
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে কেন শঙ্কিত ভারতের তরুণ প্রজন্ম? টাইম ম্যাগাজিন এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখতে পেয়েছে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সবচেয়ে বড় ‘অর্জন’ বলতে গেলে হিন্দুত্ববাদের বয়ানকে স্বাভাবিক করে তোলা। কিন্তু তিনি এটা করতে গিয়ে ভারতের আদালত, নির্বাচন কমিশনের মত জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেঙে ফেলেছেন। এ কারণেই সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ভারতজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেয়ার প্রক্রিয়াটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সমালোচকদের দাবি, মোদির জনতা পার্টিকে (বিজেপি) শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই এটি করা হয়েছে। ভারতে চলমান এই বিক্ষোভ এবং এর তাৎপর্য নিয়ে আলোচনার জন্য ‘টাইম’ কথা বলেছে ইতিহাসবিদ, ঔপন্যাসিক ও ভারতের অন্যতম সুপরিচিত লেখক মুকুল কেশবানের সাথে। নয়া দিগন্তের পাঠকদের জন্যে তা তুলে ধরা হলো।
প্রশ্ন : ভারতের নির্বাচন দীর্ঘকাল ধরেই জাতীয় গর্বের উৎস হয়ে রয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলী কি দেশে বা বিদেশে সেই ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে?
মুকুল কেশবান : নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে টি. এন. শেষন প্রধান নির্বাচন কমিশনার হওয়ার আগ পর্যন্ত ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থা কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। তিনি ছিলেন এক অদ্ভুত, আত্মকেন্দ্রিক মানুষ, যিনি নিজের দায়িত্বকে এতটাই গুরুত্বের সাথে নিয়েছিলেন যে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াকেই তিনি ঢেলে সাজিয়েছিলেন। নির্বাচন কমিশন তিন সদস্যের একটি সংস্থায় পরিণত হয়, যা মোটামুটি নিরপেক্ষই ছিল। কিন্তু মোদি সরকার এমন একটি আইন পাস করে, যার ফলে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগকারী এই তিন সদস্যের প্যানেলে সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হয়ে যায়। জ্ঞানেশ কুমার অত্যন্ত পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করেছেন এবং ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকা এমনভাবে সাজানোর চেষ্টা করা হয়েছে যা স্পষ্টতই বিজেপির অনুকূলে যায়। ফলে এই প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা জনসমক্ষে ক্ষুণœ হয়েছে। ভারত এখন তুরস্কের মতো অন্যান্য দেশের ‘নির্বাচনী স্বৈরতান্ত্রিক’ ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
প্রশ্ন : এই প্রতিবাদ-বিক্ষোভগুলো মোদির অবস্থান সম্পর্কে কী ইঙ্গিত দেয়?
মুকুল কেশবান : প্রচলিত ভাষায় বলতে গেলে, মোদির সেই ভীতিজাগানিয়া ও কর্তৃত্বপূর্ণ ভাবমূর্তি যে এখন ফিকে হয়ে এসেছে, তা স্পষ্ট। বিশেষ করে যন্তর মন্তরে সমবেত তরুণ প্রজন্মের- যাদের মধ্যে তরুণীদের সংখ্যাই বেশি- উপহাস ও কঠোর মনোভাব এমন এক কাজ করেছে যা প্রথাগত আদর্শিক বিরোধীরা করতে ব্যর্থ হয়েছিল : এটি মোদিকে হাস্যকর, বৃদ্ধ এবং বাস্তববিচ্ছিন্ন এক মানুষ হিসেবে তুলে ধরেছে। এই প্রতিবাদগুলো তার নির্বাচনী প্রভাব সম্পর্কে কী বার্তা দেয়, তা এখনই বলা কঠিন; সেটি জানার জন্য আমাদের পরবর্তী নির্বাচনের অপেক্ষা করতে হবে। বিরোধী দলগুলোকে এখন এই জনরোষকে কিভাবে ভোটে রূপান্তর করা যায়, সেই পথ খুঁজে বের করতে হবে।
প্রশ্ন : মোদির ১২ বছরের শাসনামলে তার প্রকৃত অর্জনগুলো কী কী?
মুকুল কেশবান : অবকাঠামোগত ক্ষেত্রে কিছু অর্জন রয়েছে- যেমন রাস্তাঘাট নির্মাণ, বিমানবন্দর তৈরি ইত্যাদি। স্বৈরাচারী শাসকরা সাধারণত এসব কাজে দক্ষ হয়ে থাকেন। তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান বা কল্যাণের ক্ষেত্রে ঠিক কী অর্থ বহন করে, তা বোঝা কঠিন। ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে তার শাসনামল ছিল বিপর্যয়কর : ভারতের সাথে তার সব প্রতিবেশীর সম্পর্ক খারাপ হয়েছে, চীনের বিষয়ে ভারত এক ধরনের অস্বীকারের মানসিকতায় রয়েছে এবং ট্রাম্পের সাথেও ভারতের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। তার অর্জনগুলো নিয়ে আলোচনার চেয়ে বরং তিনি কিভাবে প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে- যেমন সংবাদমাধ্যম, আদালত ও নির্বাচন কমিশন- অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছেন, তা নিয়ে আলোচনা করা হয়তো বেশি অর্থবহ হবে। তার সবচেয়ে বড় ‘অর্জন’ হলো হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদের বয়ানকে স্বাভাবিক করে তোলা।
প্রশ্ন : বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তরুণ জনগোষ্ঠী ভারতে রয়েছে, অথচ এখানকার শিক্ষার মান এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা অত্যন্ত হতাশাজনক। যেসব জায়গায় তরুণরা প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করছে, সেসব স্থানের পরিস্থিতির সাথে ভারতের এই অবস্থার তুলনা কিভাবে করা যায়?
মুকুল কেশবান : শ্রীলঙ্কাকে সম্ভবত ব্যতিক্রম হিসেবে ধরা যেতে পারে; তবে নেপাল, বাংলাদেশ ও ভারত- যেখানে সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের মধ্যে অসন্তোষ বা বিদ্রোহ দেখা গেছে- দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশেই স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার মান সাধারণত নিম্নমানের। অবশ্য এর মধ্যে কিছু ব্যতিক্রমও আছে, যেমন- অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। এটি এমনিতেই একটি খারাপ দিক, কিন্তু সব স্তরে নিজেদের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি সাধনে চীনের সাফল্য আমাদের ব্যর্থতাকে আরো হতাশাজনক করে তুলেছে।
প্রশ্ন : এই বিক্ষোভগুলো আসলে কী নিয়ে? এগুলো কি ‘ককরোচ’ আন্দোলনের আগের বিক্ষোভগুলোরই একটি স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা, নাকি ভিন্ন কিছু?
মুকুল কেশবান : এটি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) সেই অবস্থানের (সিট-ইন) সাথে সম্পর্কিত, যা যন্তর মন্তরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং যার ফলে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেই অবস্থান কর্মসূচি মোদি সরকারকে পিছু হটতে বাধ্য করে ভিন্নমতের জন্য একটি পরিসর তৈরি করেছিল। তবে [১২ অক্টোবরের] এই মিছিলটি ছিল ভিন্ন ধরনের; কারণ এটি কংগ্রেস পার্টি এবং অন্যান্য প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্যোগে আয়োজিত হয়েছিল। এই কর্মসূচি আয়োজনের সাথে সিজেপির কোনো সম্পর্ক ছিল না, যদিও তাদের অন্যতম প্রগতিশীল/বামপন্থী মুখ নেহা বোরা সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। এটি একটি সুনির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে ছিল : নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা নিয়ে কারসাজি।
প্রশ্ন : ১০ অক্টোবরের সমাবেশের আগে পুলিশ এই আন্দোলনের নেতাদের আটক করেছিল, আবার কয়েক দিন পর যন্তর মন্তরে তাদের মধ্যে দু’জনকে পুনরায় আটক করা হয়। আন্দোলনের দিকে কিভাবে তাকিয়ে আছে, তা থেকে কী বোঝা যায়?
মুকুল কেশবান : সিজেপির প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি বড় পরিবর্তন এসেছে। যন্তর মন্তরে প্রথমবার (১.০) আয়োজিত কর্মসূচির সময় সরকার এদের গুরুত্ব বুঝতে পারেনি; তারা ভেবেছিল এটি কেবল একটি অবস্থান কর্মসূচি, যা সময়ের সাথে সাথে মিলিয়ে যাবে। কিন্তু ২০ জুলাই তরুণ প্রজন্মের বিপুল উপস্থিতি সরকারকে পুরোপুরি অপ্রস্তুত করে ফেলেছিল। পুলিশের সহিংসতার কারণে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়েছিল- এই ঘটনা থেকে তারা একটি শিক্ষা পেয়েছে যে, এমন কোনো জায়গা ‘ককরোচ’-দের দখলে যেতে দেয়া যাবে না, যেখানে সাধারণ নাগরিকরা পুলিশের মুখোমুখি দাঁড়াবে আর মোবাইল ক্যামেরায় সেই দৃশ্য ধারণ করা হবে। এখন আমরা দেখছি, এই সম্ভাবনাকে শুরুতেই নস্যাৎ করার জন্য সরকার ‘প্রি-এমপ্টিভ ডিটেনশন’ বা আগাম আটকের কৌশল অবলম্বন করছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








