
মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন ফ্রান্স
ফ্রান্সকে নতুন করে গড়ে তোলার অঙ্গীকার নিয়ে আগামী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রচার শুরু করেছেন দেশটির চরম ডানপন্থী রাজনৈতিক দল জাতীয় সমাবেশের (আরএন) নেত্রী মেরিন ল্য পেন। রোববার অর্লেয়াঁ শহরে দলের সম্মেলনে প্রথম বড় নির্বাচনী ভাষণে তিনি ফ্রান্সের ‘নবজাগরণ’-এর স্বপ্ন তুলে ধরেন। তবে এই পরিবর্তন কোনো আকস্মিক ভাঙন কিংবা ধ্বংসাত্মক বিপ্লবের মাধ্যমে নয়, বরং শক্তিশালী নেতৃত্ব ও দৃঢ় নীতির মাধ্যমে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
ফরাসি সংবাদমাধ্যম ল্য মোঁদ ও বার্তা সংস্থা এএফপির তথ্য অনুযায়ী, প্রায় আট হাজার ৫০০ দলীয় সমর্থকের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এ সমাবেশে ল্য পেন তার নির্বাচনী প্রচারের মূল প্রতিপাদ্য হিসেবে ‘নবজাগরণ’কে তুলে ধরেন। তার দাবি, ফ্রান্সের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জনগণের মধ্যে যে অসন্তোষ রয়েছে, তা তার দলের বক্তব্যের পক্ষেই জনসমর্থন তৈরি করেছে। ক্ষমতায় গেলে দেশের নিরাপত্তা, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার ইঙ্গিতও দেন তিনি।
ল্য পেনের বক্তব্যে সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণের চেয়ে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার পরিকল্পনা ও পরিবর্তনের ইতিবাচক বার্তা বেশি গুরুত্ব পায়। তবে তার ঘোষিত ‘নবজাগরণ’-এর পেছনে রয়েছে জাতীয় সমাবেশ দলের পরিচিত কঠোর নিরাপত্তা ও অভিবাসননীতি। দলের আরেক শীর্ষ নেতা জর্দান বারদেলা বলেন, ক্ষমতায় গেলে আইনসম্মত সব উপায় ব্যবহার করে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং সাধারণ নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।
ল্য পেন জানান, নির্বাচনে জয়ী হলে বারদেলাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিতে চান তিনি। একই সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তিকে নিয়ে ‘জাতীয় ঐক্যের’ সরকার গঠনের আকাক্সক্ষা প্রকাশ করেন। তাদের মিত্র এরিক সিওত্তিও ফ্রান্সের স্বার্থে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্যের আহ্বান জানান এবং প্রজাতন্ত্রী দলের সাবেক সহকর্মীদের জাতীয় সমাবেশের শিবিরে ফিরে আসার আহ্বান জানান।
তবে নির্বাচনী প্রচারের এই সূচনার মধ্যেই আইনি অনিশ্চয়তা ল্য পেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ইউরোপীয় সংসদের সহকারীদের নিয়োগসংক্রান্ত অর্থ আত্মসাতের মামলায় তার বিরুদ্ধে দেয়া দণ্ডাদেশ চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফ্রান্সের সর্বোচ্চ আপিল আদালত তার আপিল খারিজ করলে নির্বাচনের প্রথম দফার কয়েক সপ্তাহ আগেই এই রায় চূড়ান্ত হতে পারে। ফলে নির্বাচনে তার প্রার্থিতার ওপর এর কী প্রভাব পড়বে, তা রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
জাতীয় সমাবেশ দলের সম্মেলনকে কেন্দ্র করে অর্লেয়াঁ শহরে সপ্তাহান্তজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। প্রায় তিন হাজার পুলিশ ও জাতীয় নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন করা হয়। শনিবার চরম ডানপন্থার বিরুদ্ধে বিক্ষোভে আনুমানিক ১৩ হাজার থেকে ২৬ হাজার মানুষ অংশ নেন। রোববারও প্রায় এক ’শ ফ্যাসিবাদবিরোধী কর্মী সমাবেশস্থলের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন, তবে নিরাপত্তাবাহিনী তাদের দূরে সরিয়ে রাখে।
সমাবেশের ভেতরেও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কয়েকজন বিক্ষোভকারী একটি ব্যানার প্রদর্শন করেন, যাতে জাতীয় সমাবেশ দলের বিরুদ্ধে বর্ণবাদ ও ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ তোলা হয়। দলের নেতা বারদেলার বিরুদ্ধে অতীতে ইহুদিবিদ্বেষী লেখা প্রকাশের অভিযোগ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের প্রেক্ষাপটে এই প্রতিবাদ করা হয়। বারদেলা অভিযোগগুলোকে মানহানিকর বলে দাবি করে মামলা করেছেন।
ফ্রান্সের ইহুদি শিক্ষার্থীদের সংগঠন এই প্রতিবাদের দায় স্বীকার করে। ব্যানার প্রদর্শনের পর সমাবেশে উপস্থিত কয়েকজনের সাথে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয় এবং দলের নিরাপত্তাকর্মীরা তাদের বের করে দেন। ঘটনাস্থলের কাছাকাছি থাকা অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ‘মেদিয়াপার’-এর এক সাংবাদিককেও বের করে দেয়া হয়। নিরাপত্তার অভাবের অভিযোগ তুলে সংবাদমাধ্যমটির সাংবাদিকরা পরে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন।
এত উত্তেজনা ও প্রতিবাদের মধ্যেও ল্য পেন তার ভাষণের মূল বক্তব্য থেকে সরে আসেননি। তিনি ‘নাগরিক শিষ্টাচার’ ও সামাজিক সৌজন্যকে তার প্রস্তাবিত নবজাগরণের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, সমাজে সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা কমানোর অন্যতম কার্যকর পথ হলো নাগরিক আচরণে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে ল্য পেনের এই ভাষণ কেবল নির্বাচনী প্রচারের সূচনা নয়; বরং চরম ডানপন্থী জাতীয় সমাবেশ দলের ভাবমূর্তি আরো গ্রহণযোগ্য করে তোলার প্রচেষ্টারও প্রতিফলন। পরিবর্তনের আশ্বাস, জাতীয় ঐক্যের আহ্বান এবং নিরাপত্তা ও অভিবাসন প্রশ্নে কঠোর অবস্থান; এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে দলটি নির্বাচনী লড়াইয়ে এগোতে চাইছে। তবে আইনি অনিশ্চয়তা, বিরোধীদের প্রতিবাদ এবং দলের বিরুদ্ধে ওঠা বিতর্ক আগামী দিনে তাদের নির্বাচনী কৌশলকে কতটা প্রভাবিত করবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








