ইসরাইলে সরকার গঠন নিয়ে অচলাবস্থা

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

Advertisement

ইসরাইলের সাধারণ নির্বাচনে ভোটগণনা শেষ হওয়ার পর সরকার গঠন নিয়ে চরম অচলাবস্থার মধ্যেই এবার বড় ধাক্কা খেয়েছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তার দল লিকুদ পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট ছেড়ে বিরোধী শিবিরকে সমর্থন দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে কট্টরপন্থী ইহুদি দল ‘ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম’ (ইউটিজে)। রয়টার্স ও আলজাজিরা।
ইসরাইলের টিভি  চ্যানেল ১২ জানিয়েছে, ইউটিজে এই পদক্ষেপ নিলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে দলটির দীর্ঘদিনের জোট ভেঙে যাবে। এ দিকে বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোটের সংখ্যালঘু সরকারকে বাইর থেকে সমর্থন দেয়ার কথা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে ইউটিজে।
নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইউটিজে সরকারের দলে যোগ দেবে না। তবে তারা সরকারের কোনো কাজের বিরুদ্ধেও ভোট দেবে না। কোনো ভোট হলে তারা ভোটদানে বিরত থাকবে, যাতে আইজেনকোটের সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে। চ্যানেল ১২ জানিয়েছে, কট্টরপন্থী ইহুদি দল ‘ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের’(ইউটিজে) ৭টি আসন বাদ দিলে নেতানিয়াহুর জোটের আসন সংখ্যা দাঁড়াবে ৪৬টি, যেখানে আইজেনকোটের জোটের আসন সংখ্যা ৪৮টি। আইজেনকোট ইসলামপন্থী রা’আম পার্টির সমর্থনও চাইতে পারেন। এই দলটি নেসেটে (ইসরাইলি পার্লামেন্ট) আটটি আসন পেয়েছে।
সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ইউটিজে নেতানিয়াহুর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে দল বদল করার কথা ভাবছে। কারণ, নেতানিয়াহু তাদের একটি বড় দাবি পূরণ করেননি। দাবিটি হলো- ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (ইয়েশিভা) ছাত্রদের যেন সেনাবাহিনীতে কাজ করতে না হয়, সেই আইন পাস করা। দাবি আদায় না হওয়াতেই ক্ষুব্ধ হয়ে জোট ছাড়া এবং বাইরে থেকে আইজেনকোটের সংখ্যালঘু সরকারকে সমর্থন দেয়ার কথা বিবেচনা করছে ইউটিজে।
ইউটিজে এর এক সূত্র চ্যানেল ১২-কে বলেছেন, ‘আমরা নেতানিয়াহুর কাছ থেকে কিছুই পাবো না। তার সাথে আমাদের জোটের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, বিশেষ করে এখন যখন তার কাছে ৬১টি আসন নেই। আমাদের উদ্দেশ্য হলো, আবারো নেসেটে একটি শক্তিশালী এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো দল হওয়া।’ 
ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেটের মোট আসনসংখ্যা ১২০। ফলে সে দেশে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় জাদুসংখ্যা (ম্যাজিক ফিগার) ৬১। কোনো দল বা জোটই নির্বাচনে এত আসন পায়নি। লিকুদ পার্টির নেতৃত্বাধীন শাসকজোট ৫৩টি এবং বিরোধী নেতা জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোট ৪৮টিতে জিতেছে। ১৯টি আসন পেয়েছে আরব মসুলিমদের দু’টি সংগঠনের ঝুলিতে। নেতানিয়াহু শিবিরের ৫৩টি আসনের মধ্যে এককভাবে লিকুদ পার্টি জিতেছে ২৭টিতে।
নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই সরকার গঠন নিয়ে বহুমুখী কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক দরকষাকষি শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অচলাবস্থা নিরসনে মূলত চারটি সম্ভাব্য পথ খোলা রয়েছে। প্রথমত, বিরোধী দলগুলো ইহুদি-আরব সহযোগিতার ভিত্তিতে সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারে। তবে নাফতালি বেনেট এবং অ্যাভিগডোর লিবারম্যানের মতো কট্টর ডানপন্থী নেতারা আরব দলগুলোর ওপর নির্ভরশীলতার তীব্র বিরোধিতা করায় এই পথ বেশ কঠিন। দ্বিতীয়ত, দুই জোটের ভাঙন ধরে একটি জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠিত হতে পারে, যেখানে নেতানিয়াহু উগ্র ডানপন্থীদের বাদ দিয়ে বিরোধীদের কিছু অংশকে নিয়ে সমঝোতায় আসতে পারেন। তৃতীয়ত, বিরোধী শিবিরের আইনপ্রণেতাদের দলত্যাগে উৎসাহিত করে সংখ্যা গড়ার চেষ্টা করতে পারেন নেতানিয়াহু। চতুর্থত, ওপরের কোনো প্রচেষ্টা সফল না হলে ইসরাইলকে নতুন নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হবে।
এ দিকে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল নিয়ে নানা বিতর্ক ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। লিকুদ পার্টি আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে ভোট চুরির গুরুতর অভিযোগ তুললেও কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি ও ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডিন লিভনে এই অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে খারিজ করে দিয়েছেন। 
এরই মধ্যে নেতানিয়াহুর বর্তমান জোটের অন্যতম শরিক দল ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম (ইউটিজে) বিরোধী নির্বাচনের এই ত্রিশঙ্কু পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের প্রশংসাসূচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। অন্য দিকে আগামী বুধবার ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত ফলাফল জমা দেয়ার কথা রয়েছে। এরপর তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সাথে বৈঠক করে সরকার গঠনের পরবর্তী প্রক্রিয়া শুরু করবেন। তবে বিশেষ ব্যালট পেপার বা ‘ডাবল এনভেলপ’ গণনা শেষে আসনের সমীকরণে সামান্য পরিবর্তন এলেও স্থিতিশীল সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটতে সময় লাগবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
তবে নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারালে তাকে এমন কিছু পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, যা এড়ানোর চেষ্টা করে আসছেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্নীতির অভিযোগে তাকে জবাবদিহির মুখে পড়তে হতে পারে। পাশাপাশি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে চালানো হামলার সময় নিরাপত্তাব্যবস্থায় কী ধরনের ব্যর্থতা ছিল, তা নিয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরুর সম্ভাবনাও রয়েছে।
আরব দলগুলো সরকারি জোটে যোগ না দিলেও পার্লামেন্টে নেতানিয়াহু-বিরোধীদের সমর্থন দিয়ে নিজেদের শক্তির জানান দিতে পারে। নতুন স্পিকার নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠনের আগেই তারা পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণ ও বিভিন্ন আইন পাসের প্রক্রিয়া নিজেদের হাতে নিতে পারবে।
নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট শর্ত সাপেক্ষে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সাথে একযোগে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছেন। আরব দলগুলোর জোট ‘জয়েন্ট লিস্টে’র দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা আহমদ তিবি আর্মি রেডিওকে জানিয়েছেন, নতুন স্পিকার নিয়োগের বিষয়ে আলোচনা করতে বিরোধী জোট তার সাথে যোগাযোগ করেছে এবং আরব দলগুলো বিরোধী জোটের প্রার্থীকেই সমর্থন দেবে।
তবে দলগুলো সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে আগামী বছরের শুরুর দিকে ইসরাইলে আবার নতুন নির্বাচন হতে পারে। নেতানিয়াহুর জোট একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর তার দল কোনো প্রমাণ ছাড়াই অভিযোগ তুলেছে, আরব দলগুলো বিদেশী শক্তির সহায়তায় এই নির্বাচনে কারচুপি করেছে। জবাবে বিরোধী দলগুলো নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আরব জনগণকে খাটো করার এবং নির্বাচনের ঐতিহাসিক ফলাফলকে অবৈধ প্রমাণের চেষ্টা চালানোর অভিযোগ তুলেছে।