ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি আলোচনা ফেরাতে কাতারের প্রতিনিধিদল তেহরানে

  নয়া দিগন্ত ডেস্ক

Advertisement

ইরানের সাথে নতুন করে শান্তি আলোচনা শুরু করতে উদ্যোগী হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানকে চিঠি দিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। ওদিকে, নতুন কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের একটি প্রতিনিধিদল গতকাল শুক্রবার তেহরানে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করতে। 
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভান্স ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সেক্রেটারি মোহসেন রেজায়িকে চিঠি পাঠিয়েছেন গত সপ্তাহে। এতে তিনি যুদ্ধ বন্ধে শান্তি আলোচনা নতুন করে শুরুর প্রস্তাব দিয়েছেন। ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ বৃহস্পতিবার এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এ খবর জানিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, ওয়াশিংটনের প্রধান  উদ্দেশ্য ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা থেকে বিরত রাখা, পাশাপাশি ইরানের অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার বিষয়ে তেহরানের স্বার্থকে স্বীকৃতি দেয়া। ওই খবর অনুযায়ী, ভাইস প্রেসিডেন্ট ইরানকে এও বলেছেন যে, তাদের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করার জন্য অনুমোদিত প্রতিনিধি নিয়োগ করা প্রয়োজন।
মার্কিন ওই কর্মকর্তা বলেছেন, দুই পক্ষ যদি সরাসরি আলোচনায় রাজি হয়, তবে ভান্স এবং রেজায়ির মধ্যে বৈঠক আয়োজন করতে পারে তুরস্কের ইস্তাম্বুল বা কাতারের দোহা। ওয়াশিংটন পোস্টের খবরে বলা হয়, মার্কিন কর্মকর্তারা রেজায়িকে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবেই বিবেচনা করেছেন। কারণ ইরানের নিরাপত্তাবাহিনীতে তার প্রভাব আছে এবং সর্বোচ্চ নেতা মুজতাবা খামেনির সাথে তার সরাসরি যোগাযোগ আছে।
বার্ত সংস্থা রয়টার্স আলোচনার বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতা এগিয়ে নিতে কাতারি মধ্যস্থতাকারীরা শুক্রবার তেহরানে গেছেন। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং তেহরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ নিয়ে দু’পক্ষে যে দ্বিমত আছে, তা কমিয়ে আনার জন্য কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মিলে কাজ করছেন। একটি চুক্তিতে পৌঁছার জন্য কোনো কাজটি আগে আর কোন কাজটি পরে করা হবে, তা নিয়ে দু’পক্ষ একমত হতে পারছে না। 
ওয়াশিংটন শুরু থেকেই ইরানের পারমাণবিক বিষয়গুলোর ওপর আলোকপাত করা এবং সেগুলোর সমাধান চায়, যেখানে তেহরান জোর দিয়ে বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমে তাদের নৌ অবরোধ তুলতে হবে এবং ইরানের তেল রফতানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে।
গত রোববার কাতার ইরানের কাছে একটি খসড়া শান্তি প্রস্তাব পেশ করেছিল; কিন্তু পরে ইরানের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এই প্রস্তাব ‘গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে অভিহিত করেন এবং জানান যে, পারমাণবিক বিষয়ে তেহরান নিজের অবস্থান পরিবর্তন করবে না। ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে যে, কাতারের প্রতিনিধিরা রেজায়ি এবং অন্যান্য ঊর্ধ্বতন ইরানি কর্মকর্তার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখে চলেছেন। ওদিকে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের সরাসরি চিঠিটিকে ইরানি নেতারা সম্মানের নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করছেন, যদিও তারা পারমাণবিক বিষয়ে নিজেদের অবস্থান বদলেছেন এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে যুদ্ধ শুরু। পাল্টা জবাবে ইরানও ইসরাইলে এবং কয়েকটি আরব দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। পরে জুন মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি সমঝাতাচুক্তি সই হয় এবং চূড়ান্ত চুক্তির জন্য তারা আলোচনায়ও বসেছিল। তবে হরমুজ প্রণালীতে মুক্ত ও নিরাপদ নৌচলাচল নিয়ে মতবিরোধের কারণে সেই আলোচনা ভেস্তে যায়।
ইরানে সপ্তাহব্যাপী হামলার প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল আগামী ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য এক সপ্তাহব্যাপী সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। সম্ভাব্য এ অভিযানে ইরানের নেতৃত্ব, পারমাণবিক স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। তবে নতুন করে বড় ধরনের সঙ্ঘাত এড়াতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে উপসাগরীয় দেশগুলো।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের খবরে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য সাত দিনের সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের কর্মকর্তারা। তবে এ বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। অন্য দিকে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) এক খবরে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি মিত্র দেশকে নতুন করে সামরিক অভিযান এবং এর জবাবে ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলার বিষয়ে সতর্ক করেছে। ইরানের পাল্টা হামলায় জ্বালানি স্থাপনাসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অ্যাক্সিওসের খবরে আরো বলা হয়, সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি ও সমন্বয় নিয়ে গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের সাথে কথা বলেছেন ইসরাইলের সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াল জামির। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শেষ করার অঙ্গীকার করেছেন। গত ২০ অক্টোবর দেয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, অভিযান সম্পন্ন করার অর্থ হলো ইরানের নেতৃত্বের পতন ঘটানো। দেশটির সরকার পরিবর্তনকে ইসরাইলের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। এ বিষয়ে ট্রাম্পের সাথে আলোচনা করেছেন বলেও জানান নেতানিয়াহু। তবে ওয়াশিংটন এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সম্মত হয়েছে, এমন কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।
এ দিকে সম্ভাব্য সঙ্ঘাত ঠেকাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছে উপসাগরীয় দেশগুলো। সংযুক্ত আরব আমিরাত সংযম প্রদর্শন ও রাজনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। কাতার তেহরান ও ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় শেষ মুহূর্তের চেষ্টা চালাচ্ছে। অন্য দিকে আলোচনার জন্য ওয়াশিংটনকে আরো সময় দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে সৌদি আরব। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক খবরে বলা হয়েছে, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর সম্ভাব্য স্বল্পমেয়াদি কিন্তু তীব্র সামরিক অভিযানের জন্য প্রস্তুত থাকতে উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশকে সতর্ক করেছে ওয়াশিংটন। সম্ভাব্য অভিযানের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে পেন্টাগন। এর অংশ হিসেবে ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট বিমানবাহী রণতরী এবং মেরিন সেনা বহনকারী উভচর অবতরণকারী যুদ্ধজাহাজ আরব উপসাগরের দিকে পাঠানো হয়েছে।
এপির তথ্য অনুযায়ী, এ মোতায়েনে প্রায় ৯ হাজার সামরিক সদস্য রয়েছেন। এর ফলে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ও মেরিন সেনার মোট উপস্থিতি ২০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। তাদের সহায়তায় থাকবে কয়েকশ’ সামরিক উড়োজাহাজ। 
হরমুজে মাইনের আঘাতে ৪ তেলবাহী জাহাজে বিস্ফোরণ
এ দিকে হরমুজ প্রণালীতে সাগরের তলদেশে পুঁতে রাখা মাইনের আঘাতে চারটি তেলবাহী জাহাজে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছে ইরানের সশস্ত্রবাহিনী। পৃথক বিবৃতিতে দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ও সেনাবাহিনী এ তথ্য জানায়। আইআরজিসির দাবি হরমুজ প্রণালীর দক্ষিণাঞ্চলের অননুমোদিত নৌপথ দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করার সময় তিনটি তেলবাহী জাহাজ মাইনের আঘাতে বিস্ফোরিত হয়। এতে জাহাজগুলোতে আগুন ধরে যায়। পরে বৃহস্পতিবার ইরানের সেনাবাহিনী জানায়, প্রণালীর পূর্বাঞ্চলে নিষিদ্ধ ও বিপজ্জনক এলাকায় চলাচলের সময় আরো একটি তেলবাহী জাহাজ মাইন বিস্ফোরণের শিকার হয়েছে। ইরানের দাবি অনুযায়ী, প্রথম তিনটি জাহাজের রাডার ও নেভিগেশন ব্যবস্থা বন্ধ ছিল। এ ছাড়া আইআরজিসি নৌবাহিনীর সতর্কবার্তাও উপেক্ষা করেছিল জাহাজগুলো। তবে ঘটনাগুলোর সুনির্দিষ্ট সময় এবং সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর পতাকাবাহী দেশ সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও বৃহস্পতিবার গভীর রাতে জানিয়েছে, ওমানের খাসাব উপকূল থেকে প্রায় ২৫ নটিক্যাল মাইল বা ৪৬ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে হরমুজ প্রণালীতে একটি জাহাজে আগুন লাগার খবর পেয়েছে তারা। এর আগে একই এলাকায় আরো দু’টি সামুদ্রিক নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনার কথা জানিয়েছিল সংস্থাটি। এর একটি ঘটনায় আগুন ধরে ডুবে যায় ঐতিহ্যবাহী একটি আরবীয় নৌযান। অন্য ঘটনায় হরমুজ প্রণালী অতিক্রমের সময় অজ্ঞাত কোনো বস্তু বা ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি তেলবাহী জাহাজ।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই হরমুজ প্রণালীতে মাইন বিস্ফোরণের ঘটনা নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি করে আসছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক মাধ্যমে জানায়, জাহাজ চলাচলের প্রধান পথগুলো থেকে সব মাইন অপসারণ করা হয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার এ দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, হরমুজ থেকে মাইন সরানোর দাবির পক্ষে শুধু বিবৃতি নয়, স্বাধীন প্রমাণ দিতে হবে।