ট্রাম্পের ক্ষমতার পুরো তত্ত্বটিই এখন ধূলিসাৎ

 নয়া দিগন্ত ডেস্ক 

Advertisement

অন্য যেকোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের তুলনায় ট্রাম্প ভয়কে তার নীতিনির্ধারণের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তবে এখন তাকে আর ততটা ভীতিজনক মনে হচ্ছে না। এখন সকালে আপনি যে শোঁ শোঁ বা গুড়গুড় শব্দ শুনতে পাচ্ছেন, তা আসলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজ থেকে ক্ষমতার নিঃশেষ হয়ে যাওয়ারই ইঙ্গিত।  ২০২৬ সালের নির্বাচনের ফলাফল  এমন এক বিপর্যয়, যা এই শতাব্দীতে আর দেখা যায়নি। যেকোনো প্রেসিডেন্টের জন্যই এটি হতো চরম বিপর্যয়কর। আর ট্রাম্পের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। 
মার্কিন ইতিহাসে ট্রাম্প এক অনন্য চরিত্র- একজন আধা-স্বৈরাচারী নেতা, যার বিশেষ ধরনের ক্ষমতার চর্চা মধ্যবর্তী নির্বাচনের তার দলের যে শোচনীয় পরাজয় ঘটেছে, তার সাথে কোনোভাবেই খাপ খায় না। 
ক্ষমতা নিয়ে তার মূল তত্ত্বটিই এখন ধূলিসাৎ। তার প্রেসিডেন্ট হিসেবে টিকে থাকাটা এখন নির্ভর করছে পরিবর্তিত ও সঙ্কুচিত পরিস্থিতির সাথে তিনি নিজেকে কতটা মানিয়ে নিতে পারেন তার ওপর- এমন এক কাজ যা তিনি আগে কখনো করেননি। 
ট্রাম্পের জন্য মূল সমস্যা হলো, শাসনকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে তার সবচেয়ে প্রিয় হাতিয়ার হলো ‘ভয়’। তার দ্বিতীয় মেয়াদের গত ২২ মাস কেটেছে নিজেকে অপরাজেয় ও নির্মম হিসেবে তুলে ধরার প্রচেষ্টায়। তিনি প্রভাবশালী ব্যক্তি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, এমনকি বিদেশী রাষ্ট্রগুলোর সামনে একটি বিকল্প দাঁড় করিয়েছিলেন : হয় ট্রাম্পের শর্ত মেনে শান্তিতে থাকো, নতুবা পরিণাম ভোগের জন্য প্রস্তুত হও। 
বিশ্বের বৃহত্তম কোম্পানি, আমেরিকার সবচেয়ে ধনী বিশ্ববিদ্যালয় এবং দীর্ঘদিনের মিত্রদের ওপর চাপিয়ে দেয়া এ কৌশলটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ট্রাম্পের পক্ষে কাজ করেছে। রাজনৈতিক নির্বাসন থেকে ফিরে আসা এক প্রেসিডেন্ট, যিনি প্রতিশোধ নেয়ার হুমকি দিচ্ছেন এবং আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি আমেরিকানের সমর্থন নিয়ে ফিরে এসেছেন- এমন পরিস্থিতিতে অনেক করপোরেট নির্বাহী, কূটনীতিক, সামরিক জেনারেল ও প্রধানমন্ত্রী তার কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। 
‘ট্রাম্প-যুগের’ এই অধ্যায়ে অভিজাত রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি ছিল এটিই। এভাবেই ট্রাম্প বিদেশী রাষ্ট্র ও প্রযুক্তি জায়ান্টদের কাছ থেকে বিশাল বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি আদায় করেছেন, নিজের এজেন্ডার বিরুদ্ধে করপোরেট সমালোচনা থামিয়েছেন, হোয়াইট হাউজের নতুন বলরুমের জন্য তহবিল সংগ্রহ করেছেন, এমনকি ন্যাটো মহাসচিবকে দিয়ে তাকে ‘ড্যাডি’ (বাবা বা অভিভাবক) বলে সম্বোধন করিয়েছেন। তার অভিষেক অনুষ্ঠানে জড়ো করেছিলেন কঠোর ও গম্ভীর মুখের বিলিয়নেয়ারদের এক বিশাল সারি। 
আর এখন, সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। রিপাবলিকানদের পরাজয়ের ব্যাপকতা ও গভীরতা একজন ‘শক্তিশালী নেতা’ (স্ট্রংম্যান)-এর জন্য অপরিহার্য সেই অজেয় ভাবমর্যাদাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে- যে ধারণাটি হলো, প্রতিপক্ষ যা-ই করুক বা আদালত যা-ই বলুক না কেন, দিনশেষে তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতেই থাকবেন, রাষ্ট্রীয় যন্ত্র থাকবে তার মুঠোয়, আর তিনি মনে রাখবেন কে তার বন্ধু আর কে শত্রু। 
রাজনৈতিক জোট ভেঙে পড়ার মুখে এবং টেক্সাস, কানসাস ও সাউথ ক্যারোলিনার মতো অঙ্গরাজ্যেও ডেমোক্র্যাটদের অগ্রযাত্রার প্রেক্ষাপটে, ট্রাম্পকে আর আগের মতো অটল বা স্থায়ী বলে মনে হচ্ছে না। এই বড় পরিবর্তনের তুলনায় প্রতিনিধি সভা (হাউজ) ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানোটা যেন গৌণ বিষয়। 
পররাষ্ট্রনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও ফেডারেল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর ট্রাম্পের এখনো ব্যাপক কর্তৃত্ব রয়েছে। একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের- এমনকি অত্যন্ত অজনপ্রিয় কোনো প্রেসিডেন্টের- সাথে দ্বন্দ্বে জড়ানো মোটেও সহজ বিষয় নয়। তার জারি করা নির্বাহী আদেশগুলো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা সরকারি সংস্থাগুলোর কার্যক্রম ওলটপালট করে দিতে পারে, যদিও শেষ পর্যন্ত আদালত হয়তো সেগুলো বাতিল করে দেবে। ইরান, গ্রিনল্যান্ড বা অন্য যেকোনো জায়গায় যুদ্ধ শুরু করা থেকে ট্রাম্পকে বিরত রাখার ক্ষেত্রে নতুন কংগ্রেসের খুব একটা কিছু করার সুযোগ নেই। 
তবুও ওয়াশিংটন বা তার বাইরের নেতাদের জন্য ট্রাম্পের সাথে লেনদেনের ক্ষেত্রে ঝুঁকির হিসাব এখন বদলে গেছে। ট্রাম্পের দেয়া প্রলোভন বা হুমকির একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ (এক্সপায়ারেশন ডেট) রয়েছে, যা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আর ট্রাম্পের নিয়ম মেনে চলার নেতিবাচক দিকগুলোও এখন অত্যন্ত প্রকট। 
হোয়াইট হাউজের চাপে থাকা কোনো সিইও বা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্টকে এখন নতুন করে ভেবে দেখতে হবে- প্রেসিডেন্টের বিরোধিতা করা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, নাকি ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের (এবং সম্ভবত ২০২৯ সালে পরবর্তী প্রেসিডেন্টের বিচার বিভাগের) কঠোর নজরদারির মুখে পড়া বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। 
ট্রাম্পের চাপে পড়ে কোনো বাণিজ্যিক চুক্তিতে ছাড় দিতে বাধ্য হওয়া বিদেশী নেতাদের এখন ভাবতে হবে- ট্রাম্পের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, নাকি সেসব আমেরিকানের আস্থা বজায় রাখা, যারা ট্রাম্পের রক্ষণশীল (প্রোটেকশনিস্ট) নীতিগুলোকে প্রত্যাখ্যান করেছে। 
মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন উভয় দলের জন্যই একটি সতর্কবার্তা? 
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছিলেন যে, ট্রাম্পের সাথে কোনো প্রতিকূল বাণিজ্যিক চুক্তিতে জড়ানোর চেয়ে তিনি বরং নতুন কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য অপেক্ষা করাকেই শ্রেয় মনে করেন। গত শুক্রবার, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজেদের মধ্যে অংশীদারত্ব জোরদার করার পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্প যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দিয়েছিলেন, তিনি তা গুরুত্বই দেননি। কার্নি পলিটিকোকে বলেন, ‘এ পথে এগোনো মানে বোকামি’। কার্নির সহকর্মীদের কাছে আজ এই যুক্তি আরো বেশি গ্রহণযোগ্য বলে মনে হওয়ারই কথা। 
আজ কাকে বেশি বিচক্ষণ বলে মনে হচ্ছে- সেসব সিইওদের, যারা ট্রাম্পের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উচ্ছ্বসিত ছিলেন এবং তার বলরুমের আয়োজনে অর্থায়ন করেছিলেন; নাকি জেপি মরগানের জেমি ডাইমনকে, যিনি এক বছর আগেই সিএনএনকে বলেছিলেন যে তিনি এমন কোনো অনুদান দেয়া থেকে বিরত থাকছেন, যা দেখে মনে হতে পারে যে তিনি ‘সুবিধা কিনে নিচ্ছেন’? 
ডাইমন তখন বলেছিলেন, তার কোম্পানিকে ভেবে দেখতে হচ্ছে যে, ‘পরবর্তী বিচার বিভাগ  বিষয়টি কিভাবে দেখবে।’ 
ট্রাম্প আগেও পরাজয়ের মুখোমুখি হয়েছেন। ২০১৮ সালে তিনি প্রতিনিধি পরিষদের (হাউজ) নিয়ন্ত্রণ হারান এবং দুই বছর পর প্রেসিডেন্ট পদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণও হারান। তবুও এর আগের কোনো নির্বাচনেই ‘মাগা’ মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন সমর্থক গোষ্ঠী এবং গ্রামীণ আমেরিকার ওপর ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি। এখন পর্যন্ত কোনো নির্বাচনই তাকে রাজনীতির মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে বাধ্য করেনি। 
এখন ট্রাম্পকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, ৮০ বছর বয়সে এবং নিজের শেষ মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে দাঁড়িয়ে তিনি অন্য কোনো পথ অবলম্বন করবেন কি না। 
তিনি এখন এমন এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে তাকে একটি সিদ্ধান্ত নিতেই হবে : হয় বুধবার সকালের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে, নতুবা তার প্রেসিডেন্ট মেয়াদের অবশিষ্ট অংশটুকুও হারাতে হবে।