
- গ্রামীণ সেতু-কালভার্ট নির্মাণ
- সাড়ে ৩ বছরের প্রকল্প এখন ৯.৫ বছরে
- খরচ বাড়ল ৫০০ কোটি টাকা
গ্রামের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত, কৃষিপণ্য পরিবহণ সহজ এবং দুর্যোগের সময় নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছনোর পথ তৈরিÑ ল্য ছিল এই প্রকল্পের একাধিক লক্ষ্য। নেয়া হয়েছিল গ্রামীণ সড়কে ছোট সেতু ও কালভার্ট নির্মাণের প্রকল্প; কিন্তু প্রকল্প শুরুর পর পেরিয়েছে প্রায় সাত বছর। এর মধ্যে সংশোধন হয়েছে দু’বার। আর এখন সামনে এসেছে তৃতীয় সংশোধনের প্রস্তাব। একই সাথে বেড়েছে প্রকল্পের মেয়াদও। সাড়ে তিন বছরের প্রকল্প এখন সাড়ে ৯ বছরে গড়াচ্ছে। ফলে গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের এই উদ্যোগে ব্যয় ও সময়ের হিসাব নতুন করে সামনে এসেছে। প্রকল্পটি যেখানে শেষ হওয়ার কথা ছিল অনেক আগেই, সেখানে সাড়ে ছয় বছরে বাস্তবে কাজ হয়েছে ৭৬.৬৪ শতাংশ।
দলিলের নথির তথ্য বলছে, প্রকল্পটির নাম ‘গ্রামীণ রাস্তায় ১৫ মিটার দৈর্ঘ্য পর্যন্ত সেতু/কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্প’। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর এর বাস্তবায়নকারী সংস্থা। প্রকল্পটি ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয়। মূল অনুমোদন অনুযায়ী ২০২২ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। পরে সংশোধিত পরিকল্পনায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সালের জুন করা হয়। দ্বিতীয় সংশোধনে সময়সীমা দাঁড়ায় ২০২৬ সালের জুন। এখন তৃতীয় সংশোধনের প্রস্তাবেও ওই সময়সীমা দেখানো হয়েছে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত। প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও বারবার সংশোধনের মধ্য দিয়ে বাস্তবায়ন পরিকল্পনার পরিবর্তনই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গ্রামীণ সড়কে সেতু-কালভার্ট নির্মাণের মাধ্যমে যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করার যে ল্য নেয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে সময় ও ব্যয়ের হিসাব কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণÑ সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।
আট বিভাগের ৫০৩টি উপজেলায়
দেশের আটটি বিভাগের ৬৪টি জেলার ৫০৩টি উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেয়া হয় ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে। এর মূল ল্য গ্রামীণ মাটির রাস্তায় সেতু ও কালভার্ট নির্মাণের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন। দুর্যোগের সময় তিগ্রস্ত মানুষকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করা। পাশাপাশি উন্নত গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষি উপকরণ পরিবহণ, কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এ ছাড়া দেশের গ্রামীণ হাটবাজার, গ্রোথ সেন্টার, শিাপ্রতিষ্ঠান ও ইউনিয়ন পরিষদের সাথে নির্মিত সড়কগুলোর সংযোগ স্থাপনের ল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্পটি শুধু সেতু বা কালভার্ট নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর মাধ্যমে গ্রামীণ জনপদের যোগাযোগ, কৃষি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে গতি আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
সাড়ে ৬ বছরে কাজের অগ্রগতি : পরিকল্পনা কমিশনের এবং প্রকল্প দলিলের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের জুন ২০২৬ পর্যন্ত সাড়ে ছয় বছরে প্রকল্পের বিপরীতে খরচ হয়েছে মোট চার হাজার ৫৬৯ কোটি ১৬ লাখ ৪১ হাজার টাকা, যা মোট বরাদ্দের আর্থিক অগ্রগতি ৬৯.৮২ শতাংশ। কাজ হয়েছে বাস্তবে ৭৬.৬৪ শথাংশ। বাকি প্রায় ২৩ শতাংশ কাজ শেষ করতে এখন দুই বছর সময় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকল্পের কাজগুলো ছিল : সংশোধিত প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, মোট ৩৯.৬৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে বেশি চার হাজার ৪০৭টি বক্স কালভার্ট নির্মাণ, ৬.৭৭৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে বেশি ৫৭১টি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ করা হবে। এখন তৃতীয় সংশোধনে এসে প্রস্তাবিত আরডিপিপিতে অতিরিক্ত ১০ কিলোমিটার সেতু/কালভার্ট অন্তর্ভুক্তকরণ এবং প্রকল্পের অবশিষ্ট কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের নিমিত্ত মেয়াদ দুই বছর বৃদ্ধি অর্থাৎ জানুয়ারি ২০১৯ থেকে জুন ২০২৮ পর্যন্ত নির্ধারণ করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
সংশোধনের পথে প্রকল্পের ব্যয় : প্রকল্পের ব্যয়ের হিসাবেও এসেছে একাধিক পরিবর্তন। নথিতে মূল অনুমোদিত ব্যয় ছয় হাজার ৫৭৮ কোটি ২০ লাখ টাকা। প্রথম সংশোধনে ব্যয় কমিয়ে ছয় হাজার ৫৪৫ কোটি ২৭ লাখ টাকায় নেয়া হয়। দ্বিতীয় সংশোধনেও ব্যয়ের অঙ্কে পরিবর্তন দেখা যায়। কমিয়ে ছয় হাজার ৫৪৪ কোটি ৪১ লাখ ৫৫ হাজার টাকায় অনুমোদন দেয়া হয়। এখন তৃতীয় সংশোধনের প্রস্তাব সামনে এসেছে। যেখানে খরচ প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে সাত হাজার ৬৭ কোটি ৭৬ লাখ ১৫ হাজার টাকায় প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি এখন রোববার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় পেশ করা হবে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্প : বর্ষাকালে পানি জমে থাকা, ছোট খাল বা জলপথের কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এবং দুর্যোগের সময় যাতায়াতে বাধার মতো সমস্যা মোকাবেলায় সেতু ও কালভার্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রকল্পের নথিতে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি ও দুর্যোগ মোকাবেলার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এর সাথে রয়েছে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের সাথে সামঞ্জস্য রেখে গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের ল্য। তবে এসব ল্য পূরণে শুধু অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা যথেষ্ট নয়। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা, ব্যয়ের হিসাব স্বচ্ছ রাখা এবং নির্মিত অবকাঠামোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করাও জরুরি। গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা থাকলেও, শেষ পর্যন্ত তার সাফল্য নির্ভর করবে নির্ধারিত অবকাঠামো কতটা বাস্তবে তৈরি হচ্ছে এবং তা গ্রামীণ মানুষের চলাচল ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কতটা সুফল আনছে, তার ওপর।
এই বর্ধিত সময়েও শেষ হওয়া নিয়ে সংশয় : পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, একাধিকবার প্রকল্প সংশোধনের অর্থ শুধু বরাদ্দের অঙ্ক বদলানো নয়, এর সাথে বাস্তবায়ন পরিকল্পনা, কাজ শেষ করার সময়সীমা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের হিসাবও জড়িয়ে থাকে। ফলে প্রকল্পের চূড়ান্ত ব্যয় কত দাঁড়াবে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ কতটা সম্পন্ন হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৯ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মেয়াদ তৃতীয় সংশোধনের প্রস্তাব অনুযায়ী ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত গড়ালে মূল সময়সীমার তুলনায় বাস্তবায়নের জন্য আরো ছয় বছর সময় যুক্ত হবে। ফলে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নÑ পরিবর্তিত সময়সীমার মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব হবে কি না এবং গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের নির্ধারিত ল্য কতটা বাস্তবায়িত হবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








