিলগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানান, দুর্বৃত্তরা অত্যন্ত চতুরতার সাথে আনসার সদর দফতরের পাশের কোনো বহুতল ভবনের ছাদ অথবা নিচের কোনো অন্ধকার গলি থেকে নিরাপত্তা দেয়াল টপকে ভেতরে ককটেল নিক্ষেপ করেছে। এ ঘটনায় হেডকোয়ার্টার্সের নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা হয়েছে।
রাত পৌনে ১০টার দিকে আদাবর থানার সামনে মোটরসাইকেলে করে এসে দুর্বৃত্তরা থানার ঠিক বিপরীত পাশ থেকে পর পর দু’টি ককটেল ছুড়ে মারে। বিকট শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল ইসলাম জানান, ককটেল নিক্ষেপের পর দুষ্কৃতকারীরা কালবিলম্ব না করে তীব্র গতিতে বাইক চালিয়ে পালিয়ে যায়। ঘটনায় কোনো পুলিশ সদস্য আহত না হলেও এটি থানার সুরক্ষায় বড় সতর্কবার্তা।
শাহবাগের ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স (আইবি) গেটের সামনে রাত ১০টা ২০ মিনিটে শাহবাগ থানার একটি ডিউটি গাড়ি লক্ষ্য করে সরাসরি ককটেল ছুড়ে মারে বাইক আরোহীরা। ডিউটি অফিসার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আব্দুল খালেক জানান, চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে পুলিশের গাড়ি লক্ষ্য করে ককটেলটি নিক্ষেপ করার পরই হামলাকারীরা দ্রুত গতিতে মৎস্য ভবনের মোড়ের দিকে পালিয়ে যায়।
রাত ১২টা ১ মিনিটে ঐতিহাসিক জুলাই চত্বরের ঠিক পাশে আবারো ককটেল বিস্ফোরিত হয়। এসআই আব্দুল খালেক জানান, মধ্যরাতে চত্বরের পাশে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। শাহবাগে পরপর দু’টি বিস্ফোরণের ঘটনায় পুরো এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
এ ছাড়াও রাজধানীর বিমানবন্দর এলাকায় রাত পৌনে ১২টার দিকে ককটেল বিষ্ফোরণের ঘটনায় চরম আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল হাসান তালুকদার ও পরিদর্শক (তদন্ত) আবুল কাইয়ুম জানান, ফ্লাইওভারের নিচে গোলচত্বরের সড়ক লক্ষ্য করে পরপর দু’টি ককটেল ফেলে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। চলন্ত বাইক থেকে উড়ালসেতুর সুবিধাজনক অবস্থান ব্যবহার করে নিচে ককটেল ফেলা হয় যাতে পুলিশের হাতে ধরা পড়ার ঝুঁকি কম থাকে।
একই রাতে মিরপুরের কালশী মোড়েও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কালশীর ঘটনায় নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগ ও বিগত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দুষ্কৃতকারীরা জড়িত থাকতে পারে বলে অভিযোগ উঠেছে। ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার জানান, কালশী মোড়ের বিস্ফোরণের প্রতিটি আলামত পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং জড়িতদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
গভীর রাতের এই ককটেল হামলায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া না গেলেও, সরাসরি পুলিশের থানা ও টহল গাড়ি লক্ষ্য করে ককটেল ছোড়ার ঘটনায় চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে নগরবাসীর মনে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি ও জনমনে আতঙ্ক তৈরির উদ্দেশ্যেই এই সুসংগঠিত ককটেল হামলা চালানো হয়েছে। দ্রুত হামলাকারীদের মূল হোতাদের গ্রেফতার করা না গেলে নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর গভীর প্রভাব পড়তে পারে।
ডিএমপি জানায়, রাজধানীতে হঠাৎ ককটেল হামলার এই ঢেউ সামনে আসার পর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) পুরো নগরজুড়ে বিশেষ সতর্কতা ও চেকপোস্ট জোরদার করেছে। বিভিন্ন থানার ওসি এবং উপ-পুলিশ কমিশনারগণ সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে হামলাকারী মোটরসাইকেল আরোহীদের চিহ্নিত করার কাজ শুরু করেছেন।