পাহাড়কে অশান্ত করতে মরিয়া সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ইউপিডিএফ

এস এম মিন্টু

Advertisement

পাহাড়কে অশান্ত করতে ফের মরিয়া হয়ে উঠেছে আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠী ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। গতকাল রাঙ্গামাটির সাজেকে অবরোধের কারণে সাজেকে আটকা পড়া তিন হাজারের মতো পর্যটককে সেনাবাহিনী ও পুলিশের তৎপরতায় উদ্ধার করা হয়েছে। সড়কে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করলে সেনাবাহিনী সদস্যরা পর্যটকদের উদ্ধারের সময় অতর্কিত হামলা চালায় ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা। আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনী ও পর্যটকদের ল্য করে আনুমানিক ৩০-৪০ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে বলে আইএসপিআরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
এদিকে পাহাড়ে অস্থিরতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ইউপিডিএফ পরিকল্পিতভাবে এই ঘটনা ঘটিয়েছে বলে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ উঠেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এখনই পাহাড়কে সুরক্ষিত করা না হলে এই সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর তৎপরতা আরো বাড়বে। পাশের দেশ থেকে আনা ভারী আগ্নেয়াস্ত্র আনা-নেয়া থামাতে না পারলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ নিবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। 
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রখ্যাত নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব:) ফজলে এলাহী আকবর গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, আমার মনে হচ্ছে, শান্তিচুক্তি হওয়ার পর আমরা কোনোভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের ওপর থেকে মনোযোগ হারিয়ে ফেলেছি। শান্তিচুক্তি করে ফেলেছি, এই ভেবে আমরা নিশ্চিন্ত হয়ে গেছি। অথচ একের পর এক ঘটনা ঘটছে এবং একই জিনিস বারবার ফিরে আসছে। সরকার যদি এটি পরিকল্পনামাফিক ঠিকভাবে মোকাবেলা না করে, তাহলে এটা দেশের জন্য বিষফোড়া হয়ে দাঁড়াবে।
তিনি বলেন, প্রথম বিষয় হলো আমাদের ক্রস বর্ডার। পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত সব দিক থেকেই উন্মুক্ত। এই খোলা সীমান্ত দিয়ে সন্ত্রাসীরা অনায়াসে আসছে যাচ্ছে। আমরা ভারতের দ্বারা চারদিকে বেষ্টিত। তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামটাই আমরা কেন খোলা রেখেছি? একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে, রাস্তা করা হচ্ছে। আমি মনে করি, পুরো পার্বত্য চট্টগ্রাম সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিতে হবে, সীমান্ত বরাবর সড়ক করতে হবে এবং বিওপি পোস্ট বসাতে হবে। এখনকার দিনে ডিজিটাল সার্ভিলেন্সের যে ব্যবস্থা আছে, সেই ক্যামেরা দিয়ে সর্বণ এসব এলাকা নজরদারিতে রাখতে হবে, যাতে কোথাও অবৈধ অনুপ্রবেশ না ঘটে।
তিনি আরো বলেন, এই অবৈধ অনুপ্রবেশ চলতে থাকলে সমস্যা বাড়বে। আমাদের আশপাশে অনেক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠী আছে। ভারতেও আছে, মিয়ানমারেও আছে। বাংলাদেশের শিথিলতার কারণে এবং এই চুক্তি করার পর আমাদের মধ্যে এক ধরনের আত্মতুষ্টি এসে গেছে। এ কারণেই এসব তৎপরতা বাড়ছে। এটা শক্ত হাতে দমন করতে হবে। আমি মনে করি, বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা-সংক্রান্ত বিশেষ মতা আইনের আওতায় বিষয়টিকে সত্যিকার অর্থে গুরুত্বের সাথে নিতে হবে।
ফজলে এলাহী আকবর মনে করেন, রাজনৈতিকভাবেও এটা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি, যদিও আমরা চুক্তি স্বার করেছি। দেখুন, এখনো তাদের মধ্যে অস্ত্র নিয়ে চলাফেরা চলছে। ১৯৯৮ সালে যে রাজনৈতিক চুক্তি, অর্থাৎ শান্তিচুক্তি হয়েছিল, সেটির বরখেলাপ হচ্ছে। এর জন্য তাদেরও দায়ী করতে হবে। শান্তিচুক্তির পরিপ্রেেিত যেসব সংগঠন, টাস্কফোর্স, কমিশন ও পরিষদ গঠিত হয়েছে এবং যারা এগুলো নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। আপনি যদি এখানে দায়িত্বে থাকেন, তাহলে আপনার একটা দায়িত্ব আছে। তাদের ওপর এই ধরনের চাপ সৃষ্টি না করলে আমরা মনে হয় এতেই সন্তুষ্ট থাকব। এটা কিন্তু আরো বড় আকার ধারণ করবে। তখন পার্বত্য চট্টগ্রাম সামলানো খুব কঠিন হয়ে পড়বে।
রাজনৈতিক দলের বিষয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিকভাবেও আমাদের সেখানে সম্পৃক্ত হতে হবে। আমাদের যতগুলো রাজনৈতিক দল আছে, তাদের অনেক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় কিছুই নেই। এই জনগোষ্ঠীকে যদি আমরা রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত করতে না পারি, তাহলে তারা বাংলাদেশের সাথে সম্পৃক্ত হবে না। আর বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি আরো উৎসাহ পাবে। আমি মনে করি, তাদের রাজনৈতিকভাবে যুক্ত করতে হবে। প্রধান দলগুলোর অঙ্গসংগঠন ও রাজনৈতিক কাঠামো সেখানে থাকতে হবে। এগুলোর অনুপস্থিতিতে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে বলে আমি মনে করি।
নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত ইউপিডিএফ ও জেএসএস ২৯৬ বার গোলাগুলিতে জড়িয়েছে। এতে ২৮ জন নিহত ও ৬০ জন আহত হয়েছেন। ওই সময়ে ২৭৮টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। গত বছর পাহাড়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বিভিন্ন খাত থেকে প্রায় হাজার কোটি টাকা চাঁদা আদায় করেছে বলে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১ জুন থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত শুধু খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন জোনে দুই পরে মধ্যে অন্তত ১২ দফা গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। এই সময়ে হত্যাকাণ্ডে অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন সেনাসদস্য ও এক শিশুসহ কয়েকজন। উদ্ধার হয়েছে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও চাঁদা আদায়ের রসিদ।
এদিকে মিয়ানমারের সীমান্তের ওপার থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে ঢুকছে অত্যাধুনিক ভারী অস্ত্রের চালান। মিয়ানমার সীমান্তের অরতি অংশ ও নাফ নদী ব্যবহার করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আরাকান আর্মির মাধ্যম রকেট লঞ্চার, একে-৪৭, হ্যান্ড গ্রেনেড এবং মাইনের মতো ভারী অস্ত্র পাচার হচ্ছে বলে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা সূত্র জানিয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পাহাড়ি যুবক ও স্থানীয় আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠী ইউপিডিএফ সদস্যরা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি (এএ) ও ভারতের মিজোরামের সশস্ত্র গোষ্ঠীর কাছ থেকে সরাসরি যুদ্ধবিধ্বংসী অস্ত্র নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে বাংলাদেশের পার্বত্যঞ্চলে নতুন করে ঘনীভূত হচ্ছে গভীর নিরাপত্তা সঙ্কট। 
ওই সূত্র জানায়, পাহাড়ের সশস্ত্র আঞ্চলিক সংগঠন ও সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই সেনাবাহিনীকে লক্ষ করে গুলি করে। মূলত এসব অবৈধ অস্ত্র-গোলাবারুদ অবৈধ পথে আনার ফলে পাহাড়কে অশান্ত করতে মরিয়া হয়ে উঠছে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো।  
এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভূরাজনীতি বিশেষজ্ঞ, ড. ইমতিয়াজ আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, আরাকান আর্মি এখন বাংলাদেশ সীমান্তের ওপারে একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা যদি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র বা জনবলের দিক থেকে মদদ দেয়, তবে তা এই অঞ্চলের ভূরাজনীতিকে আরো উত্তপ্ত করবে। সরকারকে এখনই কূটনৈতিক ও কৌশলগতভাবে এই সঙ্কট মোকাবেলায় কঠোর অবস্থান নিতে হবে। 
নিরাপত্তা, সীমান্তবিষয়ক গবেষক ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এ ধরনের ঘটনা ঘটার কথা ছিল, আমি এগুলোকে অস্বাভাবিক মনে করি না। তবে এখন যারা উসকানি দিচ্ছে, তাদের উসকানি দেয়ার কারণ আছে।
প্রথমত, শান্তিচুক্তির কোনো বাস্তবায়ন হয়নি। চুক্তির বাস্তবায়ন না হতেই আমরা পাহাড়ে আমাদের যত ক্যাম্প ছিল, সব গুটিয়ে ফেলেছি।
দ্বিতীয়ত, সেনাবাহিনী এখন ক্যান্টনমেন্টে ফিরে গেছে। আগের মতো সেখানে তাদের বিন্যাস নেই। ফলে ইউপিডিএফের শক্তি বাড়ছে। এই শক্তি কোথা থেকে বাড়ছে, তা আপনারা ভালো বলতে পারবেন। তারা ওপার থেকে সহায়তা পাচ্ছে। আগে শান্তিবাহিনী পেয়েছে, এখন ইউপিডিএফ পাচ্ছে। এটা গণ্ডগোল লাগিয়ে রাখার বিষয়, আর এই সহায়তাই তার মূল জায়গা। এখন কী করা উচিত, সে বিষয়ে আমি এটুকু বলতে পারি, সরকারের ভেবে দেখা উচিত অস্থায়ীভাবে হলেও চিহ্নিত এলাকাগুলোতে বাহিনী ক্যাম্প স্থাপন করবে কি না।
তিনি আরো বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত জটিল। দুর্গম পাহাড়ের সুযোগ নিয়ে পাশর্^বর্তী দেশের কিছু অংশ এবং ওপার থেকে অস্ত্রের যে গোপন তৎপরতা চলছে, তা দমনে যৌথ বাহিনীর চিরুনি অভিযান প্রয়োজন। পাহাড়ি তরুণেরা কেন উগ্রবাদে বা বিদেশী সশস্ত্র গোষ্ঠীতে ধাবিত হচ্ছে, সেই রিক্রুটমেন্ট চেইনটি দ্রুত ভেঙে দিতে হবে। তা না হলে দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে। 
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রিটায়ের্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) মোহাম্মদ আবদুল হক নয়া দিগন্তকে বলেন, পর্যটন মৌসুমে সেনাবাহিনীর নির্মিত সড়ক অবরোধ ও পর্যটক অপহরণকে সরকার অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র। তার দাবি, ফ্যাসিস্টদের পরো সমর্থনে ইউপিডিএফ এসব করছে; ডিপ স্টেট অর্থ ঢালছে, ভারত মিয়ানমারকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে উসকে দিচ্ছে। সীমান্তে অস্ত্র চলাচল বন্ধ, জোরালো পররাষ্ট্রনীতি ও সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানান তিনি।