উন্নয়নশীল দেশের বৈদেশিক ঋণ রেকর্ড উচ্চতায়
  •  এক বছরে মূলধন ও সুদ পরিশোধ ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার

উন্নয়নশীল দেশগুলোর মাথায় বৈদেশিক ঋণের বোঝা ক্রমেই ভারী হচ্ছে। এক দিকে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে ঋণের দরজা খুলছে, বেসরকারি ঋণদাতারাও ফিরছেন জোরেশোরে। অন্য দিকে সেই ঋণের সুদ ও পরিশোধের চাপ সবচেয়ে বেশি চেপে বসছে দরিদ্র দেশগুলোর ওপর। ফলে নতুন অর্থায়ন এলেও উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোর মতো জরুরি খাতে ব্যয়ের সুযোগ সঙ্কুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৫.৫ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ৯.৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ২০২১ সালের পর এটিই ঋণ বৃদ্ধির দ্রুততম হার। এমনকি ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের গড় বৃদ্ধির তুলনায় এই হার প্রায় চার গুণ বলে বিশ^ব্যাংক থেকে পাঠানো তথ্যে জানা গেছে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সর্বশেষ ‘ইন্টারন্যাশনাল ডেট রিপোর্ট ২০২৬’-এ উঠে এসেছে ঋণ পরিস্থিতির এই উদ্বেগজনক চিত্র।
ঋণবাজারে অর্থের সরবরাহ বাড়লেও ঋণ নেয়ার ব্যয় কমেনি। বিশেষ করে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা- আইডিএ থেকে সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার যোগ্য দেশগুলোর পরিস্থিতি বেশি উদ্বেগজনক। এসব দেশের নতুন বেসরকারি ঋণে গড় সুদের হার ৮.২ শতাংশে উঠেছে, যা ১৯৮৯ সালের পর সর্বোচ্চ। নতুন বন্ড ইস্যুর ক্ষেত্রে সুদের হার আরো বেশি- গড়ে ৯.৪ শতাংশ। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে ঋণ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলেও দরিদ্র দেশগুলোকে সেই অর্থের জন্য চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে।
বেসরকারি ঋণদাতাদের প্রত্যাবর্তন, বাড়ছে ঋণের বোঝা
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধির বেশির ভাগ এসেছে বেসরকারি অর্থায়ন থেকে। অনেক দেশের জন্য আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার আবার উন্মুক্ত হওয়ায় বেসরকারি ঋণ গ্রহণ বেড়েছে। একই সময়ে সরকারি সংস্থাগুলোর বন্ড ইস্যু প্রায় ৩৫ শতাংশ বেড়ে ২৫১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ঋণ বৃদ্ধির হারও ছিল বেশি। আইডিএ-যোগ্য দেশগুলোর বৈদেশিক ঋণ ৮.১ শতাংশ বেড়ে ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রধান পরিসংখ্যানবিদ ও উন্নয়ন তথ্য পরিচালক হাইশান ফু এ পরিস্থিতি সম্পর্কে  বলেছেন, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বেসরকারি ঋণদাতাদের ফিরে আসা ইতিবাচক। কিন্তু এসব দেশ আরো বেশি ঋণ নিচ্ছে, আরো বেশি পরিশোধ করছে এবং অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য কম অর্থ হাতে রাখতে পারছে। তার মতে, দায়িত্বশীল ঋণ ব্যবস্থাপনার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ভবিষ্যৎ প্রজন্মসহ সবার জন্য সমৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করা।
পুরনো ঋণ শোধেও নতুন ঋণ
ঋণের বোঝা সামাল দিতে অনেক সরকার পুরনো ঋণ পরিশোধের জন্য নতুন বন্ড ইস্যু করছে। এতে তাৎক্ষণিকভাবে ঋণ পরিশোধের চাপ ও মেয়াদ ব্যবস্থাপনা কিছুটা সহজ হচ্ছে। কিন্তু ঋণের মূল পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে আগের তুলনায় বেশি সুদে নতুন ঋণ নিতে হচ্ছে। চলতি সালের শুরুর দিকের তথ্যেও আন্তর্জাতিক বন্ডবাজারে ঋণ নেয়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে ১০টির বেশি দেশ ২০২৫ সালের পুরো বছরের জন্য নির্ধারিত বন্ড ইস্যুর লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। আরো কয়েকটি দেশ আন্তর্জাতিক বন্ডবাজারে ফিরে এসেছে। তবে বাজারে ফিরে আসার এই প্রবণতা ঋণের ব্যয় কমার নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। বরং দরিদ্র দেশগুলোর জন্য ঋণের শর্ত আরো কঠিন হয়ে উঠছে।
দরিদ্র দেশকে ঋণ নিতে হচ্ছে ৮.২ শতাংশ সুদে
প্রতিবেদনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, আইডিএ-যোগ্য দেশগুলো ২০২৫ সালে নতুন বেসরকারি ঋণদাতাদের প্রতিশ্রুতির ওপর গড়ে ৮.২ শতাংশ সুদ দিয়েছে। ১৯৮৯ সালের পর এই হার সর্বোচ্চ। নতুন বন্ডের ক্ষেত্রে সুদের হার ছিল গড়ে ৯.৪ শতাংশ। অন্য দিকে সরকারি ও বেসরকারি ঋণদাতাদের কাছ থেকে নেয়া ঋণের সুদের হারের ব্যবধানও বেড়েছে। ২০১৬ সালে আইডিএ-যোগ্য দেশগুলোর ক্ষেত্রে এই ব্যবধান ছিল ৩.৪ শতাংশীয় পয়েন্ট। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫.৫ শতাংশীয় পয়েন্টে। এর বিপরীতে, বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক পুনর্গঠন ও উন্নয়ন ব্যাংক- আইবিআরডি থেকে শুধু অ-ছাড়যুক্ত ঋণ পাওয়ার যোগ্য দেশগুলো নতুন বন্ডের ওপর গড়ে ৫.৫ শতাংশ সুদ দিয়েছে। আগের বছর এই হার ছিল ৫.৮ শতাংশ। অর্থাৎ তুলনামূলকভাবে এসব দেশের ঋণ গ্রহণের ব্যয় কিছুটা কমেছে। এই ব্যবধান আন্তর্জাতিক ঋণবাজারে দেশগুলোর ঝুঁকির পার্থক্য এবং ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে অসম শর্তের চিত্র তুলে ধরছে।
এক বছরে ঋণ পরিশোধ ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার
বৈদেশিক ঋণের পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের চাপও বাড়ছে। ২০২৫ সালে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো মূলধন ও সুদ বাবদ মোট ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে। আগের বছরের তুলনায় এই পরিশোধ বেড়েছে ১.৯ শতাংশ। টানা পঞ্চম বছরের মতো ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বাড়ল। এর মধ্যে শুধু বন্ডধারীদের পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬৩ বিলিয়ন ডলারে। বিশ্বব্যাংকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এর একটি অংশ এসেছে ঋণ পুনঃক্রয় এবং নতুন বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে অর্থায়ন করা আগাম পরিশোধ থেকে।
আরো উদ্বেগের বিষয়, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলো নতুন অর্থায়ন হিসেবে যত অর্থ পেয়েছে, তার চেয়ে ঋণ পরিশোধ করেছে ৪৩৬ বিলিয়ন ডলার বেশি। অর্থাৎ নতুন অর্থায়নের তুলনায় পুরনো ঋণ পরিশোধেই বেশি অর্থ চলে গেছে। তবে ২০২৫ সালে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের প্রবাহে কিছুটা পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০২৪ সালে দীর্ঘমেয়াদি ঋণে ১১৮ বিলিয়ন ডলারের নিট বহিঃপ্রবাহ ছিল। ২০২৫ সালে তা পরিবর্তিত হয়ে ৪৫ বিলিয়ন ডলারের নিট অন্তঃপ্রবাহে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ওই বছর দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে দেশগুলোতে অর্থের নিট প্রবাহ ফিরে এসেছে।
ডলারের দুর্বলতাও বাড়িয়েছে ঋণের হিসাব
বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধির পেছনে শুধু নতুন ঋণ গ্রহণই দায়ী নয়; মুদ্রাবাজারের ওঠানামাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০২৫ সালে সরকারি ও সরকারিভাবে নিশ্চিতকৃত বৈদেশিক ঋণ ৩০৩ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে। এর এক-চতুর্থাংশেরও বেশি বৃদ্ধির কারণ ছিল মার্কিন ডলারের দুর্বলতা। ডলারের বিপরীতে অন্যান্য মুদ্রার মূল্য বেড়ে যাওয়ায় সেসব মুদ্রায় নেয়া ঋণের ডলারে হিসাব করা মূল্যও বেড়েছে। ফলে প্রকৃতপক্ষে নতুন ঋণ না নিয়েও ডলারের হিসাবে ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেশ কয়েকটি বৃহৎ সহজ শর্তের ঋণগ্রহীতা দেশের ক্ষেত্রে ২০২৫ সালে মুদ্রার বিনিময় হারের এই প্রভাব তাদের পরিশোধ করা মূলধনের পরিমাণকেও ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ ঋণের কিস্তি পরিশোধ অব্যাহত থাকলেও মুদ্রার বিনিময় হারের পরিবর্তনের কারণে ঘোষিত ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। সবমিলিয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক ঋণবাজারে অর্থায়নের সুযোগ ফিরে আসা স্বস্তির বিষয় হলেও ঋণের ব্যয়, সুদ পরিশোধ এবং পুরনো ঋণ পুনঃঅর্থায়নের চাপ উন্নয়ন ব্যয়ের ওপর নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে দরিদ্র দেশগুলোর ক্ষেত্রে ঋণ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ সংরক্ষণ এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

Advertisement