
ক্রীড়া ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসন, ২০১৬ সালের উয়েফা ইউরো জয় এবং ২০১৯ ও ২০২৫ সালে ন্যাশন্স লিগ শিরোপা উঁচিয়ে ধরা। পর্তুগালকে ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট এনে দেয়া, একমাত্র ফুটবলার হিসেবে ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার অবিশ্বাস্য কীর্তি। অসংখ্য ব্যক্তিগত ও দলীয় রেকর্ডে ক্যারিয়ারকে আলোকোজ্জ্বল করা। তিনি আর কেউ নন, পর্তুগিজ মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। মাঠের ভেতরে অতিমানবীয় পারফরম্যান্স, হার না মানা মানসিকতা এবং অবিশ্বাস্য ফিটনেস বিশ্বজুড়ে তরুণ প্রজন্মের অগণিত ফুটবলারের অনুপ্রেরণার উৎসকে আর দেখা যাবে না আন্তর্জাতিক ফুটবলে। আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সিআর সেভেন। তার অবসরগ্রহণের সিদ্ধান্তে একটি মহাকাব্যিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটতে চলেছে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে।
দীর্ঘ ২৩ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার ঘোষণা দিয়েছেন পাঁচবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী এই ফুটবলার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক আবেগঘন বার্তায় গতকাল জাতীয় দলের সাত নম্বর জার্সি ফিরিয়ে দেয়ার কথা জানিয়েছেন ৪১ বছর বয়সী এই তারকা। এর মধ্য দিয়ে ঘটতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক ফুটবলের অন্যতম সফল ও বর্ণাঢ্য একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি।
রোনালদো তার বিদায়ী বার্তায় লিখেছেন, ‘সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না। কারণ, কিছু সিদ্ধান্ত শুধু মাথা দিয়ে নেয়া যায় না, হৃদয়ের অনুভূতিও সেখানে জড়িয়ে থাকে। পর্তুগালের সাত নম্বর জার্সি ২৩ বছর ধরে পরার সুযোগ ও দায়িত্ব পাওয়া ছিল জীবনের বিশেষ অর্জন। কৃতজ্ঞতা জানাই সতীর্থ, কোচ, সমর্থক ও পরিবারের সদস্যদের। সব সময় আমার হৃদয়ে থাকবে পর্তুগাল।’
২০০৩ সালের আগস্টে কাজাখস্তানের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক হয়েছিল রোনালদোর। তখন তার বয়স মাত্র ১৮ বছর। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক গোল, রেকর্ড আর সাফল্যে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। পর্তুগালের হয়ে ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল করেছেন তিনি। পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা ও সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড দু’টিই তার দখলে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার ধারে কাছে নেই আর কোনো গোলদাতা।
রোনালদোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্য ২০১৬ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জয়। ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল তাকে। তবে সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে সতীর্থদের উৎসাহ জুগিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ফরাসিদের হারিয়ে প্রথমবারের মতো ইউরোর শিরোপা জেতে পর্তুগাল। অধিনায়ক হিসেবে সেটিই ছিল তার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অর্জন। এরপর ২০১৯ ও ২০২৫ সালে উয়েফা ন্যাশন্স লিগের শিরোপাও জিতেছেন তিনি।
বিশ্বকাপেও অসাধারণ কিছু কীর্তি রয়েছে রোনালদোর। ২০০৬ সালে জার্মানিতে প্রথম বিশ্বকাপ খেলেন আল নাসর অধিনায়ক। এরপর ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও সব শেষ ২০২৬ বিশ্বকাপ। এই টানা ছয়টি বিশ্বকাপে খেলেছেন তিনি। লিওনেল মেসির সাথে ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নেয়া খেলোয়াড়দের তালিকায় রয়েছেন এই পর্তুগিজ তারকা। বিশ্বকাপের ছয় আসরেই গোল করার বিরল কীর্তিও গড়েছেন তিনি। যদিও বিশ্বকাপের শিরোপা জেতা হয়নি তার। ২০০৬ সালে চতুর্থ স্থান অর্জনই বিশ্বকাপে পর্তুগালের হয়ে সেরা সাফল্য রোনালদোর।
ব্যক্তিগত অর্জনেও অনন্য রোনালদো। পাঁচবার জিতেছেন ব্যালন ডি’অর। পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন লিগে গড়েছেন অসংখ্য গোলের রেকর্ড। ক্যারিয়ারে ইতোমধ্যে ৯৮৫-তে পৌঁছেছে গোলসংখ্যা। হাজার গোলের ঐতিহাসিক মাইলফলক ছোঁয়ার লক্ষ্য নিয়েই এখনো ক্লাব ফুটবলে খেলছেন তিনি।
রোনালদোর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের পেছনে আলোচনায় এসেছে সাম্প্রতিক সময়ে পর্তুগালের কোচ জর্জ জেসুসের সাথে মতবিরোধের ঘটনাও। সেপ্টেম্বরে জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে চলে যাওয়ার ঘটনা এবং পরবর্তী সময়ে শাস্তির মুখে পড়েছিলেন তিনি। তবে অবসরের ঘোষণায় নিজের ২৩ বছরের পথচলা, সমর্থকদের ভালোবাসা ও দেশের প্রতিনিধিত্ব করার গর্বকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় নিলেও এখনই বুটজোড়া তুলে রাখছেন না রোনালদো। আল নাসরের হয়ে ক্লাব ফুটবলে খেলা চালিয়ে যাবেন তিনি। ফলে জাতীয় দলের জার্সিতে আর দেখা না গেলেও তার উপস্থিতি থাকছে ফুটবল মাঠে। পর্তুগালের সাত নম্বর জার্সি এবার নতুন কারো গায়ে উঠলেও দেশটির ফুটবল ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে ২৩ বছরের রোনালদো-অধ্যায়।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








