
- আগের ৫ বছরের যেকোনো পূর্ণ বছরের রেকর্ড ছাড়াল
- আহত ১৩৬১ শিশু, ধর্ষণের শিকার ৩৯২
- শিশু সুরায় রাষ্ট্রের কঠোর ভূমিকা চান বিশেষজ্ঞরা
দেশে চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসেই শিশুদের ওপর সহিংসতার এক হাজার ৮১০টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা আগের ৫ বছরের প্রতিটি পূর্ণ বছরের তুলনায় বেশি। এসব ঘটনায় ৪৯৪ শিশু নিহত ও এক হাজার ৩৬১ শিশু আহত হয়েছে। একই সময়ে ৩৯২ শিশু ধর্ষণ এবং ২৭৬ শিশু যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৮ শিশুকে। গত বছরের পুরো সময়ের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে শিশুদের ওপর সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে প্রায় ৩২ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তির অপব্যবহার, পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়া এবং বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা শিশুদের ওপর সহিংসতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় রাষ্ট্রের কঠোর ভূমিকা, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং শিশু সুরায় সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) ‘বাংলাদেশে শিশু অধিকার লঙ্ঘন: ২০২১ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬’ শীর্ষক বিশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ এবং সংস্থাটির নিজস্ব অনুসন্ধান ও পর্যবেণের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে শিশুদের ওপর সহিংসতার ঘটনা গত বছরের পুরো সময়ের তুলনায় প্রায় ৩২ শতাংশ বেশি নথিভুক্ত হয়েছে। ২০২৫ সালে এক হাজার ৩৭১টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হলেও চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৮১০টিতে। অর্থাৎ গত বছরের পুরো সময়ের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসেই ৪৩৯টি বেশি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
নিহত শিশুর সংখ্যাও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। গত বছরের পুরো সময়ে ২৮৮ শিশু নিহত হলেও চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসেই নিহত হয়েছে ৪৯৪ শিশু। এ হিসাবে গত বছরের পুরো সময়ের তুলনায় চলতি বছরের ৯ মাসে নিহত শিশুর সংখ্যা প্রায় ৭২ শতাংশ বেশি। গত বছর প্রতি মাসে গড়ে ২৪ শিশু নিহত হলেও চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে মাসিক গড় প্রায় ৫৫ জন। অর্থাৎ মাসিক গড় হিসাবে শিশু নিহতের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।
আহত শিশুর সংখ্যাও গত বছরের পুরো সময়কে ছাড়িয়ে গেছে। ২০২৫ সালে এক হাজার ৮৩ শিশু আহত হলেও চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসেই আহত হয়েছে এক হাজার ৩৬১ শিশু। অর্থাৎ গত বছরের পুরো সময়ের তুলনায় ৯ মাসেই আহত শিশুর সংখ্যা প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি।
ধর্ষণের প্রায় ৬০ শতাংশ ঘটনায় শিশু ভুক্তভোগী
চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে দেশে নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের মোট ৬৫৭টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৯২টি ঘটনায় ভুক্তভোগী ছিল শিশু। অর্থাৎ মোট ধর্ষণের ঘটনার ৫৯ দশমিক ৭ শতাংশে ভুক্তভোগী শিশু। প্রতি ১০০টি ধর্ষণের ঘটনার মধ্যে প্রায় ৬০টিতেই শিশু ভুক্তভোগী ছিল। এই হার গত ৫ বছর ৯ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২১ সালে মোট ধর্ষণের ঘটনার ৫৭ দশমিক ১ শতাংশে ভুক্তভোগী ছিল শিশু। ২০২২ সালে এ হার ছিল ৫৭ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৫৬ দশমিক ২ শতাংশ, ২০২৪ সালে ৫০ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ৫৭ দশমিক ২ শতাংশ।
চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৪৪টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। গত বছরের পুরো সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৪৭৪টি, মাসে গড়ে প্রায় ৪০টি। ফলে মাসিক গড় বিবেচনায় শিশু ধর্ষণের ঘটনা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি।
এদিকে শিশু যৌন হয়রানির ঘটনাও বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ২৭৬ শিশু যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। গত বছরের পুরো সময়ে এ সংখ্যা ছিল ২৩৬টি। অর্থাৎ গত বছরের ১২ মাসের তুলনায় চলতি বছরের ৯ মাসেই শিশু যৌন হয়রানির ঘটনা প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি নথিভুক্ত হয়েছে।
চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে নারী ও কন্যাশিশু যৌন হয়রানির মোট ৬৯৬টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ ঘটনায় ভুক্তভোগী ছিল শিশু। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ধর্ষণের পর ১৮ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। গত বছরের পুরো সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১৭টি।
৫ বছর ৯ মাসে নিহত ২৫৯৮ শিশু
এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে শিশুদের ওপর সহিংসতার আট হাজার ৭২৫টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় দুই হাজার ৫৯৮ শিশু নিহত এবং ১১ হাজার ৪৫৮ শিশু আহত হয়েছে।
একই সময়ে তিন হাজার ৪৮৭টি শিশু ধর্ষণ ও এক হাজার ৩৫৫টি শিশু যৌন হয়রানির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৩১ শিশুকে। বছরভিত্তিক হিসাবে ২০২১ সালে এক হাজার ৭২৫টি, ২০২২ সালে এক হাজার ৪১৫টি, ২০২৩ সালে এক হাজার ৩৫২টি, ২০২৪ সালে এক হাজার ৫২টি এবং ২০২৫ সালে এক হাজার ৩৭১টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। অথচ চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসেই এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৮১০টিতে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে সবচেয়ে বেশি ৬৬৪ শিশু নিহত এবং চার হাজার ৩৭৮ শিশু আহত হয়। ওই বছর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে সংঘটিত রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতার প্রভাব থাকতে পারে বলে মনে করছে এইচআরএসএস। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ঘটনাভিত্তিক তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
কার্যকর পদেেপর আহ্বান বিশেষজ্ঞদের
চাইল্ড হেল্পলাইনের ব্যবস্থাপক চৌধুরী মোহায়মেন নয়া দিগন্তকে বলেন, শিশু সহিংসতা বৃদ্ধির পেছনে প্রযুক্তির অপব্যবহার, সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়া, মানবিক দায়বদ্ধতা ও সহনশীলতা কমে যাওয়া এবং বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা অন্যতম কারণ। শিশু নির্যাতনের অনেক ঘটনা আগেও ঘটত, তবে সেগুলো প্রকাশ পেত না কিংবা ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করতেন না। বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির সহজলভ্যতায় এসব ঘটনা বেশি প্রকাশ পাচ্ছে। পাশাপাশি অনলাইনে নেতিবাচক ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের বিস্তার মানুষের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি করছে এবং সহনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে। তিনি বলেন, শিশুরা এখন পরিবার, শিাপ্রতিষ্ঠান, পাড়া-মহল্লা, রাস্তাঘাট ও আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমেও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। সাইবার অপরাধের বিস্তার তাদের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে।
তিনি আরো বলেন, আগে শিশুরা যৌথ পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে সামাজিক ও মানবিক শিা অর্জনের সুযোগ পেত। বর্তমানে ছোট পরিবারে সেই সুযোগ কমে যাচ্ছে। মানুষের মধ্যে একাত্মতা, মানবিক দায়বদ্ধতা ও সামাজিক সংবেদনশীলতা কমে যাওয়ায় অপরাধের ধরন ক্রমেই আগ্রাসী হয়ে উঠছে। শিশু সহিংসতা প্রতিরোধে পরিবার, সমাজ, শিাপ্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ও আইনি প্রক্রিয়ায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন চৌধুরী মোহায়মেন। এ জন্য পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন জোরদার, শিশুদের নৈতিক ও মানবিক শিা নিশ্চিত করা, প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও ইসলামী বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ নয়া দিগন্তকে বলেন, শিশু নির্যাতনের অন্যতম প্রধান কারণ নির্যাতিত শিশুদের পে আইনি প্রতিকার চাওয়ার মতো মানুষের অভাব। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শিশুরা বেশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। দারিদ্র্যের কারণে এসব শিশু অল্প বয়সেই শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছেন অনেক নিয়োগকর্তা। শিশু নির্যাতন বন্ধে রাষ্ট্রকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। শিশুর পে কেউ মামলা করুক বা না করুক, রাষ্ট্রকেই এগিয়ে এসে নির্যাতনের প্রতিকার ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রের ভূমিকার সমালোচনা করে এই আইন বিশেষজ্ঞ বলেন, রাষ্ট্র কাগজে-কলমে পোশাকশিল্পে শিশুশ্রম বন্ধ করতে পারলেও অনানুষ্ঠানিক খাতে এখনো তা বন্ধ করতে পারেনি।
তিনি আরো বলেন, আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের প্রশিণে শিশু অধিকার এবং নির্যাতন প্রতিরোধের বিষয়টি কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কোনো শিশু নির্যাতিত হলে তার পরিবার বিচার চাক বা না চাক, রাষ্ট্রকে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। রাষ্ট্র কঠোরভাবে দায়িত্ব পালন করলে শিশু নির্যাতনের হার কমিয়ে আনা সম্ভব।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








