
- কার্যকর সংস্কার ও বিনিয়োগ না হলে শঙ্কা
- হাতে মাত্র দু’দশক!
জনসংখ্যার কাঠামো এখন বাংলাদেশের জন্য বড় অর্থনৈতিক সুযোগ। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগানোর সময় ক্রমেই কমে আসছে। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। অথচ তাদের জন্য পর্যাপ্ত মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। উচ্চশিক্ষিতদেরও বড় অংশ কাজ করছেন অনানুষ্ঠানিক খাতে। দেশে ৮৪ শতাংশ কর্মী অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। আর স্নাতকদের ৪৪ শতাংশেরও নেই আনুষ্ঠানিক চাকুরি। বিশ^ব্যাংকের ‘ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া : ফ্রম টেইলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য। অন্য দিকে জনসংখ্যার বয়স বাড়ার সাথে সাথে স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন ও সামাজিক সুরক্ষার চাহিদা বাড়বে। অথচ এসব ক্ষেত্রে প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়। বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা, প্রয়োজনীয় সংস্কার ও বিনিয়োগ না হলে ধনী হওয়ার আগেই বয়স্ক সমাজে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে বাংলাদেশ।
রাজধানীর একটি তারকা হোটেলে গতকাল প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার জনমিতিক পরিবর্তনের এই চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বিশ^ব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের পিপল বিষয়ক আঞ্চলিক পরিচালক জেম মেটে প্রতিবেদনটি তুলে ধরেন। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন, বিশ্বব্যাংকের এশিয়া অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রানজিস্কা ওনসর্গ এবং অপারেশনস ম্যানেজার গেইল এইচ মার্টিন। সঞ্চালনায় ছিলেন, ঢাকা অফিসের মেহরিন আহমেদ মাহবুব।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর এ বিষয়ে আলোচনা করেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. আবু জাফর মো: জাহিদ হোসেন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ।
বিশ^ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় অর্থনীতির তুলনায় বাংলাদেশ জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানোর জন্য কিছুটা বেশি সময় পেলেও কর্মসংস্থান, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সামাজিক সুরক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ২০৪৫ সালে বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। অর্থাৎ জনমিতিক লভ্যাংশ বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগানোর জন্য হাতে রয়েছে প্রায় দুই দশক। এরপর কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত কমতে থাকবে, বাড়বে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা। প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৫১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বয়স্ক সমাজে পরিণত হবে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দক্ষিণ এশিয়ায় বর্তমানে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ১১৭ কোটি। এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করতে পারলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু এক দশকেরও কম সময়ের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে কমতে শুরু করবে। ২০৪৯ সাল নাগাদ অঞ্চলটি বয়স্ক অর্থনীতিতে পরিণত হবে। তখন মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশের বয়স হবে ৬৫ বছর বা তার বেশি। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের ইঙ্গিত, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে না পারলে জনসংখ্যার অনুকূল কাঠামো থেকেও প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
জনমিতিক সুবিধার আয়ু ফুরাচ্ছে
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০০০ সাল থেকে কর্মক্ষম বয়সের মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এ অঞ্চলের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ০.৪ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে শ্রমের উৎপাদনশীলতা প্রতি বছর ১.১ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এই সুবিধা চিরস্থায়ী নয়। বর্তমান সময় থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে জনমিতিক পরিবর্তনের বার্ষিক অবদান কমে মাত্র ০.১ শতাংশে নেমে আসবে বলে প্রাক্কলন করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ, অন্যান্য উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির তুলনায় দক্ষিণ এশিয়া অনেক দ্রুত বয়স্ক জনগোষ্ঠীর দিকে এগোচ্ছে।
অথচ এ অঞ্চলের মাথাপিছু আয়ও তুলনামূলকভাবে অনেক কম। অর্থাৎ উন্নত অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার আগেই বয়স্ক জনসংখ্যার বাড়তি চাপ সামলাতে হবে দেশগুলোকে।
বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিগুলো উন্নয়নের পথে তুলনামূলক কম আয় থাকা অবস্থাতেই দ্রুত বয়স্ক হয়ে উঠছে। তাই আরো বেশি ও উন্নত কর্মসংস্থান তৈরির উপযোগী নীতি গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। তার মতে, এর মাধ্যমে দেশগুলো তরুণ জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে পাওয়া সুফল বা ‘ইউথ ডিভিডেন্ড’ আরো সুসংহত করতে পারবে। পাশাপাশি বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্যও প্রস্তুতি নেয়া সম্ভব হবে। কর্মক্ষম মানুষের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রবীণদের সুস্বাস্থ্য বজায় রেখে অর্থনীতিতে অবদান রাখার সুযোগ তৈরি করতে হবে। এর মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় জনমিতিক লভ্যাংশ বা ‘সেকেন্ড ডিভিডেন্ড’ পাওয়ার ভিত্তি তৈরি হতে পারে।
ডিগ্রি আছে, আনুষ্ঠানিক চাকরি নেই
বাংলাদেশের জনমিতিক সুবিধাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরের পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি কর্মসংস্থানের ঘাটতি। বিপুল সংখ্যক মানুষ কাজ করলেও তাদের বড় অংশের কর্মসংস্থান অনানুষ্ঠানিক। ফলে কর্মসংস্থান থাকলেও নেই চাকরির নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রায় ৮৪ শতাংশ কর্মী, অর্থাৎ প্রায় পাঁচ কোটি ৮০ লাখ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। উচ্চশিক্ষার সনদও আনুষ্ঠানিক চাকরির নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। স্নাতক ডিগ্রিধারীদের ৪৪ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন। আনুষ্ঠানিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোতেও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি ধীর। পাশাপাশি ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সম্প্রতি কর্মী ছাঁটাইয়ের প্রবণতা দেখা গেছে। ফলে একদিকে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির গতি কম, অন্য দিকে বিদ্যমান কর্মসংস্থানেও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
প্রবীণদের জন্য প্রস্তুতি কোথায়?
কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর ধীরে ধীরে বাড়বে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা। ফলে স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা এবং অবসরকালীন আয় সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তাও বাড়বে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বর্তমান ব্যবস্থা এই বাড়তি চাহিদা সামাল দেয়ার জন্য যথেষ্ট নয় বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মাত্র ১৭ শতাংশ পেনশন স্কিমে অবদান রাখে। আর বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মাত্র ১০ শতাংশ পেনশন সুবিধা পায়। এই হার বিশ্বে সর্বনিম্ন। অর্থাৎ কর্মজীবনে থাকা মানুষের বড় অংশেরই অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তা নেই। বয়স বাড়ার পর তাদের আয় ও জীবনযাত্রার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত পেনশনব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই চ্যালেঞ্জ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের অধিকাংশ কর্মী অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। তাদের বড় অংশকে পেনশন ও সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা না গেলে ভবিষ্যতে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হবে। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি প্রয়োজন। মানুষ দীর্ঘজীবী হলেও সবসময় সুস্বাস্থ্যের অধিকারী থাকেন না। ফলে বয়স বাড়ার সাথে সাথে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পরিচর্যার প্রয়োজনীয়তা বাড়বে। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো এই ধরনের চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি।
কর্মসংস্থান থেকে পেনশন- দু’দিকেই সংস্কার
জনমিতিক পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার কথা বলেছে বিশ্বব্যাংক। এর প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত আরো বেশি উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি। এজন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের (এমএসএমই) অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো, ব্যবসা পরিচালনার নিয়মকানুন সহজ করা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একই সাথে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি। নারীদের কর্মসংস্থানের পথে থাকা বাধা দূর করাও জরুরি।
শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে বিদ্যমান কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর আরো বড় অংশকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করা সম্ভব হবে। অন্য দিকে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য শক্তিশালী স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা এবং পেনশনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এতে প্রবীণদের জীবনযাত্রার নিরাপত্তা বাড়বে। পাশাপাশি তাদের সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখার মাধ্যমে অর্থনীতিতে অবদান রাখার সুযোগও তৈরি হবে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন মতে, এই দুই ধরনের পদক্ষেপের সমন্বয়েই জনমিতিক পরিবর্তনকে উন্নয়নের সুযোগে রূপান্তর করা সম্ভব। উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান ও দক্ষ মানবসম্পদ তরুণ জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে প্রথম লভ্যাংশ এনে দিতে পারে। আর উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন ও সঞ্চয়ব্যবস্থা ভবিষ্যতে দ্বিতীয় লভ্যাংশ অর্জনের পথ তৈরি করতে পারে। সবমিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে সময় রয়েছে প্রায় দুই দশক। এই সময়ের মধ্যে কর্মসংস্থান, দক্ষতা, নারীর অংশগ্রহণ ও সামাজিক সুরক্ষায় কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আনতে না পারলে জনমিতিক সুবিধা হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যে তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী আজ অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি, আগামী দিনে তারাই হয়ে উঠতে পারে বাড়তি নির্ভরশীলতার চাপ। তাই কত মানুষ কর্মক্ষম, তা নয়- তাদের কতজনকে উৎপাদনশীল ও নিরাপদ কর্মসংস্থানে যুক্ত করা যাচ্ছে, সেটিই এখন বাংলাদেশের উন্নয়নের বড় পরীক্ষা।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








