গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নাশকতার শঙ্কা সহিংসতায় বাড়ছে উদ্বেগ
গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নাশকতার শঙ্কা সহিংসতায় বাড়ছে উদ্বেগ।
  • ডিসেম্বর ঘিরে সর্বোচ্চ সতর্কতা গোয়েন্দাদের
  • ডিজিটাল হাজিরা দিয়ে অর্থ নিচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে
  • সীমান্ত পেরিয়ে নাশকতার ইন্ধন দিচ্ছে নিষিদ্ধ দল

ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সম্ভাব্য অবনতি ঠেকাতে সরকার ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা এবং পোশাকশ্রমিকদের চলমান আন্দোলন সঙ্ঘাত সহিংসতা একই সময়ে সামনে আসায় উদ্বেগ বেড়েছে। 
একই সাথে নভেম্বর মাসজুড়ে এবং ডিসেম্বরকে সামনে রেখে ত্রিমুখী সহিংসতার ছক তৈরি করা হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নাশকতা, ঝটিকা মিছিল থেকে ছদ্মবেশে থাকা হকার ও অটোরিকশা চালকদের দিয়ে ককটেল বিস্ফোরণ এবং টার্গেট কিলিংয়ের জন্য কিলার ভাড়া করা। সব মিলিয়ে ডিসম্বর পর্যন্ত এক ভয়ঙ্কর অস্থিরতা সৃষ্টির পরিকল্পনা করেছে নিষিদ্ধ দলের নেতাকর্মীরা।
এ দিকে সীমান্ত এলাকা দিয়ে উক্ত দলের নেতাদের কলকাতা থেকে ফেরার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা।      
গতকাল ভোমরা স্থলবন্দরের কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, গত সোমবার ও গতকাল ভোরে নিষিদ্ধ দলের কয়েকজন নেতাকর্মী ওপার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। কয়েকজন দালালের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে তাদের প্রবেশ করানো হয়।  
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রের দাবি, শ্রমিক অসন্তোষকে পুঁজি করে সঙ্ঘাত সৃষ্টির বিভিন্ন কৌশল নেয়া হচ্ছে। নভেম্বর মাসের শুরুতেই পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনের পেছনে ইন্ধনের কারিগর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততা পেয়েছে গোয়েন্দারা। শুধু পোশাক শ্রমিকই নয় আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত আরো ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে নিষিদ্ধ দলের নেতাকর্মীরা মাঠে নেমেছে। আর এসবের পেছনে অর্থ জোগান দিচ্ছেন আওয়ামী লীগের শিল্পপতি ও প্রভাবশালী নেতারা। গতকাল এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো: শফিকুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, এই সহিংসতায় যার সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে তাকেই আইনের আওতায় আনা হবে। 
তিনি বলেন, আমরা যাদের গ্রেফতার করেছি তাদের মোবাইল থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি। এদের মধ্যে একজনের মোবাইলে ১০ জনের জন্য ৩৭ হাজার টাকা ডিজিটাল হাজিরা হিসেবে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করা হয়। আমরা আরো জিজ্ঞাসাবাদ করছি এর নেপথ্যে কারা জড়িত। 
হাসিনার ঘোষণা ও মাঠের তৎপরতা : শেখ হাসিনা একাধিক মাধ্যমে ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার কথা বলেছেন। ডিসেম্বরের দিকে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাসহ দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান। 
এই ঘোষণার পর প্রভাব মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে। ২৩ অক্টোবর নওগাঁর মান্দায় অটোরিকশায় মাইক লাগিয়ে ‘ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা ফিরছেন’ প্রচারের অভিযোগে ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের স্থানীয় নেতাসহ চারজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। জব্দ করা হয়েছে অটোরিকশা। পুলিশ সুপার জানান, গ্রেফতারকৃতদের সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আদালতে পাঠানো হয়েছে। 
আগাম অভিযান, গ্রেফতারের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন : একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, হাসিনার ঘোষণার পর গত এক মাসে সারা দেশে প্রায় ৫৩ হাজার মানুষ গ্রেফতার হয়েছেন। যাদের বড় অংশ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ও শিল্পাঞ্চলে পুলিশ, র‌্যাব ও যৌথ বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক নজির হিসেবে আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ দাবি করেছিলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আগাম অবস্থান নেয়ায় মিছিল-সমাবেশের পরিকল্পনা নস্যাৎ হয়েছে এবং কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। এবারো একই কৌশল অনুসরণ করা হচ্ছে বলে তিনি গতকাল নয়া দিগন্তকে জানান। 
শ্রমিক আন্দোলন : সংঘর্ষ ও ছুটি : ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ১ নভেম্বর গাজীপুর ও মিরপুরে শুরু হয়ে ২ নভেম্বর সাভার-আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে। মিরপুরে বেলা সাড়ে ১১টা থেকে প্রায় ২টা পর্যন্ত পুলিশের সাথে সংঘর্ষ চলে, পুলিশের গাড়িতে আগুন দেয়া হয়। গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ায় সড়ক অবরোধ ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগ হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে প্রায় ৩০০ কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে, যার মধ্যে  সাভার-আশুলিয়ায় ২৬৪টি।
পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জরুরি বৈঠকে বসেন। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় থাকলেও শ্রমিকদের দাবির মুখে আগেভাগেই নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে কী আছে : একটি গোয়েন্দা সংস্থা ডিসেম্বরকে টার্গেট করে শ্রমিক আন্দোলনে বহিরাগতদের সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে। প্রতিবেদনটি সরকারের উচ্চপর্যায়ে জমা হয়েছে। জড়িতদের কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং বাকিরা নজরদারিতে আছে। শীর্ষ মহলের সবুজ সঙ্কেত পেলে কঠোর আইনি পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। অন্য একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাতে বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি দিচ্ছেন এবং কেউ কেউ শ্রমিকদের সাথে মিশে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরে অংশ নিচ্ছেন বলে অভিযোগ। 
সরকারের অবস্থান ও ভিন্ন মত : সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে একাধিক বক্তব্য এসেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির যেকোনো চেষ্টা কঠোর হাতে দমনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি আরো বলেছেন, কিছু শিল্পমালিকের সহিংসতায় জড়িত থাকার অডিও-ভিডিও প্রমাণ মিলেছে এবং সীমান্তের ওপারের ইশারায় কেউ কেউ দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিনও নিষিদ্ধ দলগুলোর বিশৃঙ্খলার চক্রান্ত সফল হবে না বলে সতর্ক করেছেন।
তবে তথ্য উপদেষ্টা জাহেদুর রহমান বলেছেন, সরকার শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল। তার মতে, বিভিন্ন পক্ষ নানাভাবে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে, তবে শ্রমিকদের চলমান অসন্তোষের সাথে ডিসেম্বরের রাজনৈতিক সংযোগ খোঁজা ঠিক হবে না। শ্রমিক নেত্রী তাসলিমা আখতারও আন্দোলনে ‘একটি পক্ষ ফায়দা লুটছে’ বলে মন্তব্য করেছেন। একই সাথে তিনি মজুরির দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলনকে গণতান্ত্রিক অধিকার বলেছেন। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, চ্যালেঞ্জ ত্রিমুখী। এক দিকে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি, অন্য দিকে এর সুযোগ নিয়ে সহিংসতা উসকে দেয়ার আশঙ্কা।

Advertisement