টেকনাফে যৌথবাহিনীর সাথে সন্ত্রাসীদের গোলাগুলি, সেনাসদস্য নিহত

কক্সবাজার অফিস ও নগরকান্দা (ফরিদপুর) সংবাদদাতা

Advertisement

কক্সবাজারের টেকনাফে মানবপাচারকারী দলের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান পরিচালনাকালে সন্ত্রাসীদের সাথে গোলাগুলির ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে এক সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় অস্ত্রসহ ৫ সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার এবং সন্ত্রাসীদের আস্তানা থেকে ৫৭ জন জিম্মিকে উদ্ধার করা হয়েছে। মালয়েশিয়ায় পাচারের জন্য এসব জিম্মিকে বন্দী করে রাখা হয়েছিল।
বৃহস্পতিবার রাতে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ অধিদফতরের (আইএসপিআর) দেয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গীখালী এলাকার গহিন পাহাড়ে প্রায় ১২০ জন রোহিঙ্গা ও বাঙালি নাগরিককে ১৫-১৬ জনের একটি সশস্ত্র মানবপাচারকারী সন্ত্রাসী দল জিম্মি করে রেখেছে বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), এপিবিএন ও স্থানীয় পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত একটি যৌথ আভিযানিক দল বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টায় ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
এ সময় সশস্ত্র মানবপাচারকারীরা যৌথ বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ শুরু করলে উভয় পক্ষের মধ্যে গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটে। গুলি বিনিময়ের একপর্যায়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১ বীর ইউনিটের সদস্য হিসেবে টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে কর্মরত সৈনিক মো: তিতাস শেখ (২৭) বাম কাঁধে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন এবং তার অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ঘটে। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে উদ্ধার করে নিকটস্থ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদানের পর উন্নত চিকিৎসার জন্য রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ) নেয়া হলে রাতে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত তিতাস শেখ ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া ইউনিয়নের লস্করদিয়া গ্রামের আফজাল হোসেনের ছেলে। তার মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকেই নগরকান্দায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অভিযানে ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, একটি দেশীয় তৈরি বন্দুক ও চার রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া, মানবপাচারকারী চক্রের পাঁচজন সদস্যকে আটক এবং জিম্মি অবস্থায় থাকা ৫৭ জনকে উদ্ধার করা হয়। 
দেশমাতৃকার সেবায় কর্তব্যরত অবস্থায় এই তরুণ সেনাসদস্যের আত্মত্যাগ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছে। একই সাথে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তার রূহের মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেছে।
দেশের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে জীবন উৎসর্গ করা এই বীর সেনার মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন ফরিদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়দ ইসলাম রিঙ্কু।
নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা আরফিন জানান, প্রয়োজনীয় সামরিক আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর তিতাস শেখকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করা হবে। এরপর লস্করদিয়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।
‘দোয়া কইরো মা, কাল বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাব’
মায়ের কাছে শেষবারের মতো দোয়া চেয়ে মোবাইল ফোনের লাইন কেটে দিয়েছিলেন সেনাসদস্য তিতাস শেখ। কে জানত, ছেলের মুখে শোনা এই আকুতিই হবে মায়ের সাথে তার জীবনের শেষ কথা! এখন সেই ছেলের একটি ছবিই বুকে জড়িয়ে ধরে বুকফাটা আহাজারি করছেন মা। শোকে পাথর হয়ে গেছেন স্ত্রী আর বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন শোকার্ত বাবা।
সেনাবাহিনীর নিহত তরুণ সদস্য তিতাস শেখ ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া ইউনিয়নের লস্করদিয়া গ্রামের আফজাল হোসেনের ছেলে। তিনি সেনাবাহিনীর ১ বীর ইউনিটের সদস্য হিসেবে টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন। শুক্রবার সকালে তিতাসের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। পুরো বাড়িটি শোকে স্তব্ধ। ছেলের শোকে বুক চাপড়ে বারবার মুর্ছা যাচ্ছেন মা রেখা বেগম। জীবনসঙ্গীকে হারিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার। আর আদরের সন্তান হারানোর বেদনায় নির্বাক ও বাকরুদ্ধ হয়ে বসে আছেন বাবা আফজাল শেখ।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে অত্যন্ত উৎসাহ নিয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন তিতাস। কর্মজীবনে তিনি ছিলেন দায়িত্বশীল ও নিষ্ঠাবান। আগামী ডিসেম্বর মাসে তার স্ত্রীকে নিজের কর্মস্থলে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ঘাতক সন্ত্রাসীদের একটি বুলেট তিতাসের সেই স্বপ্ন চিরতরে কেড়ে নিয়েছে। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন তিনি। তিতাসের এমন আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো পরিবার এবং আত্মীয়স্বজনের মাঝে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।