
নিজস্ব প্রতিবেদক
বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির (২৮) মৃত্যুর ঘটনায় নদীতে ঝাঁপ দেয়ার যে বিষয়টি আলোচনায় এসেছে, তাতে ধাওয়াকারীরা আসলেই পুলিশ সদস্য ছিলেন, নাকি মাদককারবারিদের সাথে কোনো বিরোধের জেরে ঘটনাটি ঘটেছে -এ নিয়ে তদন্ত করছে পুলিশ। লাশ উদ্ধারের দুই দিন পর নিহতের বাবার দায়েরকৃত হত্যা মামলায় আটক থাকা তার বন্ধু ও ব্যবসায়িক অংশীদার আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে চার দিনের রিমান্ড দিয়েছেন আদালত। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের শুনানিতে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময়কার ভিডিওচিত্র সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানোর সাথে এই হত্যাকাণ্ডের সম্পর্ক থাকতে পারে বলে দাবি করা হয়। অন্য দিকে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনী কর্মকর্তা কল্যাণ সমিতি (রাওয়া) ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে বিচার প্রক্রিয়া কড়া নজরদারিতে রাখার আশ্বাস এবং সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
রিমান্ড শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের দাবি ও আসামির প্রতিক্রিয়া : তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় তার বাবা কে এম এনায়েতুল করিম বাদি হয়ে রাজধানীর উত্তরখান থানায় শুক্রবার রাতে দণ্ডবিধির ৩০২ (পূর্বপরিকল্পিত হত্যা), ২০১ (আলামত লোপাট) ও ৩৪ (যৌথ অপরাধমূলক অভিপ্রায়) ধারায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক দীপকে গ্রেফতার দেখানো হয়।
গতকাল শনিবার বেলা ৩টার পর দীপকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে হাজির করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইন্সপেক্টর ফিরোজ উদ্দিন আসামির সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন জানান। পরে শুনানিকালে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াসের আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট আজিজুল হক দিদার বলেন, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার ভিডিও করেছিলেন তাহসিফ সাউরি, পরে তা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেয়া হয় এই কারণে ভুক্তভোগীকে খুন করা হয়ে থাকতে পারে। ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটন ও এর সাথে আর কারা জড়িত তা জানার জন্য আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করা জরুরি।
অন্য দিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী মনিরুল ইসলাম রিমান্ড বাতিল ও জামিনের আবেদন জানিয়ে দাবি করেন, তাহসিফের সাথে দীপের দীর্ঘ ছয় বছরের পারিবারিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল এবং দীপ শুরু থেকেই পুলিশকে সহায়তা করেছেন। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত দীপের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ডের আদেশ হওয়ার পর আদালত থেকে বের করার সময় স্বজনদের উদ্দেশ্য করে অভিযুক্ত দীপ বলেন, ‘আমি ফুললি স্ট্রং, টেনশন করার কিছু নেই’।
দীপের বক্তব্যে অসঙ্গতি : পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও নৌ-পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাহসিফ নিখোঁজের পর থেকে গ্রেফতারকৃত দীপের দেয়া তথ্যে একাধিক অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। চলাচলের তথ্য গোপন করে প্রথমে গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে দীপ দাবি করেছিলেন, তাহসিফের নষ্ট মোটরসাইকেল মেরামত ও খাবার শেষ করে তারা রাত ১২টার দিকে উত্তরা হাউজ বিল্ডিং এলাকায় এসে আলাদা হয়ে যান। কিন্তু পিবিআইয়ের কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের মুখে তিনি স্বীকার করেন যে, মধ্যরাতে তারা টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন।
পুলিশের ধাওয়ার দাবির বিষয়ে পিবিআই কর্মকর্তা অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান জানান, দীপ দাবি করেছেন যে মাজার বস্তি এলাকায় অবস্থানকালে পুলিশের পোশাক পরা দু’জন ব্যক্তি তাদের ধাওয়া করেন। এ সময় তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন এবং দীপ বিআইডব্লিউটিএর ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের পেছনে লুকিয়ে বেঁচে যান। পরে তিনি রাত আড়াইটার দিকে বাসায় ফেরেন। দীপের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে মাজার বস্তির একটি চায়ের দোকানের পাশ থেকে নম্বরপ্লেটবিহীন একটি কালো মোটরসাইকেল উদ্ধার করে পিবিআই। স্থানীয় চায়ের দোকানি জুবাইদা বেগম জানান, মোটরসাইকেলটি দু’দিন ধরে সেখানে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল।
তবে পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, কথিত ধাওয়াকারীরা আসলেই পুলিশ সদস্য ছিলেন কি না, নাকি মাদককারবারিদের সাথে কোনো বিরোধের জেরে ঘটনাটি ঘটেছে- তা সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রযুক্তিগত তথ্যের সাহায্যে নিবিড়ভাবে যাচাই করা হচ্ছে।
বাবার ক্ষোভ ও সন্দেহ : তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম পুলিশের ধাওয়া খেয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুর দাবিকে পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য ও হাস্যকর বলে উড়িয়ে দিয়ে বলেন, একজন ডিফেন্স অফিসার পুলিশের ধাওয়ায় দৌড় দিয়ে নদীতে ঝাঁপ দেবে- এটা একেবারেই অসঙ্গত ও হাস্যকর বক্তব্য। সে কখনোই ওই মাদক এলাকায় যাওয়ার কথা নয় ঘটনাটি ভিন্ন খাতে ঘোরাতে ও মিথ্যা গল্প সাজাতে চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, যদি সত্যিই ধাওয়ার ঘটনা ঘটে থাকে তবে তাহসিফ হারিয়ে যাওয়ার পর বা নদীতে ঝাঁপ দেয়ার পর দীপ কেন তাৎক্ষণিকভাবে পরিবার বা পুলিশকে কিছু জানালেন না। পরিবার মনে করে, একটি বিশেষ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাহসিফকে হত্যা করে আলামত লোপাটের উদ্দেশ্যে লাশ নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছে।
রাওয়ার ক্ষোভ ও বিচার প্রক্রিয়ায় কড়া নজরদারি : এদিকে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনী কর্মকর্তা কল্যাণ সমিতির (রাওয়া) একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল শনিবার দুপুরে তাহসিফের পরিবারের সাথে দেখা করেন। রাওয়ার যুগ্ম সম্পাদক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু নওরোজ খুরশিদ আলম এবং সদস্য অবসরপ্রাপ্ত মেজর আল আমিন স্পষ্ট করে জানান, আমরা এই ঘটনা কোনোভাবেই হালকাভাবে ছেড়ে দেবো না। কার কী ভূমিকা ছিল, কিভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে এবং কারা জড়িত- তার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত দেখতে চাই। আমরা এই তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া সার্বক্ষণিক মনিটর করব।
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হন বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি। ভবনের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ওই দিন সন্ধ্যায় তাহসিফের ‘বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই’ ও ব্যবসায়িক অংশীদার আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ গ্যারেজে আসেন, পরে তাহসিফ নিচে নামেন এবং পৃথক দু’টি মোটরসাইকেলে দু’জন বাইরে চলে যান। নিখোঁজের দুই দিন পর বুধবার বিকেলে তুরাগ নদের টঙ্গী রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তার ভাসমান লাশ উদ্ধার করে টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা। সুরতহাল প্রতিবেদনে তাহসিফের শরীরে বড় ধরনের বাহ্যিক আঘাতের চিহ্ন না মিললেও নাক দিয়ে রক্ত বের হওয়ার তথ্য উল্লেখ রয়েছে। তাহসিফের লাশ উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে দাফন করা হয়। নিহতের শরীরে কোনো বিষাক্ত পদার্থ, মাদক বা অ্যালকোহলের উপস্থিতি ছিল কি না- তা নিশ্চিত হতে ভিসেরা ও রাসায়নিক পরীক্ষার নমুনা পাঠানো হয়েছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








