
নিজস্ব প্রতিবেদক
দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা, সরকারি নির্দেশ অমান্য এবং অসদাচরণের অভিযোগে সাবেক ডিবি প্রধান হারুন অর রশিদসহ পুলিশের সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। তাদের মধ্যে ছয়জনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। অন্য একজনকে দেয়া হয়েছে বাধ্যতামূলক অবসর। বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন- ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও সহকারী পুলিশ কমিশনার পদমর্যাদার কর্মকর্তারা।
শনিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-১ ও শৃঙ্খলা-২ শাখা থেকে জারি করা পৃথক প্রজ্ঞাপন এবং সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় এসব তথ্য পাওয়া গেছে। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া, সরকারি কর্মকমিশনের পরামর্শ এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর এসব শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন- সাবেক ডিআইজি মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি শ্যামল কুমার মুখার্জী, সাবেক ডিআইজি মো: আনিসুর রহমান, সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার ফারহানা তাসকিন, সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার মো: মনিরুজ্জামান সরকার এবং সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম জাহাঙ্গীর হাছান। আর সহকারী পুলিশ সুপার কাজী মিজানুর রহমানকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়েছে।
বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে ফারহানা তাসকিন ও মো: মনিরুজ্জামান সরকারের বিরুদ্ধে বিদেশে অবস্থান করে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ফারহানা তাসকিন ডিএমপির প্রশাসন-ট্রাফিক উত্তর বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার ছিলেন। স্বামীর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে ২০১৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ৪২ দিনের বহিঃবাংলাদেশ ছুটি নিয়ে কানাডায় যান তিনি। পরে অসুস্থতার কথা জানিয়ে আরো ৩৬ দিনের ছুটি বৃদ্ধির আবেদন করেন। এরপর কানাডার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিন বছর মেয়াদি সিপিএ কোর্সে পড়ার জন্য শিক্ষাছুটির আবেদন করেন। তবে মন্ত্রণালয় সেই আবেদন নাকচ করে তাকে দেশে ফিরে কর্মস্থলে যোগ দেয়ার নির্দেশ দেয়; কিন্তু তিনি আর ফেরেননি। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের ২৮ মার্চ ছুটি শেষ হওয়ার পরও তিনি কর্মস্থলে যোগ দেননি। তার বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিভাগীয় মামলা করা হয়। তদন্তে পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাবও দেননি তিনি। পরে সরকারি কর্মকমিশনের পরামর্শ ও রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর ২০১৮ সালের ২৮ মার্চ থেকে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
অন্য দিকে ডিএমপির সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার মো: মনিরুজ্জামান সরকার যুক্তরাজ্যের কিংস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধবিজ্ঞানে পিএইচডি করার জন্য ২০১২ সালে প্রেষণে যান। পরে কয়েক দফায় তার বিনা বেতনে ছুটি বাড়ানো হয়। সর্বশেষ ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত আরো দুই বছরের ছুটির আবেদন করেন তিনি। তবে সেই আবেদন নাকচ করে তাকে দেশে ফিরে কর্মস্থলে যোগ দেয়ার নির্দেশ দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নির্দেশনা পাওয়ার পরও তিনি দেশে ফেরেননি।
সাবেক ডিবি প্রধান ডিআইজি মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। তার বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা এবং ই-মেইলে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও কর্মস্থলে ফেরেননি।
সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি শ্যামল কুমার মুখার্জী সর্বশেষ ট্যুরিস্ট পুলিশে কর্মরত ছিলেন। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি তাকে রাজশাহীতে রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়। ২২ জানুয়ারি সেখানে যোগদানের পর একই দিন তিন সপ্তাহের বিশ্রামের কথা উল্লেখ করে প্রস্থান প্রতিবেদন জমা দেন। তবে নির্ধারিত সময় শেষে কর্মস্থলে আর যোগ দেননি। তার বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ৩ জুলাই বিভাগীয় মামলা করা হয়। তদন্তে পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। পরে ২০২৫ সালের ২২ জানুয়ারি থেকে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। রাজশাহী রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি মো: আনিসুর রহমান অসুস্থতার কথা জানিয়ে ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি একটি প্রতিবেদন জমা দিলেও তাতে ছুটির ধরন, মেয়াদ ও অবস্থানের স্থান উল্লেখ করেননি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও জমা দেননি।
একাধিকবার নোটিশ পাঠানোর পরও কর্মস্থলে যোগ দেননি তিনি। সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম জাহাঙ্গীর হাছান ১৫ দিনের বহিঃবাংলাদেশ ছুটি নিয়ে ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর কর্মস্থল ত্যাগ করেন। পরবর্তী সময়ে আরো ৬০ দিনের ছুটি বৃদ্ধির আবেদন নাকচ হলেও কর্মস্থলে যোগ দেননি।
অন্য দিকে কনস্টেবলের স্ত্রীর সাথে অসদাচরণের কারণে সহকারী পুলিশ সুপার কাজী মিজানুর রহমানকে চাকরি থেকে বরখাস্ত না করে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়েছে। তিনি সিআইডির দিনাজপুর জেলায় কর্মরত ছিলেন। এর আগে ডিএমপির তেজগাঁও ট্রাফিক জোনে সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এসব প্রজ্ঞাপনে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী স্বাক্ষর করেছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নেয়া শাস্তিমূলক আদেশগুলো অবিলম্বে কার্যকরের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








