
শফিউল আযম বেড়া (পাবনা)
একসময় পদ্মা ও যমুনার সংযোগ রক্ষাকারী খরস্রোতা বড়াল নদী এখন অস্তিত্ব সঙ্কটে। শরৎকালেও নদীটির বিভিন্ন অংশে পানিপ্রবাহ নেই। কোথাও নদী শুকিয়ে চাষাবাদ হচ্ছে, কোথাও দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও গুদাম। আবার কোথাও আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করা হচ্ছে। একাধিক স্থানে স্লুইস গেট নির্মাণ, দখল ও নাব্যতা সঙ্কটে নদীটির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে চলনবিলের পরিবেশ, কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যে।
রাজশাহীর চারঘাটে পদ্মা নদী থেকে বড়ালের উৎপত্তি। রাজশাহী, নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলার মধ্য দিয়ে প্রায় ২০৪ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে পাবনার বেড়া উপজেলার মোহনগঞ্জে যমুনা নদীতে মিশেছে নদীটি। বড়ালকে চলনবিলের প্রধান নদী ও প্রাণ বলা হয়। পদ্মা ও যমুনার পানি বড়াল হয়ে চলনবিলে প্রবেশ করায় একসময় সারা বছরই বিলের বিভিন্ন অংশে পানির প্রবাহ সচল থাকত। বড়াল থেকে উৎপত্তি হয়েছে আরো কয়েকটি নদী ও অসংখ্য খাল-নালার।
নদীটি মূলত আপার ও লোয়ার বড়াল নামে দু’টি অংশে বিভক্ত। চারঘাট থেকে নাটোরের গুরুদাসপুর পর্যন্ত প্রায় ৮৪ কিলোমিটার অংশ আপার বড়াল। অন্যদিকে নাটোরের আটঘড়ি থেকে বনপাড়া, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর ও সাঁথিয়া হয়ে বেড়ার মোহনগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় ১২০ কিলোমিটার অংশ লোয়ার বড়াল নামে পরিচিত। বিভিন্ন নদীর সংযোগে বড়ালের প্রবাহ পরবর্তী সময়ে হুড়াসাগর নাম ধারণ করে যমুনায় মিশেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বড়াল নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার অন্যতম কারণ একাধিক স্লুইস গেট নির্মাণ। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ১৯৮৫ সালে বড়াল বেসিন ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের আওতায় চারঘাটে নদীর উৎসমুখে তিন দরজাবিশিষ্ট স্লুইস গেট নির্মাণ করে। এতে পদ্মা থেকে বড়ালে স্বাভাবিক পানি প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হয়। পরে ১৯৯৫-৯৬ সালে নাটোরের আটঘড়িতে পাঁচ দরজাবিশিষ্ট আরেকটি স্লুইস গেট নির্মাণ করা হয়। এ ছাড়া বড়ালের বিভিন্ন অংশে আরো কয়েকটি স্লুইস গেট নির্মাণ করা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব অবকাঠামোর কারণে নদীর বিভিন্ন অংশে পানিপ্রবাহ কমে গেছে। বিশেষ করে আটঘড়ি থেকে বনপাড়া পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকায় নদীটির অস্তিত্ব সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে।
একসময় বড়াল ছিল এ অঞ্চলের নৌযোগাযোগ ও বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। আশির দশক পর্যন্ত নদী দিয়ে বড় বড় পণ্যবাহী নৌকা, বার্জ, কার্গো জাহাজ, লঞ্চ ও স্টিমার চলাচল করত। নদীকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি ও মৎস্যসম্পদের ওপর নির্ভরশীল ছিল বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা। বড়ালের পানি ব্যবহার করে নদীতীরবর্তী জমিতে সেচ দেয়া হতো। নদীপথে ধান, চাল, পাট, মসুর, খেসারি ও সরিষাসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য দেশের নানা অঞ্চলে পরিবহন করা হতো।
নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় সেই চিত্র এখন বদলে গেছে। সেচের জন্য কৃষকদের ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এতে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে চলনবিলের পানি সঙ্কট ও মাছের প্রজননক্ষেত্র সঙ্কুচিত হওয়ায় মৎস্যসম্পদও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একসময় চলনবিলে ৭০ থেকে ৭৫ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। বর্তমানে অনেক প্রজাতির মাছের অস্তিত্ব হুমকির মুখে। কমেছে হাঁস পালন ও গবাদিপশুর খাদ্যের জোগানও।
নদীর বিভিন্ন অংশে দখল ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে। কোথাও নদীর জমিতে চাষাবাদ, কোথাও বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ চলছে। ফলে বড়ালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ও নাব্যতা পুনরুদ্ধার এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি চলনবিলের কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও নদীনির্ভর জনপদের জীবন-জীবিকা টিকিয়ে রাখতে বড়ালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। এ জন্য নদীর দখল উচ্ছেদ, অবৈধ বাঁধ অপসারণ, নাব্যতা পুনরুদ্ধার এবং স্লুইস গেটগুলোর কার্যকারিতা পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








