
উচ্চ ডিগ্রির সনদ থাকলেও চাকরির বাজারে নিজেদের যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে পারছেন না কারিগরির শিক্ষার্থীরা। বর্তমানে যেসব সরকারি কিংবা বেসরকারি কারিগরি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা করছে সেখানে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানেই ল্যাব আছে কিন্তু প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই। ফলে শিক্ষার্থীদের হাতে কলমে শিক্ষার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েই যাচ্ছে। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে দক্ষতার বিচারে পিছিয়ে আছে আমাদের কারিগরি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা।
যদিও দেশের বেকারত্ব দূরীকরণ এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির অন্যতম প্রধান মাধ্যম হওয়ার কথা কারিগরি শিক্ষা। অথচ প্রয়োজনীয় উপকরণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের অভাবে এ শিক্ষাব্যবস্থার শিক্ষার্থীরাই পিছিয়ে পড়ছেন। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ল্যাবরেটরি থাকলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই। কোথাও যন্ত্রপাতি থাকলেও তা দীর্ঘদিন ধরে অচল পড়ে আছে। আবার কোথাও আধুনিক প্রযুক্তির সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ ছাড়াই শিক্ষার্থীদের কোর্স শেষ করতে হচ্ছে। ফলে সনদ অর্জন করেও কর্মক্ষেত্রে গিয়ে বাস্তব কাজের দক্ষতার প্রমাণ দিতে পারছেন না তারা। চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন, অনেকে বেকার থাকছেন, আবার কেউ কেউ স্বল্প বেতনে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কারিগরি শিক্ষায় শুধু ভর্তি ও সনদ দেয়ার প্রবণতা বাড়লেও দক্ষতা তৈরির মৌলিক বিষয়গুলো উপেক্ষিত থাকছে। শিল্পকারখানার চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ না পাওয়ায় শিক্ষার্থী ও চাকরিদাতাদের মধ্যে দক্ষতার বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে, ল্যাবরেটরি ও যন্ত্রপাতির সঙ্কট, দক্ষ শিক্ষকের অভাব, পুরনো শিক্ষাক্রম এবং দুর্বল তদারকির কারণে শিক্ষার্থীরা যথাযথ ব্যবহারিক শিক্ষা পাচ্ছেন না।
এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের ৫৬টি সরকারি ও ৬১২টি বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানো হলেও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি পলিটেকনিকে ৪৩ হাজার ৫০০ আসনের বিপরীতে ভর্তি হয়েছেন ৩৮ হাজার ১৯১ জন। বেসরকারি পলিটেকনিকে এক লাখ ৬০ হাজারের বেশি আসনের বিপরীতে ভর্তি হয়েছেন মাত্র ৩০ হাজার ৬১৪ জন। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান ও আসন বাড়লেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে কারিগরি শিক্ষার প্রতি আগ্রহ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ছে না। এর অন্যতম কারণ হিসেবে শিক্ষার মান, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং কম বেতনের বিষয়গুলো উঠে এসেছে।
ল্যাব থাকলেও নেই উপকরণ : কারিগরি শিক্ষার মূলভিত্তি হচ্ছে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ। একজন শিক্ষার্থীকে যে বিষয়ে পড়ানো হচ্ছে, সে বিষয়ের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে বাস্তব কাজ শেখার সুযোগ থাকতে হবে। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠানে এ সুযোগ সীমিত। কম্পিউটার, ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিকস, অটোমোবাইল, সিভিল ও মেকানিক্যাল বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক সরঞ্জাম নেই। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে পুরনো যন্ত্রপাতি দিয়ে ব্যবহারিক ক্লাস পরিচালনা করা হচ্ছে।
ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, তাদের শিক্ষাক্রমের সাথে নতুন প্রযুক্তির যথেষ্ট সামঞ্জস্য নেই। ব্যবহারিক শিক্ষায় ঘাটতি রয়েছে। কোথাও যন্ত্রপাতি থাকলেও সেগুলো নিয়মিত ব্যবহার করা হয় না। যন্ত্রপাতি পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যেও দক্ষতার অভাব রয়েছে। এতে শিক্ষার্থীরা বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারছেন না। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পকারখানায় কাজের জন্য যে ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন, তা অর্জনের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে।
শিক্ষক সঙ্কটেও ব্যাহত প্রশিক্ষণ : শুধু উপকরণের অভাব নয়, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দক্ষ শিক্ষক ও প্রশিক্ষকের সঙ্কটও বড় বাধা। ২০২৬ সালের ২৮ জুন জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, দেশের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অনুমোদিত ১৫ হাজার ৮৪৪টি শিক্ষক পদের মধ্যে আট হাজার ৪৮৬টি পদ শূন্য। অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি পদেই শিক্ষক নেই। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক শিক্ষা দু’টিই ব্যাহত হচ্ছে।
সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় উপকরণ ও যন্ত্রাংশের অভাবে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে শেখার সুযোগ পাচ্ছেন না। টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারগুলোতেও প্রশিক্ষক ও অধ্যক্ষের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পদ শূন্য। অনেক প্রতিষ্ঠানে ল্যাবের সংখ্যা অপ্রতুল, আবার ব্যবহারযোগ্য ল্যাবেরও বেশির ভাগ নষ্ট অবস্থায় রয়েছে। ফলে নিয়মিত ব্যবহারিক ক্লাস হচ্ছে না। অবশ্য শুধু রিপোর্টই নয়, বাস্তব অর্থেই এ পরিস্থিতির উদাহরণ পাওয়া যায় বিভিন্ন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে।
ঠাকুরগাঁও পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে পাঁচটি টেকনোলজির জন্য অনুমোদিত শিক্ষক পদ ১১১টি। এর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ৩৪ জন। শিক্ষকস্বল্পতার কারণে একজন শিক্ষককে একাধিক শিফটে অতিরিক্ত ক্লাস নিতে হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সনদ আছে, কর্মদক্ষতা নেই : কারিগরি শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের উপযোগী করে গড়ে তোলা। কিন্তু বাস্তবে অনেক শিক্ষার্থী সনদ পেলেও চাকরির বাজারে প্রয়োজনীয় দক্ষতা দেখাতে পারছেন না। কারণ, শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত আধুনিক প্রযুক্তির সাথে তাদের পরিচিতি কম। ফলে নিয়োগদাতারা অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মী খুঁজলেও সদ্য পাস করা শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশিত চাকরি পাচ্ছেন না।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫১ দশমিক ৭ শতাংশ সরকারি, বেসরকারি ও এনজিও খাতে চাকরি করছেন। অন্যদিকে ২২ দশমিক ৪ শতাংশ বেকার। প্রায় ৭ শতাংশ স্বকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন। একই প্রতিবেদনে সিপিডির সমীক্ষার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, কারিগরি শিক্ষা শেষ করে চাকরিতে প্রবেশ করা অনেক শিক্ষার্থীর প্রারম্ভিক বেতন ১০ হাজার টাকার নিচে।
সিপিডির গবেষণায় আরো উঠে এসেছে, কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার বেড়ে ৪৪ শতাংশ হয়েছে, যা আগে ছিল ২৯ শতাংশ। শিক্ষার পর চাকরি পেলেও কম বেতন ও কর্মপরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে।
নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানেও বাড়ছে সঙ্কট : কারিগরি শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্নের আরেকটি বড় দিক হলো অপরিকল্পিত প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণ।
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তথ্য বলছে, ভোকেশনাল শিক্ষা পরিচালনার অনুমোদন পাওয়া তিন হাজার ৪৪০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬২১টিতে ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। এর মধ্যে ৪৪৩টি এসএসসি (ভোকেশনাল) এবং ১৭৮টি দাখিল (ভোকেশনাল) প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগও নিয়েছে বোর্ড।
একইসাথে শিক্ষার্থী শূন্য ৬২১টি প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের অনুমোদন বাতিলের উদ্যোগ নিয়েও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব তথ্য বলছে, প্রতিষ্ঠান বাড়ানোর দিকে যতটা গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহে ততটা নজর দেয়া হয়নি।
সমাধানের পথ কী : শিক্ষাবিদ ও কারিগরি শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, কারিগরি শিক্ষার সঙ্কট সমাধানে প্রথমেই প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ল্যাবরেটরি, যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষণসামগ্রীর পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করতে হবে। অচল যন্ত্রপাতি মেরামত এবং নতুন প্রযুক্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সরঞ্জাম সরবরাহ করতে হবে। পাশাপাশি শূন্য শিক্ষক পদে নিয়োগ, শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং শিল্পকারখানার সাথে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে হবে। আবার শিক্ষাক্রমও নিয়মিত হালনাগাদ করা প্রয়োজন। কোন শিল্পে কী ধরনের দক্ষ কর্মী প্রয়োজন, সে চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে ট্রেড ও প্রশিক্ষণ নির্ধারণ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় পাস করানো নয়, বাস্তবে যন্ত্রপাতি পরিচালনা, সমস্যা সমাধান ও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কাজ করার সক্ষমতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে। কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণের মান, শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান এবং চাকরির বেতনের তথ্য নিয়মিত মূল্যায়ন করা জরুরি। যে প্রতিষ্ঠান মানসম্মত শিক্ষা দিতে পারছে না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষ জনশক্তি ছাড়া শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও বৈদেশিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন। তাই কারিগরি শিক্ষাকে শুধু সনদনির্ভর না রেখে বাস্তব দক্ষতানির্ভর করতে হবে। অন্যথায় বিপুল অর্থ ব্যয় করে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেও কাক্সিক্ষত দক্ষ জনশক্তি তৈরি হবে না। সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়বেন সে শিক্ষার্থীরা, যারা কর্মসংস্থানের স্বপ্ন নিয়ে কারিগরি শিক্ষায় ভর্তি হচ্ছেন, কিন্তু প্রয়োজনীয় উপকরণ ও প্রশিক্ষণ না পেয়ে শেষ পর্যন্ত চাকরির বাজারে পিছিয়ে পড়ছেন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








