
দাদুকে বাড়ির মধ্যে চিৎকার করতে শুনে দৌড় দিয়ে এলাম, -কী হয়েছে দাদু? কী হয়েছে? চিৎকার করে আমার মায়ের উদ্দেশে বললেন,
-ছাগলকে ভাত দিতে হবে কেন? ভাত কি বেশি হয়ে গেছে? জমিদারের বেটি এসেছে বাড়িতে, ছাগলকে ভাত খাওয়ায়।
কথার জোর দেখে অবাক হওয়া লাগে।
৯৫ ঊর্ধ্ব বয়স, গায়ের রং শ্যামলা কালো- যেন পোড়া মাটির রং গায়ে মেখে নিয়েছেন বছরের পর বছর। মাথার চুল এবং দাড়ি ফকফকা সাদা, শীতের কুয়াশার মতো ঝুলে আছে মুখের চার পাশে। এখনো কুরআন পড়েন চশমা ছাড়াই। আর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ক্ষেত্রে তো ঘড়িও লাগে না- ফজরের সময় সেই দূরের মসজিদে আজান হওয়ার আগেই ওঠে যান, যেন তার বুকের ভেতরে একটি নিজস্ব আজান ধ্বনিত হয়।
দাদুর রুমে ভিন্ন বিছানায় শুয়ে থাকি আমি। যখন ওঠেন তখন একবার ডাক দেন আমাকে, ওয়াশরুম থেকে এসে আরেকবার, অজু শেষে আরেকবার; পরিশেষে পাঞ্জাবি পরে যাওয়ার সময় বিরক্তিসহ জোরে ডাক দিয়ে মসজিদের দিকে রওনা হন। আমিও উঠতে বাধ্য হই। আমার দাদু দুই পক্ষের নয় সন্তানের জনক। তিনি বেশ কিছু জিনিস সহ্য করতে পারেন না- তার মধ্যে অন্যতম হলো ভাত নষ্ট করা অথবা ছাগলকে খাওয়ানো। আজকে হঠাৎ আম্মুকে দেখেছেন ছাগলকে ভাত দিতে, তাই চিৎকার করে বাড়ির মাথায় তুলেছেন। আমার আম্মু জানেন, মানুষের বয়স হলে হুঁশ কমে যায়, তাই তিনিও আর কিছু মনে করেননি শ্বশুরের কথায়- চুপচাপ ঘরে চলে গেছেন, যেন ঝড়ের মুখে বাতি আড়াল করে নেয়া। আমি দাদুর রুমে গিয়ে বসলাম, আপনি আমার আম্মুকে এত বকা দেন কেন? -সাগর, ভাই আমার, শোনো! দেশ স্বাধীনের তিন বছর পরের কথা- চারিদিকে খাদ্যের ব্যাপক সঙ্কট, প্রখর রোদ, উষ্ণ আবহাওয়া। আমি মাঠের পথে হাঁটছি, মাথায় গামছায় বাঁধা কয়েকটি গমের শুকনো রুটি, সময়টা উত্তপ্ত দুপুর। চারিদিক ধু ধু করছে। -দুপুরবেলা রুটি নিয়ে গেছিলেন কেন দাদু? আমরা তো প্রতিদিন দুপুরে ভাত খাই। -উচ্চবিত্ত পরিবার ছাড়া কারো ঘরে চাল ছিল না, ভাত কোথা থেকে আসবে! তাই তোমার চাচাদের জন্য রুটি নিয়ে যাচ্ছিলাম। মাঠের নাম ‘বাতাসবোনা’- সব সময় বাতাস বয় তাই হয়তো এই নাম। বিস্তৃত একটি মাঠ, বর্গাকার জমিগুলো ক্রমান্বয়ে ঢালু হতে হতে কিছুটা দূরে একটি দিঘি বয়ে গেছে। এ দিঘির সংযোগ আছে মহানন্দা নদীর সাথে, কিন্তু পানি নেই- সর্বনিচু জায়গার মাটি ফেটে চৌচির, আকাশের দিকে তাকিয়ে হা করে আছে; যেন তৃষ্ণার্ত কোনো জীবন্ত সত্তা ঊর্ধ্বমুখে মুখ তুলে বৃষ্টির ভিক্ষা চাইছে - ক্ষুধা! তাদের অনেক ক্ষুধা! দিঘির ওপারে আরো একটি বিস্তৃত বড় মাঠ, যেটা বিরামপুর ও সুন্দরপুরের মানুষদের চাষের স্থান। যাই হোক, বাতাস বোনার মাঠে সেবার গম চাষ করেছিলাম। গমের আইল দিয়ে হাঁটছি- গমের ফলন ভালো হয়নি, দানাগুলো চুনি চুনি হয়ে গেছে, যেন শস্যের ভেতর থেকেই প্রাণটুকু শুষে নিয়েছে খরা। মাঝে মাঝে বাতাসের ঝাপটা আসছে, হলদে-শুকনা গমের গাছগুলো প্রাণবন্ত নাচার চেষ্টা করছে- দীর্ঘদিন পানির ছোঁয়া নেই, তাই খসখস শব্দ করে নড়ে উঠছে, যেন কঙ্কালের হাড়ে হাড়ে বাজছে বেদনার সুর। প্রচণ্ড রোদের তাপে পায়ের নিচের মাটিও যেন জ্বলন্ত চুলার মতো গরম হয়ে গেছে। সূর্য এবং মাটির তাপে উষ্ণ বাতাসের ঝাপটা যেন চোখ-মুখ ঝলসে দিচ্ছে। পুরো মাঠের মাঝ বরাবর একটি হিজল গাছ আছে- চারিদিক শুকনা হলুদের মাঝে এই গাছটার পাতা কেন যেন সবুজ হয়ে আছে, যেন মরুর বুকে একফোঁটা জীবনের চিহ্ন। কয়েকটি শালিক গাছের ডালে বসে বিশ্রাম নিচ্ছে। সেই হিজল গাছের ছায়ায় দুপুরে মানুষ আসে বিশ্রাম নেয়ার জন্য; কিছুক্ষণ বসে থেকে আবার কাজে লেগে যায়। বুকের হাড় বেরিয়ে পড়া কৃষকের প্রাণের সঞ্চার হয় এ গাছের নিচেই। বেশ কয়েকটা পানির বোতল গাছের নিচে রাখা আছে, যেন ঠাণ্ডা থাকে। কিন্তু আকাশ-মাটি যেখানে উত্তপ্ত- পানি ঠাণ্ডা থাকবে কীভাবে! ছায়ার ওসিলায় টগবগ করে ফুটছে না- এটাই কৃষকের সৌভাগ্য। শরীরের চামড়াও যেন ছোট ছোট ছিদ্রওয়ালা জাল হয়ে গেছে- পানি খাওয়ার সাথে সাথেই কিছুক্ষণের মধ্যে বেরিয়ে যায়। তাদের ঘাম পাহাড়ি ঝরনার মতো না হলেও ঝরঝর করে ঝরে পড়ে। রংটা হয়তো পানির মতোই, কিন্তু এটা পানি নয়- এটা রক্ত। দুপুরে এই গাছের নিচেই খাওয়া-দাওয়া। -চাচারা কী কাজ করছিল? -গম কাটছিল। আমাকে দেখে তারা কাজে বিরতি দিয়ে গাছের নিচে এলো, খাওয়া-দাওয়া শুরু করল। পাশেই চৌধুরী বাড়ির ছেলেরা ভাত খাচ্ছিল। আর আমার ছেলেরা খাচ্ছিল রুটি।
চৌধুরীর বড় ছেলে আমাকে উদ্দেশ করে বলল : মামা, খাওয়া-দাওয়া শেষ করে অল্প কিছু ভাত বেঁচে গেছে; আপনি মুখে দিয়ে নিন। ভাতের গামলাটা আমার দিকে এগিয়ে দিচ্ছিল, এমন সময় আমার এক ছেলে বলে উঠল- ইস! আমরা যদি ভাত কয়টা খেতে পারতাম, কলিজাটা ভরে যেত!
তিন ভাইয়ের সর্বোচ্চ দুই গ্রাস করে মুখে দেয়ার মতো পরিমাণ- এতটুকুই আছে গামলায়, তাতেই শেষ। সেই ভাতের গামলাটা তাদের দিকে এগিয়ে দিয়ে আমি একটু দূরে গিয়ে গমের আইলে বসে পড়লাম। উত্তপ্ত রোদে ঝলসানো চেহারা, মুখে গামছা চেপে ধরলাম- চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় পানি পড়তে লাগল, যেন বহুদিনের জমানো মেঘ হঠাৎ ভেঙে পড়েছে।
-আল্লাহ! আমাকে ধন দাওনি, জন দিয়েছ। তাদের হাহাকার শুনে আমার কলিজা ফেটে যায়। চারিদিকে অনেক অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে। এত হাহাকার, এত অভাব, এত উত্তপ্ত আবহাওয়া- তারপরও বেঁচে আছি! শুকরিয়া। তাদের দুই বেলা ভাত দেওয়ার সামর্থ্য আমার নেই, কিন্তু কোনো অভিযোগ করব না। শুধু দোয়া করি- আমি বেঁচে থাকতে অন্তত এই দৃশ্য যেন দেখতে পাই, আমার সন্তানরা দুই বেলা ভাত খেয়ে জীবনযাপন করছে। এমন জীবন দেখার তৌফিক দিও। আমি দেখলাম, সত্যি সত্যি দাদুর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে এবং শেষের কথাগুলো বলতে গিয়ে অনেক আবেগে আপ্লুত হয়ে গেছেন। এই দুর্ভিক্ষের ক্ষতগুলো যেন দাদুর চোখে-মুখে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে- যেন বলিরেখার প্রতিটি ভাঁজে লুকিয়ে আছে সেই দুপুরের পোড়া রোদ, সেই গমের আইলের ধুলো, সেই ছেলেদের ক্ষুধার্ত চোখের ছায়া। কত ক্ষুধা, কত অসহায়ত্ব, কত নিঃশব্দ কান্না, কত প্রাণের মৃত্যু ঘটে গেছে সেই সময়। -তোমার মা আজকে ছাগলকে ভাত খাওয়ায়, অথচ সেই কটা ভাতের জন্য আমার ছেলেরা একসময় হাহাকার করেছে।
ক্ষুধার তাড়নায় শুকনো রুটি শুধু পানিতে ভিজিয়ে ভিজিয়ে খেয়েছে। আমিও এক চাচার মুখে শুনেছিলাম- ছোট ছোট গমের রুটি পানিতে ভিজিয়ে একবারে মুখে পুরে দিতেন। আমার হাসি পেত, আবার অবাকও হতাম- একটি গমের রুটি পানিতে ভিজিয়ে একবারেই মুখে কিন্তু সেটা যে ক্ষুধার তাড়নায় ছিল, বুঝিনি।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








