
বিশেষ সংবাদদাতা
দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে আমদানি ব্যয় বাড়ছে রফতানি আয়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হারে। একই সাথে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রেমিট্যান্স, মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যানে অর্থনীতির সামনে যেমন কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে, তেমনি রয়েছে চাপের ইঙ্গিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের ১ নভেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত ডববশষু ঝবষবপঃবফ ঊপড়হড়সরপ ওহফরপধঃড়ৎং এবং অক্টোবরের গড়হঃযষু ঊপড়হড়সরপ ঞৎবহফং প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে এমন চিত্র পাওয়া যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাপ্তাহিক সূচক অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে (ঋণ২৬) পণ্য আমদানি ও রফতানির হিসাবে বড় ব্যবধান ছিল। ওই অর্থবছরে আমদানি (এফওবি ভিত্তিতে) দাঁড়ায় ৭১.১৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১০.৫৩ শতাংশ বেশি। অন্য দিকে রফতানি আয় দাঁড়ায় ৪৩.৮৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ০.২৫ শতাংশ কম। ফলে আমদানি ব্যয় ও রফতানি আয়ের ব্যবধান দাঁড়ায় প্রায় ২৭.২৮ বিলিয়ন ডলার।
আমদানি-রফতানির এ ব্যবধান বৈদেশিক লেনদেনের ওপর চাপের অন্যতম কারণ। তবে পণ্য বাণিজ্যের এ ব্যবধানকে সামগ্রিক চলতি হিসাবের ঘাটতি হিসেবে দেখা যাবে না; কারণ চলতি হিসাবে সেবা, আয় ও স্থানান্তরসহ অন্যান্য লেনদেনও অন্তর্ভুক্ত থাকে।
রিজার্ভে সাম্প্রতিক ওঠানামা
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সাম্প্রতিক সময়ে ওঠানামা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাপ্তাহিক সূচকে ২০২৬ সালের ২৯ অক্টোবর মোট রিজার্ভের পরিমাণ ৩৬.৩৩ বিলিয়ন ডলার দেখানো হয়েছে। এর আগে ৩০ সেপ্টেম্বর মোট রিজার্ভ ছিল ৩৬.০১ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে এক মাসে মোট রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় ৩২০ মিলিয়ন ডলার।
তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভ এবং মোট রিজার্ভ এক নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের উপস্থাপিত পরিসংখ্যানে জুন ২০২৬-এ বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ছিল ৩২.৯৩ বিলিয়ন ডলার। পরবর্তী সময়ের বিপিএম৬ হিসাবের পাশাপাশি মোট রিজার্ভের অঙ্ক আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাই শুধু মোট রিজার্ভের বৃদ্ধি দিয়ে বৈদেশিক লেনদেনের ওপর চাপ পুরোপুরি কমেছে- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।
রেমিট্যান্সে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি
প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে অর্থনীতির জন্য স্বস্তির খবর রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী আয় এসেছে ৩৫.৫৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৭.৩৪ শতাংশ বেশি। বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহে এ আয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে মাসভিত্তিক হিসাবে কিছুটা ওঠানামা দেখা গেছে। ২০২৬ সালের আগস্টে রেমিট্যান্স এসেছিল প্রায় ২.৯৭ বিলিয়ন ডলার; সেপ্টেম্বরে তা কমে দাঁড়ায় প্রায় ২.৭৭ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ এক মাসে প্রবাসী আয় কমেছে প্রায় ২০১ মিলিয়ন ডলার বা ৬.৮ শতাংশ। মাসিক পতন সত্ত্বেও অর্থবছরজুড়ে রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবৃদ্ধি বৈদেশিক মুদ্রার জোগানে সহায়ক হয়েছে।
আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির ইঙ্গিত
বাংলাদেশ ব্যাংকের আমদানি ঋণপত্রের তথ্যেও বিভিন্ন ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের তুলনামূলক তথ্যের বদলে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সূচকে জুলাই-আগস্ট ও সাম্প্রতিক মাসগুলোর ঋণপত্র খোলার এবং নিষ্পত্তির অঙ্ক আলাদাভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি, ভোগ্যপণ্য ও মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি পরিস্থিতি বোঝার সুযোগ রয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানি (সিএন্ডএফ ভিত্তিতে) দাঁড়ায় ৭৫.২৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১০.০৭ শতাংশ বেশি। এফওবি ভিত্তিতে আমদানি ছিল ৭১.১৪ বিলিয়ন ডলার। সিএন্ডএফ ও এফওবি হিসাবের মধ্যে পরিবহন, বীমা ও সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের পার্থক্য রয়েছে; তাই দু’টি অঙ্ক সরাসরি সমতুল্য নয়।
আমদানি বৃদ্ধি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও শিল্প উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল এবং জ্বালানির চাহিদা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে রফতানি আয় একই গতিতে না বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ে।
মূল্যস্ফীতি কমলেও স্বস্তি সীমিত
মূল্যস্ফীতির হিসাবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা উন্নতি দেখা গেলেও সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যচাপ রয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সূচকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৬৫ শতাংশ। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এ হার ছিল ৯.৪৫ শতাংশ।
অন্য দিকে বছরওয়ারি পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দাঁড়ায় ৮.৩৪ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের একই মাসে ছিল ৮.৩৬ শতাংশ। অর্থাৎ গড় মূল্যস্ফীতিতে তুলনামূলক উন্নতি হলেও বছরওয়ারি হিসাবে পরিবর্তন খুব সামান্য। মূল্যস্ফীতির হার কমা মানেই পণ্যের দাম আগের পর্যায়ে ফিরে যাওয়া নয়; বরং দাম বৃদ্ধির গতি কমেছে- এটাই এর অর্থ।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ দুর্বল
অর্থনীতির আরেকটি উদ্বেগের জায়গা হলো বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.৭৫ শতাংশ। আগের বছরের একই সময়ে এ হার ছিল ৬.৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ বেসরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধির গতি কমেছে। একই সময়ে মোট অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১১.৩৪ শতাংশ। সরকারি খাতে নিট ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩৬.৪০ শতাংশ, যা বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির তুলনায় অনেক বেশি। এ ব্যবধান থেকে সরকারি ঋণের সম্প্রসারণ এবং বেসরকারি খাতের তুলনামূলক দুর্বল ঋণপ্রবাহের চিত্র পাওয়া যায়। তবে শুধু এ পরিসংখ্যান দিয়ে বেসরকারি খাতে ঋণ সংকোচনের একক কারণ নির্ধারণ করা যায় না।
বেসরকারি বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে ঋণপ্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ। ঋণের প্রবৃদ্ধি দীর্ঘ সময় কম থাকলে নতুন শিল্প স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান এবং উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে উচ্চ সুদ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, ঋণমানের অবনতি ও বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা একসাথে কাজ করলে বেসরকারি খাতের গতি আরো মন্থর হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
খেলাপি ঋণের চাপ
ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হারও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাপ্তাহিক সূচকে ২০২৬ সালের জুন শেষে মোট ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশ শ্রেণিকৃত বা খেলাপি হিসেবে দেখানো হয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে এ হার ছিল ৩৪.৪০ শতাংশ এবং একই বছরের সেপ্টেম্বরে বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৩৫.৭৩ শতাংশে। ২০২৬ সালের মার্চে হার ছিল ৩২.২৬ শতাংশ।
জুনে খেলাপি ঋণের অনুপাত আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কম হলেও মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শ্রেণিকৃত থাকা ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় ঝুঁকি। এ অবস্থায় ঋণ আদায়, খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র নিরূপণ, প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ এবং ব্যাংকের সুশাসন নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
কৃষিঋণ বিতরণ বাড়ছে
কৃষি ও পল্লী ঋণের ক্ষেত্রে বিতরণ বৃদ্ধির তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৬ সালের আগস্টে কৃষি ও অকৃষি পল্লী ঋণ বিতরণ ছিল চার হাজার ১৯৯.৬৪ কোটি টাকা, যা আগের বছরের আগস্টের তুলনায় ৫৭.১৭ শতাংশ বেশি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে মোট বিতরণ দাঁড়িয়েছে ছয় হাজার ৮৫৭.৯৫ কোটি টাকা; আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি ৪২.১০ শতাংশ।
তবে একই সময়ে ঋণ আদায়ও বেড়েছে। জুলাই-আগস্টে আদায় হয়েছে সাত হাজার ৪১৯.৫৫ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২২.১৬ শতাংশ বেশি। ফলে বিতরণ বৃদ্ধির পাশাপাশি ঋণ ব্যবহারের কার্যকারিতা, কৃষকের উৎপাদন ব্যয় এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
অর্থনীতির সামনে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য থেকে অর্থনীতির একটি মিশ্র চিত্র পাওয়া যায়। একদিকে রেমিট্যান্সে শক্তিশালী বার্ষিক প্রবৃদ্ধি, মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সাম্প্রতিক বৃদ্ধি এবং গড় মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা উন্নতি রয়েছে। অন্য দিকে আমদানি ব্যয় দ্রুত বাড়লেও রফতানি আয় কমেছে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ দুর্বল এবং ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকদের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা, রফতানি আয় বাড়ানো, প্রবাসী আয়ের আনুষ্ঠানিক প্রবাহ ধরে রাখা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বেসরকারি বিনিয়োগে গতি ফিরিয়ে আনা। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো জরুরি।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








