কিশোর গ্যাংয়ের গডফাদারদের তালিকা তৈরিতে ধীরগতি
কিশোর গ্যাংয়ের গডফাদারদের তালিকা তৈরিতে ধীরগতি।

আমিনুল ইসলাম 

Advertisement

কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কঠোর নির্দেশনা ও হুঁশিয়ারির পরও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হচ্ছে না। মাঠপর্যায়ে কিছু কিশোর অপরাধী গ্রেফতার হলেও বরাবরের মতোই আড়ালে থেকে যাচ্ছে তাদের নিয়ন্ত্রণকারী গডফাদাররা। এমনকি কিশোর গ্যাংয়ের গডফাদারদের তালিকা তৈরির কাজও অনেকটা থমকে আছে। অভিযোগ রয়েছে, গডফাদার হিসেবে কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম আসায় তালিকা তৈরির কার্যক্রমে গতি কমে গেছে। ফলে নিয়মিত অভিযানে যাদের পাওয়া যাচ্ছে, মূলত তাদেরই গ্রেফতার করা হচ্ছে।
এ দিকে হত্যা, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদক কারবার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ এবং জমি-ফ্ল্যাট দখলের মতো অপরাধে জড়িত থাকার পাশাপাশি সম্প্রতি মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডেও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের গ্রেফতার এড়াতে আত্মগোপনে থাকা দলটির কিছু নেতাকর্মী অঞ্চলভিত্তিক কিশোর গ্যাং সদস্যদের দিয়ে ককটেল বিস্ফোরণ, বাসে আগুন দেয়াসহ বিভিন্ন নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকারী কিশোর গ্যাংয়ের অনেক সদস্য এখনো সক্রিয় রয়েছে। শুধু পরিবর্তন হয়েছে তাদের পৃষ্ঠপোষক বা গডফাদার। পাশাপাশি এসব গ্রুপে যুক্ত হয়েছে নতুন কিছু মুখ। পুরনো গডফাদারদের নির্দেশনায় বিভিন্ন এলাকায় তাদের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে।
সূত্র জানায়, কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সদরদফতর থেকে কঠোর বার্তা দেয়া হয়েছিল। কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাজধানীসহ সব মেট্রোপলিটন এলাকা এবং দেশের প্রতিটি অঞ্চলে পুলিশ সদস্যদের কঠোর ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেয়া হয়। শুধু পুলিশ সদর দফতরই নয়, জাতীয় সংসদের হুইপ নুরুল ইসলাম মনিও কিশোর অপরাধ নির্মূলে তিন মাসের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন।
এরপর বিশেষ অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের গ্রেফতারের পাশাপাশি তাদের পৃষ্ঠপোষক ও আশ্রয়দাতাদের শনাক্ত করতে নানা তৎপরতা শুরু করে পুলিশ। ওই সময় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, কিশোর অপরাধী ও তাদের শেল্টারদাতাদের চিহ্নিত করার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। কিন্তু সম্প্রতি সেই কার্যক্রমে গতি হারিয়েছে। গডফাদার হিসেবে কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম আসায় তালিকা তৈরির কাজ কার্যত থমকে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। বর্তমানে নিয়মিত অভিযানে যাদের পাওয়া যাচ্ছে, তাদেরই গ্রেফতার করা হচ্ছে। ফলে অপরাধের নেপথ্যে থাকা পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অভিযান চালিয়ে কিশোর অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব নয়। এ জন্য সবার আগে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের যারা আশ্রয়-প্রশ্রয় ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় একদল অপরাধী গ্রেফতার হলেও নতুন করে একই অপরাধে জড়িয়ে পড়বে অন্যরা।
গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য মতে, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা মোটামুটি একই থাকলেও সময়ের সাথে পরিবর্তন হচ্ছে তাদের পৃষ্ঠপোষক বা শেল্টারদাতা। বিগত সরকারের সময় স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাদের হয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করা কিশোর গ্যাংয়ের অনেক সদস্য এখনো সক্রিয় রয়েছে। তবে তাদের পুরনো পৃষ্ঠপোষকদের জায়গায় যুক্ত হয়েছে নতুন প্রভাবশালীরা। আবার মাঠপর্যায়ের কোনো কোনো সদস্য নিজেরাই সিনিয়র হয়ে রাজনৈতিক নেতা হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। তাদের জায়গা পূরণ করতে গ্যাংয়ে যুক্ত হচ্ছে নতুন মুখ।
একসময় বড় ভাইদের পেছনে লাঠিসোটা নিয়ে ঘোরাকে অনেকে অ্যাডভেঞ্চার হিসেবে দেখলেও সময়ের সাথে সাথে এসব কিশোরের একটি অংশ জড়িয়ে পড়ছে ভয়াবহ অপরাধে। হত্যা, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, ছিনতাই, ফুটপাথ ও পার্কিং নিয়ন্ত্রণ, বিভিন্ন অনুষ্ঠান বা ইভেন্টের নিয়ন্ত্রণ এবং অনলাইন প্রতারণাসহ নানা অপরাধে তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি ভাড়াটে অপরাধী হিসেবেও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জনের সুযোগ থাকায় বিপথগামী কিশোর ও তরুণরা এসব গ্রুপে আকৃষ্ট হচ্ছে।
মূলত দ্রুত ও সহজে অর্থ উপার্জনের লোভে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়া, বেকার ও হতাশাগ্রস্ত কিশোর-তরুণদের একটি অংশ কিশোর গ্যাংয়ে যুক্ত হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অ্যাডভেঞ্চারের নেশা কিংবা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের আকাক্সক্ষা থেকেও শিশুরা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষ প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় সাধারণ মানুষ আতঙ্ক নিয়ে চলাচল করেন।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, বয়স কম হওয়ায় আইনগত জটিলতা এড়াতে অনেক বড় মাদক কারবারি কিশোরদের ব্যবহার করে থাকে। ফুটপাথের দোকান, কাঁচাবাজার, বাসস্ট্যান্ড, টেম্পোস্ট্যান্ড, ট্রাক টার্মিনাল, এমনকি নির্মাণাধীন ভবনেও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে নিয়মিত অর্থ আদায় করছে এসব গ্রুপ। অনেক এলাকায় ছোট ছোট গ্যাং নিজেদের মধ্যে এলাকা ভাগ করে নিয়ে এ ধরনের চাঁদাবাজি ও নিয়ন্ত্রণ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। অন্য কোনো গ্রুপ ওই এলাকায় ভাগ বসাতে গেলে শুরু হয় বিরোধ, সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনা। 
এ ব্যপারে পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের গডফাদারদের তালিকা তৈরির কাজ থেমে নেই, চলমান রয়েছে। একই সাথে কিশোর গ্যাং সদস্যদের গ্রেফতার কায়ক্রমও চলছে।