ভারতের মুসলিমদের সাথে বিরোধীদের সংহতি নিয়ে প্রশ্ন


ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া এবং এর জেরে ভোটাধিকার কেড়ে নেয়ার চক্রান্তের বিরুদ্ধে যখন দেশজুড়ে রাজনৈতিক দল, শিক্ষার্থী ও কৃষকরা রাজপথে নেমেছেন, তখন এই আন্দোলনের অংশ হিসেবে মুসলিমদের প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা ও সংহতির ধরন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। আল-জাজিরার একটি বিশ্লেষধর্মী নিবন্ধে এই তথ্য সামনে এসেছে।
প্রায় ছয় বছর আগে পাস হওয়া নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ এবং দেশব্যাপী জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি চালুর ঘোষণাকালে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ যে চরম আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেছিলেন, সেসময় তাদের সেই একক প্রতিবাদ ও আকুতিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অথচ বর্তমান পরিস্থিতিতে এসে যখন নির্বাচন কমিশনের এসআইআর প্রক্রিয়ার যাঁতাকূপে পড়ে সাধারণ মানুষের বিশাল একটি অংশ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ছে, তখন অন্যান্য সম্প্রদায়ও একই ধরনের অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়ে রাজপথে সরব হয়েছে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের এই নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার জেরে দেশজুড়ে প্রায় ১৩ কোটি মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। তালিকাভুক্তির বৈধতা প্রমাণ করতে গিয়ে নাগরিকদের পুরনো দলিলপত্র পেশ করার কঠিন শর্তের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বর্তমান জনবিক্ষোভ থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ, পুরনো ভোটার তালিকা পুনর্বহাল এবং এসআইআর বাতিলের দাবি জোরালো করা হলেও, সমালোচকদের মতে এই প্রতিবাদ পুরোপুরি সর্বাত্মক নয়।
২০১৯ সালে ভারতীয় পার্লামেন্টে প্রণীত সিএএ আইনে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিষ্টান- এই ছয়টি সম্প্রদায়ের নিপীড়িত জনগোষ্ঠীকে দ্রুত নাগরিকত্ব দেয়ার বিধান রাখা হলেও সুকৌশলে মুসলিমদের এর বাইরে রাখা হয়েছিল। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের দেশজুড়ে এনআরসি চালুর ঘোষণার পর থেকেই মুসলিমদের মধ্যে এই আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল যে, পর্যাপ্ত ঐতিহাসিক নথি দেখাতে ব্যর্থ হলে তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া হবে এবং তারা সিএএ-র কোনো আইনি সুবিধাও পাবেন না। বর্তমান এসআইআর প্রক্রিয়ায় সেই আশঙ্কাই যেন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ মিলছে পশ্চিমবঙ্গের তথ্যে। সেখানে এসআইআরের প্রথম পর্যায়ে প্রায় ৯১ লাখ ভোটারের নাম কাটা পড়ে, যা মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ। এরপরের ধাপে বিভিন্ন নথিপত্রে ত্রুটি বা অসংগতির অজুহাত দেখিয়ে প্রায় ৬০ লাখ ভোটারকে বিচারিক কর্মকর্তাদের শুনানির মুখোমুখি করা হয়, যার মধ্যে চূড়ান্তভাবে ২৭ লাখের নাম তালিকা থেকে খারিজ হয়ে যায়। প্রকাশিত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, এই দ্বিতীয় ছাঁটাইয়ের শিকার হওয়া মানুষদের প্রায় ৭০ শতাংশই মুসলিম।
একই চিত্র রাজধানী দিল্লির ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান। গত ৩১ আগস্ট প্রকাশিত দিল্লির খসড়া ভোটার তালিকা অনুযায়ী, শহরের মোট এক কোটি ৪৫ লাখ ভোটারের মধ্যে থেকে প্রায় ৪৭ লাখ ৫০ হাজার ভোটারের নাম গায়েব হয়ে গেছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে মুসলিম অধ্যুষিত ওখলা বিধানসভা কেন্দ্রেই ভোটার সংখ্যা হ্রাসের হার প্রায় ৪৫ শতাংশ। তবে মূল উদ্বেগের বিষয় হলো, বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বর্তমান আন্দোলন ও নির্বাচন কমিশনবিরোধী দাবির পরিধি নিয়ে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অপসারণ, পুরনো তালিকা ফিরিয়ে আনা কিংবা কাগজের ব্যালট ও আইনি আপিলের সুযোগ দাবি করা হলেও, এর সমান্তরালে নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ-র মতো বৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে বিরোধী শিবির কোনো স্পষ্ট ও জোরালো অবস্থান নিচ্ছে না। প্রকৃত ও অর্থবহ সংহতি প্রকাশ করতে হলে বিরোধী দলগুলোকে কেবল ভোটার তালিকা সংশোধনের ত্রুটি নিয়ে সোচ্চার হলেই চলবে না, বরং একই সাথে বৈষম্যমূলক সিএএ পুরোপুরি বাতিলের দাবি তুলতে হবে। পাশাপাশি, ২০২০ সালের দিল্লি সহিংসতার সময়কার বহুল আলোচিত ‘বৃহৎ ষড়যন্ত্র’ বা লার্জার কনস্পিরেশি মামলায় কারাবন্দী অধিকারকর্মী উমর খালিদ ও শারজিল ইমামের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিকেও বর্তমান রাজনৈতিক আন্দোলনের এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত করার তাগিদ দেয়া হয়েছে ।

Advertisement