অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে সিসা, রান্নার পাত্রে সিসাদূষণ, খাবারে সিসার উপস্থিতি, অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ির স্বাস্থ্যঝুঁকি, শিশুদের সিসাদূষণ, স্ট্যানফোর্ড ও আইসিডিডিআরবি গবেষণা, বিএসটিআই অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র, বাংলাদেশে সিসাদূষণ
হাঁড়ি-পাতিল। সংগৃহীত

রান্নার কাজে বহুল ব্যবহৃত অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিল থেকেই খাবারে মিশছে বিষাক্ত ভারী ধাতু সিসা। বিশেষ করে পুরনো ও পরিত্যক্ত বিভিন্ন ধাতবসামগ্রী গলিয়ে তৈরি সস্তা অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে রান্না করা ভাত ও খিচুড়িতে উদ্বেগজনক মাত্রায় সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এতে শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ, শেখার ক্ষমতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে প্রাপ্তবয়স্কদের হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

Advertisement

যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) যৌথ গবেষণায় এ উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে প্রথমবার রান্না করা প্রতি কেজি ভাতে সর্বোচ্চ ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম এবং খিচুড়িতে ৪২০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত সিসা পাওয়া গেছে।

গত ২৫ অক্টোবর আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী SEATO Cholera Research Laboratory-তে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের বাজারে প্রচলিত অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার পাত্রের নিরাপত্তা নিয়ে এটি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

Advertisement

নতুন হাঁড়িতে সিসার মাত্রা বেশি
গবেষণার জন্য বাংলাদেশে একটি সরবরাহকারীর কাছ থেকে ২০টি নতুন অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি এবং বিভিন্ন পরিবারের কাছ থেকে সাতটি ব্যবহৃত হাঁড়ি সংগ্রহ করা হয়। এসব পাত্রে রান্না করা খাবার পরীক্ষা করে গবেষকরা সিসার উপস্থিতি শনাক্ত করেন। ব্যবহৃত সাতটি হাঁড়ির মধ্যে ছয়টিতে রান্না করা ভাতেও সিসা পাওয়া গেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন হাঁড়ি থেকে সবচেয়ে বেশি সিসা খাবারে মিশে যায়। কয়েকবার ব্যবহারের পর এর পরিমাণ কমলেও পুরোপুরি বন্ধ হয় না। অর্থাৎ নতুন হাঁড়ি কয়েকবার ব্যবহার করলেই সেটি নিরাপদ হয়ে যায়- এমন ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি পাওয়া যায়নি।

আইসিডিডিআর,বির গবেষক ও গবেষণার সহলেখক মাহবুবুর রহমান জানান, সস্তা অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি তৈরিতে ব্যবহৃত পুরনো ধাতব বর্জ্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ। এসব পাত্র তৈরিতে পুরনো গাড়ির ইঞ্জিনের অংশ, রেডিয়েটর, কম্পিউটারের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ এবং পরিত্যক্ত ক্যান গলিয়ে ব্যবহার করা হয়। এসব বর্জ্যে থাকা সিসা নতুন পাত্রের সাথে মিশে যেতে পারে। তবে পরীক্ষিত নির্দিষ্ট হাঁড়িগুলো তৈরিতে ব্যবহৃত ধাতুর প্রকৃত উৎস গবেষণায় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

ঘষে পরিষ্কার করলেও বাড়ে ঝুঁকি
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, রান্নার পাত্র পরিষ্কারের পদ্ধতিও খাবারে সিসা মেশার পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে পারে। শক্ত ও রুক্ষ স্ক্রাবার বা ঘষার প্যাড দিয়ে হাঁড়ি পরিষ্কার করলে সিসা নিঃসরণের মাত্রা বেড়ে যায়।

গবেষকরা অম্লীয় তরল ব্যবহার করে পৃথক পরীক্ষায় দেখেছেন, ঘষে পরিষ্কার করা পাত্র থেকে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি সিসা বের হয়েছে, তুলনামূলকভাবে যেসব পাত্র ঘষে পরিষ্কার করা হয়নি তা থেকে ধাতব খুন্তি দিয়ে নাড়াচাড়া করলেও একই ধরনের পরীক্ষায় সিসা নিঃসরণ বেড়েছে।

কোন ধরনের খাবার রান্না হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে টক বা অম্লীয় খাবার দূষিত পাত্র থেকে বেশি সিসা টেনে নিতে পারে। ফলে এসব পাত্রে টকজাতীয় খাবার রান্না করলে ঝুঁকি আরো বাড়তে পারে।

শিশুদের জন্য বিপজ্জনক মাত্রার সংস্পর্শ
গবেষকরা বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকায় চাল খাওয়ার আগের গবেষণার তথ্য ব্যবহার করে সিসা গ্রহণের একটি সম্ভাব্য হিসাব করেছেন। তাতে দেখা গেছে, পরীক্ষিত হাঁড়িতে তিনবার রান্নার পরও সেই পাত্রে রান্না করা ভাত খাওয়া শিশুদের দৈনিক প্রায় ১৩ থেকে ১৯ মাইক্রোগ্রাম সিসা শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

এ পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) শিশুদের জন্য নির্ধারিত অন্তর্বর্তী দৈনিক সিসা গ্রহণের রেফারেন্স মাত্রার প্রায় ছয় থেকে ৯ গুণ। তবে এটি সরাসরি শিশুদের শরীরে সিসার পরিমাণ পরিমাপ করে পাওয়া ফল নয়; চাল খাওয়ার পরিমাণের অনুমানভিত্তিক হিসাব।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, সিসার সংস্পর্শের কোনো নিরাপদ মাত্রা প্রতিষ্ঠিত নেই। শিশুদের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে বিপজ্জনক। সিসার প্রভাবে তাদের মস্তিষ্কের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে, শেখার ক্ষমতা, মনোযোগ ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা কমে যেতে পারে। আচরণগত সমস্যাও দেখা দিতে পারে। অন্য দিকে দীর্ঘদিন সিসার সংস্পর্শে থাকলে প্রাপ্তবয়স্কদের হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে।

ডব্লিউএইচওর সুপারিশ অনুযায়ী, রক্তে সিসার মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে পাঁচ মাইক্রোগ্রাম হলে সংস্পর্শের উৎস শনাক্ত ও কমানোর উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। এটি নিরাপদ মাত্রা নয়; বরং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়ার একটি নির্দেশক।

বাংলাদেশে আগে থেকেই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি
বাংলাদেশে সিসাদূষণ নতুন সমস্যা নয়। ইউনিসেফের ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশ এবং গর্ভবতী নারীদের ৭ দশমিক ৫ শতাংশের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা পাওয়া গেছে।

এর আগে হলুদ, সিরামিকের বাসন, খেলনা এবং বিভিন্ন গৃহস্থালি সামগ্রীতেও সিসার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। ২০১৯ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় গ্রামীণ বাংলাদেশের গর্ভবতী নারীদের শরীরে সিসার সংস্পর্শের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে সিসাযুক্ত হলুদ রঞ্জক মেশানো হলুদকে চিহ্নিত করা হয়।

২০২৩ সালে পিউর আর্থের এক গবেষণায় সিরামিকের বাসনপত্র ও শিশুদের খেলনায় উচ্চমাত্রার সিসা পাওয়া যায়।

তবে হলুদে সিসাদূষণ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে ইতিবাচক অগ্রগতিও হয়েছে। ২০২৩ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, পরীক্ষিত বাজারের হলুদের নমুনায় সিসার উপস্থিতি ২০১৯ সালের ৪৭ শতাংশ থেকে ২০২১ সালে শূন্যে নেমে আসে। গবেষকদের মতে, জনসচেতনতা, ব্যবসায়ীদের সাথে সমন্বয় এবং সিসাযুক্ত রং ব্যবহারের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের ফলে এ অগ্রগতি সম্ভব হয়েছিল।

নিয়ন্ত্রণে বিএসটিআইয়ের উদ্যোগ, প্রশ্নও রয়েছে
গবেষকদের মতে, সাধারণ পরিবারকে শুধু অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিল ব্যবহার বন্ধ করতে বললে সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ এসব পাত্র তুলনামূলক সস্তা এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের কাছে বহুল ব্যবহৃত। অনেক পরিবারের পক্ষে একসাথে সব রান্নার পাত্র পরিবর্তন করাও কঠিন। তাই দূষিত ধাতব বর্জ্য দিয়ে রান্নার পাত্র তৈরির উৎস বন্ধ করা এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কার্যকর নজরদারি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

গবেষকরা বিষয়টি বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এবং সংশ্লিষ্ট উৎপাদকদের সাথে আলোচনা করেছেন। এ বিষয়ে বিএসটিআইয়ের সাথে কর্মশালাও করেছেন। তবে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যোগাযোগ এবং হাঁড়ি তৈরিতে ব্যবহৃত কাঁচামালের উৎস সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছেন বলে জানান মাহবুবুর রহমান। বর্তমানে তারা ঢাকা ও দেশের অন্যান্য এলাকা থেকে আরো রান্নার পাত্র সংগ্রহ করে পরীক্ষা করছেন।

এক লিখিত বক্তব্যে বিএসটিআই জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার পাত্রের জন্য বাধ্যতামূলক সনদ গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কারখানা ও বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং উৎপাদকদের লাইসেন্সের আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

বিএসটিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, বিএসডি ১১১০:২০২৫ মানদণ্ড অনুসারে অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে সিসাসহ বিষাক্ত ধাতুর নির্ধারিত সীমা মানতে হবে। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক ০৫ শতাংশের সীমার কথা উল্লেখ করলেও তাদের লিখিত জবাবে এ সীমা কোন কোন ধাতুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তা স্পষ্ট করা হয়নি।

মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ উৎপাদকদের লাইসেন্স দেয়া হবে না এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। পাশাপাশি বাজারে অনিরাপদ পণ্য বিক্রি বন্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি।

শুধু সচেতনতা নয়, উৎসে নিয়ন্ত্রণ জরুরি
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো: শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, সিসাদূষণের ঝুঁকি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে প্রশিক্ষণ, কর্মশালা ও প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। তিনি স্বীকার করেন, শক্তভাবে ঘষে হাঁড়ি পরিষ্কার করলে দূষণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ কারণে যতটা সম্ভব অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার পাত্র ব্যবহার পরিহারের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

এ দিকে চলতি বছরের আগস্টে ২০৩৫ সালের মধ্যে সিসার সংস্পর্শ কমাতে একটি খসড়া জাতীয় কর্মপরিকল্পনা অনুমোদন করেছে সরকার। এতে নজরদারি, নিয়ন্ত্রণ ও আইন প্রয়োগ জোরদারের বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তবে গবেষকদের মতে, শুধু ভোক্তাদের সতর্ক করা কিংবা পুরনো হাঁড়ি বদলে নতুন হাঁড়ি কেনার পরামর্শ দিয়ে এ সঙ্কট মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। বরং হাঁড়ি তৈরিতে ব্যবহৃত কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় নজরদারি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

একই সাথে বাজারজাত করা প্রতিটি রান্নার পাত্রে কী পরিমাণ সিসা রয়েছে, রান্নার সময় তার কতটা খাবারে মিশছে এবং কোন ধরনের খাবারে নিঃসরণের মাত্রা বাড়ছে- এসব বিষয়ে পরীক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিএসটিআইয়ের লিখিত বক্তব্যে তাদের সনদ পরীক্ষার আওতায় রান্নার সময় খাবারে সিসা মেশার মাত্রা পরিমাপ করা হয় কি না, তা স্পষ্ট করা হয়নি।

গবেষকদের মূল বক্তব্য হলো, সিসাদূষণের দায় সাধারণ পরিবারের ওপর চাপিয়ে দেয়া যাবে না। যেসব পরিবার আর্থিক কারণে সস্তা অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র ব্যবহার করতে বাধ্য, তাদের দিয়ে পাত্র বদল করানোর পরিবর্তে উৎপাদনের উৎসেই দূষণ বন্ধ করতে হবে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এটাই হওয়া উচিত সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।