
শফিউল আযম বেড়া (পাবনা) সংবাদদাতা
শীতের খাবারে মাছ ও সবজির স্বাদ বাড়াতে কুমড়া বড়ির জুড়ি নেই। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এ খাবার তৈরি করে বাড়তি আয় করছেন পাবনার অর্ধশতাধিক গ্রামের প্রায় দুই হাজার নারী কারিগর। আশ্বিন থেকে ফাল্গুন- শীতের ছয় মাস কুমড়া বড়ি তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করেন তারা। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে জেলার এ পণ্য এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাচ্ছে। প্রবাসী বাঙালিদের হাত ধরে পৌঁছে যাচ্ছে বিদেশেও। তবে ডালসহ কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং লাভ কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন কারিগররা।
জেলার বেড়া, চাটমোহর, ফরিদপুর ও সুজানগর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে কুমড়া বড়ি তৈরি হয়। বেড়ার চরপাড়া ও দাসপাড়া, চাটমোহরের দোলং এবং ফরিদপুরের ডেমরা পালপাড়াসহ প্রায় ৫০টি গ্রামের নারী-পুরুষ এ পেশায় যুক্ত। পরিবারের দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে বড়ি তৈরি করে তারা সংসারের বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা করছেন। অনেক নিম্ন আয়ের পরিবারের জীবিকা ও সন্তানদের লেখাপড়ার খরচও মেটানো হচ্ছে এ আয় থেকে।
সরেজমিন বেড়ার চরপাড়া গ্রামে দেখা যায়, বাড়ির উঠানে সারি সারি কুমড়া বড়ি রোদে শুকানো হচ্ছে। নারীদের পাশাপাশি পুরুষরাও এ কাজে সহযোগিতা করছেন। চার ধরনের ডাল- অ্যাংকর, মটর, ছোলা ও মাষকলাইয়ের সাথে পাকা চালকুমড়া, কালোজিরা, গোলমরিচসহ বিভিন্ন মসলা মিশিয়ে তৈরি হয় এ বড়ি। ডাল ও উপকরণের ধরন অনুযায়ী এর দাম নির্ধারণ করা হয়। পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি বড়ি ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা এবং খুচরা বাজারে ১৭০ থেকে ১৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কুমড়া বড়ি তৈরির প্রস্তুতি শুরু হয় ভোরে। ডালের গুঁড়ার সাথে চালকুমড়া ও মসলা মিশিয়ে বড়ি তৈরি করে রোদে দেয়া হয়। দুই থেকে তিন দিন শুকানোর পর তা বাজারজাতের উপযোগী হয়।
বেড়ার দাসপাড়া ও চরপাড়া গ্রামের প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি পরিবার এ পেশায় জড়িত। অন্য দিকে ফরিদপুরের ডেমরা ইউনিয়নের পালপাড়ায় প্রায় ২০টি পরিবার কুমড়া বড়ি তৈরি করে। এ গ্রামের কারিগর চাম্পা রানী পাল জানান, ডেমরার বড়ির স্থানীয়ভাবে বেশ সুনাম রয়েছে। এলাকার চাহিদা মিটিয়ে তা অন্য জেলাতেও সরবরাহ করা হয়। শীতকালে মাছ ও সবজির তরকারিতে কুমড়া বড়ি ব্যবহার করায় এ সময় চাহিদা বেড়ে যায়।
সুজানগর উপজেলার দোগাছি গ্রামের কারিগর ঊষা রানী ভৌমিক বলেন, প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি এ পেশায় আছেন। আগে শিল-পাটায় ডাল বেটে বড়ি তৈরি করতে হতো। এতে সময় ও শ্রম বেশি লাগত। এখন মেশিনে ডাল ভাঙানোর কারণে কাজ কিছুটা সহজ হয়েছে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ডাল ব্যবহার করে বড়ি তৈরি করা হয়।
সুজানগরের ঘোষপাড়া গ্রামের কারিগর রুকসানা বেগম বলেন, একজন কারিগর দিনে গড়ে ৩০ কেজি ডালের বড়ি তৈরি করতে পারেন। বাড়ির কাজ সামলে সকাল ৯টার মধ্যে বড়ি তৈরি করে রোদে দেয়া সম্ভব হয়। আশ্বিন থেকে ফাল্গুন পর্যন্ত এ ব্যবসা ভালো চলে। এ মৌসুমের আয় দিয়ে অনেক পরিবার সংসারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছে।
ঐতিহ্যবাহী এ খাবার ঘিরে গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলেও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি তাদের আয়ে চাপ সৃষ্টি করছে। তারপরও বংশপরম্পরায় চলে আসা এ পেশা ধরে রেখে নিজেদের তৈরি কুমড়া বড়ি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও পরিচিত করে তুলছেন পাবনার কারিগররা।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








