
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
সপ্তাহের শেষ দু’টি কর্মদিবসে সূচকের বড় ধরনের উন্নতি ঘটলেও আগের তিন দিনের পতনকে তা টেক্কা দিতে পারেনি। ফলস্বরূপ সপ্তাহান্তে নেতিবাচকই ছিল দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) আচরণ। ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গত সপ্তাহে ৪ দশমিক ৪ পয়েন্ট অবনতির শিকার ছিল। রোববার পাঁচ হাজার ৪১৭ দশমিক ৪৪ পয়েন্ট থেকে সপ্তাহ শুরু করা সূচকটি বৃহষ্পতিবার সপ্তাহান্তে পাঁচ হাজার ৪১৩ দশমিক ০৪ পয়েন্টে স্থির হয়। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ১৮ দশমিক ৩৩ ও ২ দশমিক ৯৬ পয়েন্ট।
গত সপ্তাহের মোট পাঁচটি কর্মদিবসের প্রথমটিতে ৩২ দশমিক ২৮ পয়েন্ট হারায় ডিএসই। পরবর্তী দু’দিন সোমবার ও মঙ্গলবার সূচকটির যথাক্রমে ৫১ দশমিক ৫৬ ও ৪৯ দশমিক ২৬ পয়েন্ট অবনতি ঘটে। এ সময় পুঁজিবাজারে দু’টি ইতিবাচক ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশ ব্যাংক তফসিলি ব্যাংকগুলোর পুঁজিবাজারে বিশেষ তহবিলের বিনিয়োগের মেয়াদ ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ সাল থেকে বাড়িয়ে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ সালে বৃদ্ধি করে। এ ছাড়া পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অবরুদ্ধ করে রাখা ৬১৭টি বিও হিসাব শর্তসাপেক্ষে খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আর্থিক খাতের দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেয়া এ দু’টি সিদ্ধান্তের ফলস্বরূপ বুধবার ও বৃহষ্পতিবার সূচকটি যথাক্রমে ৫৭ দশমিক ৩১ ও ৭১ দশমিক ৪০ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। এর ফলে ধারাবাহিক পতন থেকে পুঁজিবাজার ফের ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, দুই নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের নেয়া এ দু’টি সিদ্ধান্ত পুঁজিবাজারে নতুন করে প্রাণ ফেরায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেয়া সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে সম্প্রতি যে বিক্রয়চাপ তৈরি করা হচ্ছিল তা অনেকাংশে হ্রাস পাবে। এর ফলে বাজারের নেতিবাচক প্রবনতা এড়ানো যাবে। অন্যদিকে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা কর্তৃক অবরুদ্ধ বিও হিসাব খুলে দেয়ার ফলে এসব বিও হিসাবধারিরা বাজারে সক্রিয় হতে পারবে। ফলে বাজারে তারল্য ও শেয়ারের সরবরাহও বাড়তে পারে। তারা মনে করেন, এ দুই সিদ্ধান্তের ফলে সপ্তাহের শেষ দু’দিন বাজার চিত্র পাল্টে যায়।
সপ্তাহের শেষদিকে বাজার আচরণ পাল্টে যাওয়ায় গত সপ্তাহে ডিএসই’র লেনদেনে উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটে। ডিএসই এ সময় দুই হাজার ৬৩৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হয় যা আগের সপ্তাহ অপেক্ষা ১৭ দশমিক ০৫ শতাংশ বেশি। আগের সপ্তাহে বাজারটির মোট লেনদেন ছিল দুই হাজার ২৫০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। অনুরূপভাবে এ সময় বাজারটির গড় লেনদেন ৪৫০ কোটি টাকা থেকে ৫২৬ কোটি টাকার পৌঁছে যায় যা ১৭ দশমিক ০৫ শতাংশ বেশি।
লেনদেনের উন্নতি ঘটলেও গত সপ্তাহে ডিএসই’র বাজার মূলধনের অবনতি এড়ানো যায়নি। এ সময় ৯১৭ কোটি টাকা মূলধণ হারায় বাজারটি। ছয় লাখ ৭৪ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা মূলধণ নিয়ে সপ্তাহ শুরু করা বাজারটির মূলধণ সপ্তাহান্তে ছয় লাখ ৭৩ হাজার ৫৫৩ কোটিতে স্থির হয়।
এদিকে খাতভিত্তিক লেনদেনে গত সপ্তাহে বস্ত্র খাতের শেয়ারের আধিপত্য ছিল। লেনদেন চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত সপ্তাহে ডিএসইর মোট লেনদেনের ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ দখলে নিয়ে শীর্ষে অবস্থান করছে বস্ত্র খাত। ১৩ দশমিক ২ শতাংশ লেনদেনের ভিত্তিতে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল সাধারণ বীমা খাত। তৃতীয় অবস্থানে থাকা ব্যাংক খাতের দখলে ছিল লেনদেনের ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। ওষুধ ও রসায়ন খাত ৯ দশমিক ২ শতাংশ লেনদেনের ভিত্তিতে তালিকার চতুর্থ অবস্থানে ছিল। আর পঞ্চম অবস্থানে থাকা প্রকৌশল খাতের দখলে ছিল মোট লেনদেনের ৮ শতাংশ।
ডিএসইতে গত সপ্তাহে বেশির ভাগ খাতের শেয়ারে মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। সবচেয়ে বেশি ৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে বস্ত্র খাতে। এ ছাড়া সিরামিক খাতে ৪ দশমিক ১ শতাংশ, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ২ দশমিক ৬ শতাংশ, আর্থিক কোম্পানি খাথতে ২ দশমিক ১ শতাংশ ইতিবাচক রিটার্ন এসেছে। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি দরপতন ঘটেছে পাট খাতে । ৬ দশমিক ৫ শতাংশ দরপতনের শিকার হয়েছে খাতটি। এ ছাড়া খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ, টেলিযোগাযোগ খাতে ২ দশমিক ৯ শতাংশ দরপতন ঘটেছে।
গত সপ্তাহে ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে বস্ত্র খাতের কোম্পানি এনভয় টেক্সটাইলস। সপ্তাহে গড়ে ২১ কোটি ৯৬ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয় কোম্পানিটির যা ছিল ডিএসই’র মোট লেনদেনের ৪ দশমিক ১৭ শতাংশ। গড়ে প্রতিদিন ২০ কোটি ৭২ লাখ টাকার শেয়ার বেচাকেনা করে একই খাতের মতিন স্পিনিং ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে। সপ্তাহিক লেনদেনে ডিএসই’র শীর্ষ ১০ কোম্পানি ও ফান্ডের অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে সায়হাম টেক্সটাইলস, শাহজিবাজার পাওয়ার কোম্পানি, ব্র্যাক ব্যাংক, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলস, ইভিন্স টেক্সটাইলস, প্রাইম ফিন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, নাহি অ্যালুমিনিয়াম কম্পোজিট ও আইপিডিসি ফিন্যান্স।
বিদায়ী সপ্তাহে ডিএসই’র মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানি ছিল টেক্সটাইল খাতেরই মতিন স্পিনিং মিলস। এ সময় কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছির ২৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ। ২১ দশমিক ৮৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল জ¦ালানি খাতের ওইম্যাক্স ইলেক্ট্রোড। মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসই’র শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে এনভয় টেক্সটাইলস, প্রাইম টেক্সটাইলস, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, ইউনিয়ন ক্যাপিটাল, শাইনপুকুর সিরামিকস, সিলভা ফার্মা, ড্রাগন সোয়েটার অ্যান্ড স্পিনিং লিমিটেড ও বিডি অটোকারস লিমিটেড।
সপ্তাহটিতে ডিএসই’র দরপতনে শীর্ষে ছিল মিউচুয়াল ফান্ড সিএপিএম আইবিবিএল । ফান্ডটি এ সপ্তাহে ২৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ দর হারায়। ১৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ দর হারিয়ে তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল জ¦ালানি খাতের ইস্টার্ণ লুব্রিকেন্ট। এ তালিকার উল্লেখযোগ্য অন্য সিকিউরিটিজগুলো ছিল যথাক্রমে ব্যাংক এশিয়া পারপিচুয়াল বন্ড, এমবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার, প্রাইম আইসিবি মিউচুয়াল ফান্ড, লিব্রা ইনফিউশন, ওরিয়ন ফার্মা, ব্রিটিশ আমেরিকান ট্যোবাকো ও তুং হাই টেক্সটাইলস।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








