ভৈরব-ময়মনসিংহ রুটে ৬ বছর ধরে বন্ধ লোকাল ট্রেন

আহসানুল হক জুয়েল নিকলী (কিশোরগঞ্জ)

Advertisement

২০১৯ সালের শেষ দিকে করোনা মহামারির সময়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেসরকারি খাতে পরিচালিত ট্রেন ও লোকাল ট্রেন চলাচল স্থগিত করে। পরবর্তীতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বিভিন্ন রুটে ট্রেনগুলো পুনরায় চালু হলেও ব্যতিক্রম রয়ে গেছে ময়মনসিংহ-ভৈরব রেলপথ। এ রুটের মেইল ট্রেন ‘ঈশা খাঁ এক্সপ্রেস’ (যা ঢাকা থেকে ভৈরব হয়ে ময়মনসিংহ যেত) এবং দু’টি লোকাল ট্রেন গত দীর্ঘ ছয় বছর ধরে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে চালুর কোনো কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন এ জনপদের সাধারণ মানুষ।
এরই মধ্যে গত ২৪ আগস্ট থেকে ইঞ্জিন সঙ্কট দেখিয়ে টাঙ্গাইল থেকে ময়মনসিংহ, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ ও ভৈরব হয়ে চট্টগ্রামগামী ‘নাসিরাবাদ এক্সপ্রেস’ মেইল ট্রেনটিও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ট্রেনটি নিয়মিত চলার পরিবর্তে মাসে মাত্র দুই-তিন দিন চলাচল করছে। দীর্ঘদিন ধরে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় এ অঞ্চলের শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও রোগীরা মারাত্মক বিপাকে পড়েছেন। ময়মনসিংহ-ভৈরব ১১৬ কিলোমিটার রেলপথে ঈশ্বরগঞ্জ, নীলগঞ্জ, যশোদলপুর, বাজিতপুর, নান্দাইল, আঠারবাড়ী, সরারচর, হালিমপুর, কুলিয়ারচর, ছয়সূতি, গৌরীপুর এবং ভৈরবের কালিকাপ্রসাদসহ উভয় জেলার অন্তত ২২টি রেলওয়ে স্টেশন দীর্ঘদিন ধরে প্রাণহীন পড়ে আছে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, লোকাল ট্রেনে সর্বনিম্ন ভাড়া পাঁচ টাকা এবং মেইল ট্রেনে ১৫ টাকা। ময়মনসিংহ-ভৈরব রুটে লোকাল ট্রেনের ভাড়া ৪০ টাকা ও মেইল ট্রেনের ভাড়া ৫৫ টাকা হলেও আন্তঃনগর ট্রেনে গুনতে হয় ১২৫ টাকা। স্বল্প আয়ের মানুষেরা জানান, বাসভাড়া ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তাদের জন্য স্বল্প খরচে যাতায়াতের একমাত্র ভরসা ছিল এ লোকাল ট্রেনগুলো।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, লোকাল ট্রেনগুলো প্রতিটি স্টেশনে যাত্রা বিরতির ফলে কৃষিপণ্য ও মনিহারি জিনিসপত্র সহজে পরিবহন করা যেত। দুধ, ডিম, কলা, শাকসবজি থেকে শুরু করে বিভিন্ন পণ্য পাইকারেরা স্বল্প খরচে বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করতে পারতেন। ফলে স্বল্প পরিসরে বিভিন্ন পণ্য পরিবহন করা যেত। ট্রেনগুলো চালু থাকলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অনেক উপকার হতো। চিকিৎসা নিতে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যাতায়াতকারী রোগীরাও পড়েছেন বিপাকে। কালিকাপ্রসাদ, হালিমপুর, নীলগঞ্জ, মুসল্লি, বুখাইনগর ও নান্দাইলের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলো বন্ধ থাকায় সেখানে মূল্যবান সরকারি সম্পদ নষ্ট হচ্ছে এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
নিকলীর আবদুুল হালিম, বাজিতপুরের কফিল উদ্দিন, কিংবা সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন দিলীপের মতো ভুক্তভোগীরা জানান, বাসযাত্রার তুলনায় ট্রেনযাত্রা অনেক বেশি নিরাপদ ও সাশ্রয়ী। অথচ রেলওয়ের দায়িত্বহীনতা ও উদাসীনতার কারণে এ অঞ্চলের মানুষ কাক্সিক্ষত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তবে অনেকের দাবি আশানুরূপ যাত্রী না পাওয়া ও বিনা টিকেটের ভ্রমণের কারণেই এ সেবা বন্ধ হয়েছে। যাত্রী ও স্থানীয় সুধী সমাজের দাবি, অবিলম্বে ঈশা খাঁ এক্সপ্রেস ও নাসিরাবাদ এক্সপ্রেসসহ বন্ধ থাকা ট্রেনগুলো পুনরায় চালু করা হোক। এতে সাধারণ মানুষের যাতায়াত সহজ হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ রেলওয়ের আয় বৃদ্ধি পাবে।
এ বিষয়ে  নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিনজন স্টেশন মাস্টার জানান, করোনার অজুহাতে  এ সব মেইল ট্রেন এবং লোকাল সার্ভিস বন্ধ করা হয়। কিন্তু কী কারণে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরেও এ সব ট্রেন সার্ভিস এখনো চালু করা হয়নি; এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ জানা নেই। লিখিতভাবে আমাদেরকে এসব বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কিছুই জানাননি। রেলের ঊর্ধ্বতন মহল এ ট্রেনগুলো বন্ধ করে দিয়েছেন এর বাইরে আমরা কিছুই জানি না।