
নিজস্ব প্রতিবেদক
পরিকল্পনা না মানলে বাসযোগ্য হবে না ঢাকা। ড্যাপের সংশোধনী পুনর্বিবেচনা ও পেশাজীবী বিহীন কারিগরি কমিটি বাতিলের দাবিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নগর পরিকল্পনাবিদরা এই মন্তব্য করেন। তারা বলেন, ২০২৩ সালে ড্যাপে ঢাকাকে যেভাবে চিত্রায়িত করা হয়েছিল সেটা ছিল একটি উত্তম পরিকল্পনা। কিন্তু সর্বশেষ প্রকাশিত ড্যাপসংক্রান্ত গেজেটে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী এলাকায় যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা বিশেষ একটি গোষ্ঠীর স্বার্থে করা হয়েছে বলে বিআইপি মনে করে। এ ধরনের পরিবর্তনের পেছনের কারিগরি প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট কমিটির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
গতকাল শনিবার বাংলামটরের বিআইপির বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব সøানার্স অফিসে এই সংবাদ সম্মেলনটির আয়োজন করা হয়। বিআইপির সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মুসলেহ উদ্দিন হাসানের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিআইপির সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম, বিআইপির উপদেষ্টা পরিষদের আহ্বায়ক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান, বিআইপির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ, সাবেক উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য পরিকল্পনাবিদ মো: মাহবুবুর রহমান, বিআইপির কোষাধ্যক্ষ পরিকল্পনাবিদ আবু ছালেহ মো: শহীদুল্লাহ, বিআইপির বোর্ড সদস্য পরিকল্পনাবিদ তালহা তাসনিম প্রমুখ।
মূল বক্তব্যে বিআইপির সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, পরিকল্পনা না মানলে কখনো কোনো শহর বাসযোগ্য হতে পারে না, ঢাকাও হবে না। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ড্যাপে ঢাকা শহরের জন্য ক্ষতিকর তিনটি সংশোধনী আনা হয়েছে। সংশোধনী অনুযায়ী শ্যামপুর-কদমতলী এলাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী তিনটি প্লটের ভূমি ব্যবহার ‘উন্মুক্ত স্থান’ থেকে ‘ভারী শিল্প এলাকা’ হিসেবে পরিবর্তন করে দেয়া হয়েছে। পূর্বাচল ও ঝিলমিল প্রকল্পে শর্তসাপেক্ষে অতিরিক্ত ফ্লোর এরিয়া রেশিও (ফার) অনুমোদন এবং ওয়াটার ফ্লো ওভারলে জোনের নির্দেশনার সাথে প্রস্তাবিত ভূমি ব্যবহারের বিরোধ দেখা দিলে ভূমি ব্যবহারের ধরন নির্ধারণে নতুন বিধান যুক্ত করা হয়। তিনি বলেন, এসব সংশোধনীর ফলে নগরের উন্মুক্ত স্থান, জলাধার ও বন্যাপ্রবাহ এলাকা সংরক্ষণের পরিকল্পনাগত ভিত্তি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে শ্যামপুর-কদমতলীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও বায়ুদূষণপ্রবণ এলাকায় ভারী শিল্প স্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি এবং পূর্বাচল ও ঝিলমিল এলাকায় অতিরিক্ত ফার অনুমোদন নগরের পরিবেশ, অবকাঠামো ও জনজীবনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে, ওয়াটার ফ্লো ওভারলে জোনের সুরক্ষার ক্ষেত্রে খতিয়ানে ভূমির শ্রেণী উল্লেখ থাকার শর্ত যুক্ত হওয়ায় বাস্তবে পানি ধারণকারী অনেক জমি সুরক্ষার বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ড্যাপ সংশোধনের জন্য গঠিত ৯ সদস্যের কারিগরি কমিটিতে সরকারি কর্মকর্তাদের বাইরে কোনো পেশাজীবী সংগঠন, নগর পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশবিদ কিংবা নাগরিক প্রতিনিধির অন্তর্ভুক্তি নেই। অথচ এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব এবং সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর ওপর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। প্রয়োজনীয় সমীক্ষা, পেশাগত পরামর্শ ও জনস্বার্থ বিবেচনা ছাড়া পরিকল্পনার মৌলিক পরিবর্তন গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ড্যাপের নির্ধারিত পাঁচ বছর মেয়াদি পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমন্বিত গবেষণা ও মূল্যায়নের ভিত্তিতেই ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন আনা উচিত। বিআইপি সভাপতি ঢাকার বিদ্যমান নগর সঙ্কট তুলে ধরে বলেন, বায়ুদূষণ, জলাবদ্ধতা, খাল ও জলাধার বিলুপ্তি, যানজট, শব্দদূষণ, উন্মুক্ত স্থানের স্বল্পতা, নগর তাপমাত্রা বৃদ্ধি, আবাসন সঙ্কট এবং অপরিকল্পিত শিল্প ও রাসায়নিক গুদাম স্থাপনসহ নানা সমস্যায় ঢাকা ইতোমধ্যে বিপর্যস্ত। তিনি বলেন, পরিকল্পনার মূল কাঠামোকে আরো দুর্বল করে এমন সিদ্ধান্ত নগরের বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. মু: মুসলেহ উদ্দিন হাসান বলেন, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক মাসে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পরিবর্তে পরিকল্পনা লঙ্ঘনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এতে মনে হচ্ছে, সচিবালয় ও মন্ত্রণালয়ের একটি পক্ষ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের এই উদ্যোগকে নস্যাৎ করার চেষ্টা করছে। পুরান ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়, যেখানে এমনিতেই খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থানের অভাব রয়েছে, সেখানে ভারী শিল্পের অনুমোদনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। ড্যাপ সংশোধনের জন্য কারিগরি কমিটি গঠনে সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকারকে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় ফ্যাসিবাদের শিকড় উপড়ে ফেলতে না পারলে এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর প্রভাব ও অনিয়ম দূর করা না গেলে সরকারের পরিকল্পিত উন্নয়নের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না।
পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে একটি বিশেষ ব্যবসায়ী ও শিল্পগোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে জনস্বার্থ ও পরিকল্পনাকে উপেক্ষা করে আসছে। তারা বিভিন্ন সময়ে সরকারের সমর্থন ও বৈধতাও পেয়েছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর পরিকল্পনা লঙ্ঘনের প্রবণতা আরো বেড়েছে। পেশাজীবীদের উন্নয়ন কার্যক্রমের সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করে ড্যাপের জনস্বার্থবিরোধী সংশোধনী বাদ দেয়ার দাবি জানান তিনি।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








