মোংলায় ৪০৬৮ কোটি টাকার প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন প্রধানমন্ত্রীর
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন : নয়া দিগন্ত ।

মোংলা (বাগেরহাট) সংবাদদাতা

Advertisement

মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নে চার হাজার ৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের ৯ নম্বর জেটিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘মোংলা বন্দরের সুবিধাদির সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তিনি।
প্রকল্পের আওতায় বন্দরে দু’টি আধুনিক জেটি, কনটেইনার ইয়ার্ড, বিপজ্জনক পণ্যবাহী কনটেইনার রাখার ইয়ার্ড এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হবে। চার বছর মেয়াদি প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বন্দরের বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা চার লাখ টিইইউতে উন্নীত হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এছাড়া প্রকল্পের আওতায় ৩৬৮ মিটার দীর্ঘ ও ৪০ মিটার প্রশস্ত জেটি নির্মাণ করা হবে। সেখানে একসাথে ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার দু’টি জাহাজ অথবা ৫০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার একটি জাহাজ ভেড়ানো যাবে। এ ছাড়া দুই লাখ ২৭ হাজার বর্গমিটার এলাকায় কনটেইনার ইয়ার্ড, অভ্যন্তরীণ সড়ক, প্রশাসনিক ভবন ও কনটেইনার ফ্রেইট স্টেশন নির্মাণ করা হবে। কনটেইনার ওঠানো-নামানোর জন্য শোর-টু-শিপ ক্রেনসহ ৪৯টি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি যুক্ত করারও পরিকল্পনা রয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রতি ঘণ্টায় ৩০টি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা তৈরি হবে। এতে কনটেইনার সংরক্ষণের জায়গা বাড়ার পাশাপাশি পণ্য ওঠানো-নামানোর ব্যয়ও কমবে।
চীনের অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিসিইসিসি)। গত ১০ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকার ও চায়না এক্সিম ব্যাংকের মধ্যে প্রায় তিন হাজার ৫৯২ কোটি ৯০ লাখ টাকার ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর আগে ২০২৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। একই বছরের ২৫ মার্চ চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাথে বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
অনুষ্ঠানে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো: রাজিব আহসান, বন, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলামসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও চীনা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সভাপতিত্ব করেন মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা।
বন্দর কর্তৃপক্ষের আশা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দরের জাহাজ ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়বে। একই সাথে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য, শিল্প বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
উল্লেখ্য, এই প্রকল্পে ৩৫৯৩ কোটি টাকা চায়না প্রতিষ্ঠান এবং ৪৭৫ কোটি টাকা বাংলাদেশ সরকার বহন করবে। 
শিশুদের ভালোভাবে লেখাপড়ার ব্যবস্থা করব  : প্রধানমন্ত্রী
খুলনা ব্যুরো জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিশু-কিশোরদের উদ্দেশ করে বলেছেন, এই বাংলাদেশের মালিক তোমরা। এ দেশটাকে তোমাদের গড়ে তুলতে হবে। সে জন্য তোমাদের লেখাপড়ার সাথে আর্ট-কালচার জানতে হবে, স্পোর্টস জানতে হবে। আর বাংলা ও ইংরেজি ভাষার সাথে আরো একটি ভাষাও শিখতে হবে।   
মাত্র ছয় মিনিটের বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, তোমরা প্রত্যেকে ভালোভাবে যাতে লেখাপড়া করতে পারো, সে ব্যবস্থা আমরা করব। শুধু লেখাপড়া করলেই চলবে না। লেখাপড়া করে কেউ ডাক্তার হবে, কেউ ইঞ্জিনিয়ার হবে, কেউ আর্কিটেক্ট হবে, কেউ ল ইয়ার হবে। কিন্তু বিকেএসপির ছোট বন্ধুরা যে রকম দেখিয়েছে, খেলাধুলা, কালচার, আর্ট ঠিক একসাথে যেমন পারছে, আমাদের ছোট বন্ধুদের লেখাপড়ার পাশাপাশি সেগুলোতেও ভালো করতে হবে। কারণ তোমরা শুধু লেখাপড়া দিয়েই বিশ্বকে জয় করতে পারবে না। 
গতকাল বিকেলে খুলনা জেলা স্টেডিয়ামে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস সিজন-২-এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী শিশু-কিশোরদের প্রশ্ন করে বলেন, তোমরা কি জানো, এই যে নতুন কুঁড়ি  স্পোর্টস সিজন-২ যেটির জুন মাসে ফাইনাল হবে, সেখানে ১৬ লাখ ছোট বন্ধু পার্টিসিফেশন করেছে। তোমরা কিন্তু প্রমাণ করে দিয়েছো, তোমরা পারো। তোমরা যেমন পড়ালেখা করতে পারো, তোমরা যেমন খেলাধুলা করতে পারো, তোমরা একইভাবে আর্ট অ্যান্ড কালচারালও তোমরা পারো। বন্ধুরা তোমাদেরকে পারতে হবে, কারণ এই বাংলাদেশটাকে সুন্দরভাবে তোমাদেরকেই গড়ে তুলতে হবে। 
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে, আস্তে আস্তে তোমাদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া। তোমরা যদি আমার সাথে থাকো, আস্তে আস্তে সেই সুযোগ ও পরিস্থিতি সৃষ্টি করে দেবো। তিনি বলেন, আজকে যে ১০টি স্পোর্টস আইটেম ছিল, যার যেটি ভালো লেগেছে করেছে। তোমরা যেমন বাংলা বলবে, ইংরেজি বলবে, সাথে সাথে আরো ছয়/সাতটি ল্যাঙ্গুয়েজ থাকবে। সেই ল্যাঙ্গুয়েজ থেকে তোমাদেরকে একটি বেছে নিতে হবে। তাহলে তোমরা যদি লেখাপড়ায় ভালো হও, তোমরা যদি স্পোর্টসে ভালো হও, সেই সাথে তোমরা যদি আরেকটি থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ শিখো তাহলে তোমাদেরকে পৃথিবীর কোনো জাতি আটকে রাখতে পারবে না। 
নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস সিজন-২ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। স্বাগত বক্তৃতা করেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মাহফুজুল আলম খান। 
এর আগে জেলা স্টেডিয়ামে প্রবেশ করে প্রধানমন্ত্রী গ্যালারিতে অবস্থান নেয়া শিক্ষার্থী ও ক্রীড়াবিদদের কাছে এগিয়ে যান। তাকে কাছে পেয়ে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে হাজারো শিশু-কিশোর। তারা করতালি ও হাত নেড়ে প্রধানমন্ত্রীকে অভিবাদন জানান। তিনিও হাত নেড়ে তাদের শুভেচ্ছার জবাব দেন। এ সময় স্টেডিয়ামজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। 
এরপর প্রধানমন্ত্রী জাতীয় পতাকা উত্তোলনের পর বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে নতুন কুঁড়ির উদ্বোধন করেন। তিনি নতুন কুঁড়ির ১০টি স্পোর্টস আইটেমে অংশগ্রহণকারীদের সাথে পরিচিত হন। প্রধানমন্ত্রী মঞ্চে আসন নেয়ার পর চীনের শিক্ষার্থীদের পরিবেশিত দেশটির ঐতিহ্যবাহী ড্রাগন ও লায়ন ড্যান্স এবং বাংলাদেশের ১০টি অঞ্চলের সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী উপভোগ করেন। এরপর তিনি ৪০ জন ছাত্রছাত্রীকে বিকেএসপিতে ভর্তির অফার লেটার প্রদান করেন। অনুষ্ঠান শেষে খুলনা জেলা স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণে একটি গাছের চারা রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী। পরে তিনি খুলনা সার্কিট হাউজ মাঠে যান। সেখানে পুরো মাঠ প্রদক্ষিণ করে সমবেত সাধারণ মানুষের সাথে কুশল বিনিময় ও হাত মেলান। বিকেল ৫টা ২২ মিনিটে হেলিকপ্টারে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন।
এবারের নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসে সারা দেশ থেকে ১৬ লাখ ২৩ হাজার ২১৮ জন প্রতিযোগী অনলাইনে নিবন্ধন করেছে। আগের আটটি ইভেন্টের সাথে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ভলিবল ও টেবিল টেনিস। ফলে মোট ১০টি ক্রীড়া ইভেন্টে অংশ নেয়ার সুযোগ পাচ্ছে ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু-কিশোররা।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী জেলা স্টেডিয়ামে যাওয়ার পথে খুলনা মহানগরীর প্রাণকেন্দ্র ডাকবাংলো মোড়ে পথসভায় বক্তৃতা করেন।
মানলেন না প্রটোকল, জনগণের সাথে মিশে গেলেন প্রধানমন্ত্রী : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খুলনা প্রবেশের সময় রূপসা উপজেলার তিলক কুদির বটতলায় প্রটোকল ভেঙে মিশলেন সাধারণ মানুষের সাথে, হাত মেলালেন সর্বস্তরের সাথে।
গতকাল প্রধানমন্ত্রীর খুলনা সফর উপলক্ষে মহানগরীর প্রবেশদ্বার রূপসা উপজেলার তিলক কুদির তলায় নির্মিত হয় পথসভা মঞ্চ। তাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে মঞ্চে নেয়ার জন্য গঠিত হয় তিন সদস্যের টিম। বেলা ২টা ১৬ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ বাস এসে থামে পথসভা মঞ্চের পাশে। অভ্যর্থনায় দায়িত্বে থাকা নেতৃবৃন্দ তার কাছে পৌঁছানোর আগেই গাড়ি থেকে নেমে প্রধানমন্ত্রী মিশে যান সাধারণ মানুষের সাথে। কোনো প্রটোকল না মেনে জনগণের সাথে হাত মেলাতে থাকেন।
তার এই আচরণে আনন্দে উদ্বেলিত হয় দলীয় নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ। পথসভাস্থলে উপস্থিত অনেককেই বলতে শোনা যায়, বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এমন প্রধানমন্ত্রী এই প্রথম। যিনি কোনো সভা-সমাবেশে গেলে মঞ্চে ওঠার আগেই জনগণের সাথে হাত মেলান। পরে তিনি মঞ্চে উঠে বক্তৃতা করেন। 
এর আগে সকালে তিনি মোংলা, বাগেরহাটে উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। সভা শেষে তিনি বেলা ২টা ৩৪ মিনিটে খুলনা স্টেডিয়ামে নতুন কুঁড়ি সিজন-২ উদ্বোধনের লক্ষ্যে যাত্রা করেন। এ সময় কুদির বটতলা থেকে খানজাহান আলী ব্রিজ পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ প্লাকার্ড তুলে হাত নেড়ে প্রধানমন্ত্রীকে অভিবাদন জানান।