ফ্রান্সের দুই শহরে বিক্ষোভে নিষেধাজ্ঞা প্যারিসে কারফিউয়ের মেয়াদ বৃদ্ধি

বিবিসি
শহরের কিছু এলাকায় চলাচলে বিধিনিষেধ জারি রেখে সোমবার পর্যন্ত আংশিক কারফিউয়ের মেয়াদ বাড়াচ্ছে প্যারিস। অন্যদিকে, মার্সেই ও লিওঁ শহরে শনি ও রোববার সপ্তাহিক ছুটির সময় সব ধরনের বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ফ্রান্সের রাজধানীতে আবারো বিক্ষোভের আশঙ্কায় শনিবার ল্যুভ, ওর্সে ও পিকাসো জাদুঘরও বন্ধ থাকবে। জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় এবং স্কুলের পরিস্থিতির প্রতিবাদে গত সপ্তাহে ফ্রান্সজুড়ে বড় আকারের বিক্ষোভ হয়। তবে দাঙ্গা ও লুটপাটের কারণে সেই বিক্ষোভের মূল দাবি আড়ালে চলে যায়। ওই সহিংসতায় বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ঐতিহাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই অস্থিরতার রেশ এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি ফ্রান্স। এদিকে ফ্রান্সের শনিবারের বিক্ষোভ ও সমাবেশকে কেন্দ্র করে মার্কিন নাগরিকদের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর এবং প্যারিসে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস।
বৃহস্পতিবার প্যারিসে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘চলমান বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি ফ্রান্সে সহিংসতা ও অস্থিরতার ঘটনা ঘটেছে এবং এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। ফ্রান্সের সরকার অবৈধ বিক্ষোভ দমনে পদক্ষেপ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তবে শ্রমিক সংগঠনের মতো গোষ্ঠীগুলোর আয়োজিত সমাবেশের অনুমতি দেয়া হবে।’ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়ে যাওয়ায় বিক্ষোভ ও অস্থিরতাপূর্ণ এলাকা ফ্রান্সে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের এড়িয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
এতে আরো বলা হয়, ‘পাশাপাশি জনসমাগমপূর্ণ স্থান এবং যেখানে পুলিশের উপস্থিতি বেশি, সেসব এলাকা থেকেও দূরে থাকুন। আজ ২৪ অক্টোবর, শনিবার বিক্ষোভ আয়োজনের অনুমতি চেয়ে বেশ কয়েকটি গোষ্ঠী আবেদন করেছে। আগামিকাল ২৫ অক্টোবর, রোববার ন্যাশনাল ফুটবল লিগের (এনএফএল) খেলা দেখার বিষয়ে প্যারিসে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদেরও সতর্ক এবং আশপাশের পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন থাকার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।’
ফ্রান্সের যেসব এলাকায় পুরোপুরি বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়নি, সেখানে শনিবার কেবল অনুমোদিত শ্রমিক সংগঠনগুলোর বিক্ষোভের অনুমতির কথা জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ দিদিয়ে বের্জেই বলেছেন, গত সপ্তাহের তুলনায় এবার পুলিশের মোতায়েন ২০ শতাংশ বাড়ানো হবে। অস্থিরতার ব্যাপকতা সম্পর্কে সরকার আগে থেকে ধারণা করতে ব্যর্থ হয়েছে- এমন অভিযোগ ওঠার পর এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ফ্রান্সের বিচারবিষয়ক মন্ত্রী জেরাল্ড ডার্মানান বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, গত সপ্তাহের সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়ায় মাধ্যমে দোষী সাব্যস্ত হওয়া ২১৭ জনকে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এই সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি জানান, ফ্রান্সজুড়ে দুই হাজার ৭০০ জনকে গ্রেফতার এবং এক হাজারের বেশি ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করা হয়েছে।
লে ফিগারো পত্রিকার বরাতে তিনি বলেন, আটক ব্যক্তিদের অর্ধেকেরই অপরাধের কোনো রেকর্ড আগে ছিল না। প্যারিস পুলিশ জানিয়েছে, গত সপ্তাহের বিক্ষোভকারীরা যে প্লাস দ্য লা রিপাবলিক এলাকায় জড়ো হয়েছিলেন, সেখানে এবং লে আল শপিং এলাকায় সোমবার পর্যন্ত কারফিউ বাড়ানো হবে। রাজধানীর প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্থানীয় সময় রাত ১১টা থেকে পরদিন সকাল ৬টা পর্যন্ত এই দুই এলাকায় চলাচল নিষিদ্ধ থাকবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ ও প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লোকর্নুর নির্দেশে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
গত সপ্তাহের দাঙ্গার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে শনিবার মার্সেই শহরে গণপরিবহন চলাচল বন্ধ রাখা হবে। সেসময় ফ্রান্সের যেসব শহরে সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতা হয়েছিল, মার্সেই ছিল তার অন্যতম। সেখানে ৫০০টির বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রোউন অঞ্চলের প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শনিবার রাত ১১টা থেকে পরদিন ভোর ৫টা পর্যন্ত অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য জারি করা কারফিউ সবার ক্ষেত্রে কার্যকর করা হবে। গ্রিনিচ মান সময় অনুযায়ী, এ সময় রাত ৯টা থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত।
দক্ষিণের নিস, দক্ষিণ উপকূলের তুলোঁ, উত্তর-পশ্চিমের রুয়াঁ শহরের কেন্দ্র এবং পূর্বাঞ্চলের গ্রেনোবলেও একই ধরনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। শনিবারের জাতীয় বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিতে বৃহস্পতিবার গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা ও মন্ত্রীদের সাথে বৈঠক করেন ম্যাক্রোঁ। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘সাধারণভাবে সুপারিশ হলো, কোনো বিক্ষোভ হওয়া উচিত নয়। শ্রমিক সংগঠন হিসেবে যারা বিক্ষোভ চালিয়ে যেতে চায়, তাদের জন্য কর্তৃপক্ষ বিকল্প ব্যবস্থা করবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘যেসব বিক্ষোভ শ্রমিক সংগঠনের আয়োজনে হবে না, সম্ভব হলে সেগুলো নিষিদ্ধ করা হবে।’
ম্যাক্রোঁ বামপন্থী কট্টর গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, তারা প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটানোর উদ্দেশ্যে ‘রাজনৈতিক, এমনকি রাষ্ট্রদ্রোহমূলক কর্মকাণ্ড’ সংগঠিত করছে। গত সপ্তাহের দাঙ্গার পর বেশ কয়েকটি শহরে কারফিউ জারি করা হয়। সরকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে চায় বলে জানান ম্যাক্রোঁ। সেসময়কার বিক্ষোভের বড় একটি অংশের পেছনে ছিল ‘জিলে জন’ বা ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন। প্যারিস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই আন্দোলনের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত বেশ কয়েকটি মিছিল নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এ সপ্তাহে দক্ষিণের মার্সেই, বোর্দো, নিস ও লিওনের পাশাপাশি উত্তরের লিলসহ বিভিন্ন শহরে তরুণদের চলাচল এবং জনসমাবেশের ওপর বিভিন্ন ধরনের আংশিক কারফিউ ও বিধিনিষেধ কার্যকর ছিল। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লোকর্নু এ সপ্তাহে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, এ সপ্তাহের সম্ভাব্য অস্থিরতা মোকাবেলায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হবে। কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা তবে ফ্রান্সের সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, বড় জনসমাগম সামাল দেয়ার প্রশিক্ষণ তাদের নেই। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রতিবাদে গত ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ অংশ নেন। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের পর পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

Advertisement