অবরুদ্ধ হেব্রনে ইসরাইলি আগ্রাসনের নবম দিন, গাজায় নিহত বেড়ে ১৫৮০

 মিডল ইস্ট মনিটর ও আলজাজিরা
দখলকৃত পশ্চিম তীরের হেব্রন শহরে সামরিক আগ্রাসনের নবম দিবস অতিক্রম করছে ইসরাইলি বাহিনী। এর অংশ হিসেবে শহরটির বিভিন্ন জনবহুল এলাকায় নিরাপত্তা বিধিনিষেধ আরো কঠোর করা হয়েছে। গত ২৩ অক্টোবর শুরু হওয়া এই অভিযানে ইতোমধ্যে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, বহু মানুষকে বন্দী করা হয়েছে এবং অসংখ্য ঘরবাড়ি বুলডোজার দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার সন্ধ্যায় আইন আল-দির বাজা এলাকায় পূর্ণ সামরিক অবরোধ কার্যকর করে সেনারা। সেখানে বিভিন্ন বাসাবাড়িতে অতর্কিত তল্লাশি চালিয়ে একাধিক তরুণকে বন্দী করা হয়। স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রকাশিত দৃশ্যপটে দেখা যায়, ইসরাইলি সেনারা পুরো জনপদ অবরুদ্ধ করে লাউডস্পিকারে লোকজনকে অবিলম্বে এলাকা ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছে। এ সময় বহু ফিলিস্তিনিকে হাত মাথার ওপরে তুলে ধরে অজ্ঞাত স্থানে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়।
বাসাবাড়ি ধ্বংস ও জলপাই বাগান লুট
স্থানীয় সূত্রগুলোর তথ্যমতে, গত ২৩ অক্টোবর হেব্রনের পশ্চিমাঞ্চলীয় ফারশ আল-হাওয়া এলাকায় সংঘটিত একটি গুলিবর্ষণের ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে হামৌদা ওয়ায়েল মোহাম্মদ আল-জাব্বা ও আহমদ বাসাম মোহাম্মদ আশৌর আল-জাব্বার বসতভিটা গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরাইলি সেনারা। এর পাশাপাশি, গতকাল মধ্য হেব্রনের তেল রুমিদা এলাকায় জলপাই সংগ্রহে ব্যস্ত একটি ফিলিস্তিনি পরিবারের ওপর হামলা চালায় ইসরাইলি দখলদাররা। ফিলিস্তিনি কলোনাইজেশন অ্যান্ড ওয়াল রেজিস্ট্যান্স কমিশন জানায়, হামলাকারীরা ফিলিস্তিনিদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালায়, পেপার স্প্রে নিক্ষেপ করে এবং পাথর ছোড়ার পাশাপাশি তাদের কষ্টের ফসল জলপাই জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয়। এ ছাড়া হেব্রনের দক্ষিণাঞ্চলীয় মাসাফের ইয়াত্তা এলাকায় একটি কৃষিঘর এবং এর সমস্ত সরঞ্জাম সম্পূর্ণ পুড়িয়ে দেয়া হয়। দুর্গ ও আল-শিউখ অঞ্চলেও কৃষকদের কৃষিকাজে বাধা দেয়া হয়েছে। অভিযান শুরুর পর থেকেই হেব্রন এবং এর আশপাশের সমস্ত গ্রাম অবরুদ্ধ করে রেখেছে দখলদার বাহিনী। এমনকি জিলাদা ও আইন আল-দির বাজা এলাকার বেশ কিছু বাড়ি জবরদখল করে সেগুলোকে সামরিক ছাউনিতে রূপান্তর করা হয়েছে এবং সেখানে ইসরাইলি পতাকা টানানো হয়েছে।
প্রায় ৫ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত
হেব্রন পৌরসভার দেয়া হিসাব অনুযায়ী, ইসরাইলি এই সামরিক অভিযানের ফলে ৭৮০টি পরিবারের মোট চার হাজার ৯৬৯ জন ফিলিস্তিনি তাদের বাসস্থান হারাতে বাধ্য হয়েছেন। ফিলিস্তিনি প্রিজনার্স সোসাইটি জানিয়েছে, গত শুক্রবার থেকে বুধবারের মধ্যে সমগ্র গভর্নেট জুড়েই ধরপাকড় চালিয়ে ১১০ ফিলিস্তিনিকে বন্দী করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অবরোধ ও সহিংসতার কারণে ওই অঞ্চলের ৬৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পুরোপুরি বিঘিœত হয়েছে, যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দুই হাজার ৮৭২ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে দুই হাজার ১৯৮ জন শিক্ষার্থী সরাসরি অবরুদ্ধ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে এবং বাকি ৬৭৪ জন বাধ্য হয়ে বাস্তুচ্যুত হওয়ায় বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না। নিজ আবাসস্থলে ফিরে গিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা পুনরুদ্ধারের জন্য অবিলম্বে এই অবরুদ্ধ অবস্থা তুলে নেয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
গাজায় ৪৮ ঘণ্টায় প্রাণহানি ৬
এদিকে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ৪৮ ঘণ্টায় অন্তত ছয়জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্য দিয়ে গত বছরের অক্টোবর মাসের কথিত ‘যুদ্ধবিরতির’ পর থেকে এখন পর্যন্ত মোট নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা বেড়ে এক হাজার ৫৮০ জনে পৌঁছাল। গতকাল প্রকাশিত দৈনিক পরিসংখ্যান প্রতিবেদনে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিগত ৪৮ ঘণ্টায় নতুন করে চারজন নিহত হয়েছেন এবং পূর্বের আঘাতের জেরে মারা গেছেন আরো দু’জন। একই সময়সীমায় আহত হয়েছেন ২৬ জন। গত বছরের ১১ অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত সর্বমোট পাঁচ হাজার ৭১১ জন আহত হয়েছেন এবং উদ্ধার করা হয়েছে ৮৪৫টি লাশ। এর বাইরে, তথ্য যাচাইকরণ কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষে বিগত ২৪ অক্টোবর থেকে শুরু করে সামগ্রিক নিহতের তালিকায় নতুন করে আরো ১৮ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সবমিলিয়ে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসনে মোট নিহতের সংখ্যা বেড়ে কমপক্ষে ৭৪ হাজার ৫৯৪ জনে এবং আহতের সংখ্যা এক লাখ ৭৫ হাজার ৮৩৪ জনে দাঁড়িয়েছে।

Advertisement