লম্বা ছুটির পর ভালো বাজার আচরণের প্রত্যাশা বিনিয়োগকারীদের

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

Advertisement

দুর্গাপূজার লম্বা সরকারি ছুটির পর আজ পুঁজিবাজার খুলছে। বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা দীর্ঘ ছুটির পর পুঁজিবাজারগুলো ভালো আচরণ করবে। অবশ্য তাদের এই প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে ছুটির আগে শেষ কর্মদিবসের বাজার আচরণ থেকে। ১৯ অক্টোবর সোমবার শেষ কর্মদিবসের বাজার আচরণ ছিল খুবই ইতিবাচক। এর আগে শনিবার ও রোববার দুই কর্মদিবসে পুঁজিবাজারগুলোতে সূচকের যেমন অবনতি ঘটে তেমনি ঢাকা শেয়ারবাজারের লেনদেন নেমে আসে ৩০০ কোটির ঘরে। কিন্তু সোমবার আচরণ পাল্টে ইতিবাচক ধারায় ফিরে পুঁজিবাজারগুলো। সূচকের উন্নতির পাশাপাশি এ দিন লেনদেন খরা দুর হয়। ঢাকা শেয়ারবাজারের লেনদেন অতিক্রম করে ৫০০ কোটি টাকা।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দেশের মূল অর্থনীতির সূচকে খুব একটা পরিবর্তন না এলেও ইতোমধ্যে পুঁজিবাজারের উন্নয়নে বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ডিরেক্ট লিস্টিং বিধিমালার সংশোধন ও আইপিও বিধিমালার সংশোধিত প্রস্তাব জনমত যাচাইয়ে প্রকাশ। তাদের মতে, এ মুহূর্তে গতিশীল একটি পুঁজিবাজারের জন্য ভালো কোম্পানির শেয়ারের সরবরাহ  বৃদ্ধিই সবচেয়ে বেশি জরুরি। এরই আলোকে নেয়া বিএসইসি’র নেয়া এই উদ্যোগগুলো বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিবাচক বার্তা হিসেবে কাজ করবে। ছুটির আগে শেষ কর্মদিবসের বাজার আচরণ তারই ইঙ্গিত বলে মনে করেন তারা। 
যেখানে পুঁজিবাজারে বছরে ১৫ থেকে ২০টি কোম্পানি তালিকাভুক্তির কথা সেখানে গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে আমাদের পুঁজিবাজারে কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি। সর্বশেষ ২০২৪ সালে পাঁচটি কোম্পানি বাজারে তালিকাভুক্ত হয়। এগুলোর মধ্যে তিনটি বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে এবং দু’টি ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে। এর পর আর কোনো কোম্পানির তালিকাভুক্ত হয়নি। অথচ বিগত দুই বছরের মধ্যে কমপক্ষে ২০ থেকে ৩০টি কোম্পানি বাজারে তাািলকাভুক্ত হওয়ার কথা। এ ছাড়া লিস্টিংয়ের শর্ত ভঙ্গসহ নানা কারণে উল্লিখিত সময়ের মধ্যে কোম্পানিগুলোর একটি বড় অংশই ‘জেড’ গ্রুপে নেমে এসেছে। আবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) কর্তৃপক্ষ কর্তৃক কোম্পানিগুলোতে পরিচালিত পরিদর্শনে কমপক্ষে ৩৫টি কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ পাওয়া যায়। এ ছাড়া ব্যাংকিং খাতের পাঁচটি কোম্পানি ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তিনটি কোম্পানিকে ইতোমধ্যে মূলধনশূন্য ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে বাজারে বিনিয়োগ করার মতো ইন্সট্রুমেন্টের স্বল্পতা নিয়ে কারোই দ্বিমত নেই। 
দেশের পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিক চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাজারে ভালো কোম্পানি ও শেয়ারের পরিবর্তে শুধু দ্রুত মুনাফা তুলে নেয়ার হুজুগে তাড়িত হয়েই একশ্রেণীর বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষাকৃত দুর্বল এবং স্বল্প মূলধনের কোম্পানি নিয়ে অনৈতিক খেলায় মেতে উঠেছে। তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ টেক্সটাইলস খাতের একটি কোম্পানি। কোনো ধরনের মূল্যসংবেদনশীল তথ্য ছাড়াই মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ার ১২ টাকা থেকে ৫০ টাকায় লেনদেন হতে দেখা যায়। আবার সেই একই কোম্পানিটির শেয়ার মাত্র ২৯ কর্মদিবসের ব্যবধানে নেমে আসে ১১ টাকায়। এ ছাড়া শুধু স্বল্প মূলধনকে পুঁজি করেই বিবিধ খাতের একটি কোম্পানির শেয়ার বেচাকেনা হচ্ছে ৬০০ টাকার ওপরে। অথচ ভালো লভ্যাংশ ঘোষণা করা কোম্পানির শেয়ার পাত্তা পাচ্ছে না।  
এ অবস্থায় পুুঁজিবাজারে দ্রুত নতুন ও ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তির জন্য বিএসইসি’র নেয়া উদ্যোগ নিঃসন্দেহে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উৎসাহ জোগাবে। বিগত বেশ কিছুদিন ধরে বাজার বিমুখ হয়ে পড়া বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ আবার বাজারে ফিরবেন এমনটিই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এখন দেখার বিষয়, কত দ্রুত বাজারে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী হচ্ছে। 
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বেহাল অবস্থা ও আন্তর্জাতিকভাবে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধসহ নানা উপসর্গই মূলত সাম্প্রতিক সময়ে দেশের পুঁজিবাজারগুলোর স্থবিতার পেছনে বড় ভূমিকা ছিল; কিন্তু এর মধ্যেও পুঁজিবাজারকে গতিশীল করতে বর্তমান সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাসহ পুঁজিবাজারের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক বোঝাপড়া অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি যা সাম্প্রতিক সময়ে নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগ প্রমাণ করে। পুুঁজিবাজার নিয়ে বর্তমান অর্থমন্ত্রীর আগ্রহ এবং পুঁজিবাজারবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নিয়োগের মতো এই সরকারের আমলেই প্রথম ঘটে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পুঁজিবাজার নিয়ে এ ধরনের মানসিকতা আগে দেখা যায়নি। এ ছাড়া পুঁজিবাজারের বর্তমান মূল্যস্তর বিবেচনায় নিলেও এ মুহূর্তে তা বিনিয়োগের জন্য খুবই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।  
পুঁজিবাজারে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তালিকাভুক্তি কোম্পানির একটি বড় অংশই বিগত অর্থবছরের লভ্যাংশ ঘোষণা করে চলেছে। ইতামধ্যে কোম্পানিগুলোর একটি বড় অংশ লভ্যাংশ ঘোষণা শেষ করেছে। আরো বেশ কয়েকটি ভালো কোম্পানির লভ্যাংশ ঘোষণা তথা কোম্পানির পর্ষদ সভার তারিখ ঘোষণা করেছে। শুধু বাজার পরিস্থিতির কারণেই ইতোমধ্যে ভালো লভ্যাংশ ঘোষণা করা বেশ কয়েকটি কোম্পানিও বিনিয়োগকারীদের যথাযথ সাড়া পাচ্ছে না। আশা করা যায়, বাজার পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটলে ভালো কোম্পানির দিকেই ফিরে আসবেন বিনিয়োগকারীরা। 
ফরহাদ হোসেন একজন বিনিয়োগকারী যিনি একজন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও, নয়া দিগন্তকে বলেন, বর্তমান কমিশনকে নিয়ে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশের মধ্যে নেতিবাচক মানসিকতা থাকলেও তিনি মনে করেন, কমিশন এবার ভালো কিছু কাজ করেছে। তবে শুধু বিধিবিধান পুঁজিবাজারে গতি ফেরাতে পারবে না যদি কমিশন যা করতে চায় তাতে দুই স্টক এক্সচেঞ্জসহ পুঁজিবাজারের সাথে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের মধ্যে স্বচ্ছতা এবং সহযোগিতার মনোভাব না থাকে। একই সাথে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অন্তত কয়েকটি ভালো কোম্পানিকে বাজারে তালিকাভুক্ত করতে সক্ষম হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরতে সময় লাগবে না।