ভয়ঙ্কর সুন্দর ভিমরুলের বাসা চর হেয়ারে নতুন আকর্ষণ

 

Advertisement

সমুদ্রের ঢেউ, বিস্তীর্ণ বালুচর, লাল কাঁকড়ার ছোটাছুটি আর বনের নীরবতাÑ সব মিলিয়ে প্রকৃতির এক অপূর্ব আয়োজন পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীর চর হেয়ার। স্থানীয়ভাবে ‘মিনি কুয়াকাটা’ নামে পরিচিত এই দ্বীপে এক সাথে দেখা যায় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। তবে এবার দ্বীপটির নতুন আকর্ষণ হয়ে উঠেছে বিশাল এক ভিমরুলের বাসা। সৌন্দর্যের পাশাপাশি যা মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতির ভয়ঙ্কর রূপের কথাও।
চর হেয়ারের খেয়াঘাট থেকে প্রায় ৩০-৪০ ফুট দূরে, স্বপন বেলালের দোকানের উত্তর-পূর্ব দিকে একটি ছোট নালার পাশে গেওয়া গাছে বাসাটি তৈরি করেছে ভিমরুল। প্রায় চার ফুট লম্বা বাসাটি গাছের রঙের সাথে মিশে থাকায় দূর থেকে সহজে চোখে পড়ে না। স্থানীয় দোকানি স্বপন বেলালের ভাষ্য, ছয়-সাত মাস ধরে এখানে বাসা বেঁধেছে ভিমরুলগুলো। 
বাসাটির ওপরের অংশে বেশ কয়েকটি ভিমরুলকে পাহারারত অবস্থায় দেখা যায়। নিচের ছোট ছিদ্র দিয়ে অন্যগুলো ভেতরে ঢুকছে, আবার বেরিয়ে আসছে। দৃশ্যটি রোমাঞ্চকর হলেও এর কাছাকাছি যাওয়ায় রয়েছে বিপদের আশঙ্কা। ভিমরুলের হুলে গুরুতর অসুস্থতা, এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটতে পারে। তা মানুষ বা অন্য যেকোনো প্রাণী যে ই হোক না কেন।
নয়া দিগন্তের রাঙ্গাবালী সংবাদদাতা রফিকুল ইসলামের এক আত্মীয় কয়েক বছর আগে প্রাণ হারান এই ভিমরুলের কামড়ে। তাকে দু’টি ভিমরুল কামড়ে ছিল। মাঝে মধ্যেই বিভিন্ন এলাকা থেকে খবর আসে ভিমরুলের কামড়ে মানুষের মৃত্যুর খবর। আমারও এক আত্মীয় বেশ কয়েক বছর আগে এই ভিমরুলের কামড়ে মারা গিয়েছিল।
তবে স্বপন বেলালের অভিজ্ঞতা, কেউ বিরক্ত না করলে ভিমরুল সাধারণত আক্রমণ করে না। বাসাটির কয়েক ফুট সামনে দাঁড়িয়ে ছবি ও ভিডিও করার সময়ও তিনি আমাকে বারবার সতর্ক করেছেন, যেন আরো কাছে না যাই।
পর্যটকদের জন্য এই বাসা হতে পারে প্রকৃতির এক বিরল দৃশ্য। কিন্তু অসতর্কতা কিংবা কৌতূহলবশত কেউ ঢিল ছুড়লে বিপদ ঘটতে পারে। তাই বাসাটি ধ্বংস না করে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন এবং পর্যটকদের সচেতন করার পে স্থানীয়দের একটি অংশের মত রয়েছে। প্রকৃতিকে উপভোগ করতে গিয়ে যেন তার স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট না হয়, সে দায়িত্বও পর্যটকদের নিতে হবে।
ঝিনুকের সৌন্দর্যের আড়ালে পরিবেশের শঙ্কা
চর হেয়ারের সমুদ্রসৈকতে চোখে পড়ে আরেক বিস্ময়কর দৃশ্য। কয়েক ফুট চওড়া ও কয়েক মাইল দীর্ঘ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে আছে হাজার হাজার মৃত ঝিনুক। দূর থেকে দৃশ্যটি দৃষ্টিনন্দন হলেও এর পেছনে পরিবেশগত উদ্বেগ রয়েছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, বিপুল পরিমাণ ঝিনুকের মৃত্যু সৈকতের স্বাভাবিক পরিবেশে পরিবর্তনের ইঙ্গিত হতে পারে। তবে কেন এত ঝিনুক মারা যাচ্ছে, তা নিশ্চিত হতে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান প্রয়োজন। কুয়াকাটা সৈকতেও সম্প্রতি একই ধরনের দৃশ্য দেখা যাওয়ার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা। সামুদ্রিক পরিবেশে কোনো পরিবর্তন ঘটছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
পর্যটক বাড়ছে, বাড়ছে সুযোগ-সুবিধার চাহিদা
২০২২ সালে প্রথম চর হেয়ারে গিয়ে দেখেছিলাম নির্জন প্রকৃতির এক টুকরো স্বর্গ। তখন সেখানে কোনো দোকান ছিল না। প্রায় ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ দ্বীপটির সাড়ে তিন কিলোমিটারজুড়ে রয়েছে সমুদ্রসৈকত। সময়ের সাথে পর্যটক বেড়েছে, গড়ে উঠেছে পাঁচ-ছয়টি দোকান। রয়েছে একাধিক নলকূপ ও টয়লেটের ব্যবস্থা। কিন্তু টয়লেটগুলো ব্যবহার অনুপযোগী থাকায় পর্যটকদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
শীতের মৌসুমে এখানে হাজারো পর্যটকের আগমন ঘটে। ফলে স্থানীয় দোকানিরাও আর্থিকভাবে লাভবান হন। খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে থাকার উপযুক্ত ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। অধিকাংশ পর্যটককে দিনেই ফিরে যেতে হয়। কেউ তাঁবুতে, কেউ আবার নিজেদের সাথে আনা ট্রলারে রাত কাটান। 
রাতে তাঁবুতে থাকলে বনের নীরবতায় শোনা যায় শিয়াল, প্যাঁচা ও অন্যান্য প্রাণীর ডাক। ট্রলারে রাত কাটানোর অভিজ্ঞতাও আলাদাÑ সাগরের পানিতে দুলতে দুলতে ঘুমিয়ে পড়া। ভোরে বনের প্রাণীদের খাবারের সন্ধানে বের হওয়ার দৃশ্যও পর্যটকদের বাড়তি আনন্দ দিতে পারে।
আগের সফরগুলোতে নিজেদের রান্না করে খাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে। এখন কিছু দোকানে খাবার পাওয়া গেলেও আগেই জানিয়ে রাখতে হয়। পর্যটকদের দাবি, নিরাপদ রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা, ব্যবহারযোগ্য শৌচাগার এবং প্রয়োজনীয় মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করা হলে চর হেয়ারের আকর্ষণ আরো বাড়বে।
বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য, নাকি মাদকসেবীদের আড্ডাস্থল?
চর হেয়ারের সৌন্দর্য শুধু সমুদ্রসৈকতে সীমাবদ্ধ নয়। সাগরপাড়ে দেখা মেলে হাজার হাজার লাল কাঁকড়ার। বনে রয়েছে নানা প্রজাতির পাখি ও শিয়াল। কোথাও কোথাও দেখা যায় মহিষ ও গৃহপালিত পশু। দ্বীপটির মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে একটি খাল। খালের উত্তরাংশে পর্যটকদের আনাগোনা কম থাকায় বন্যপ্রাণীদের বিচরণত্রে হিসেবে এলাকাটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
সবুজ প্রান্তরে ঘাস খেতে দেখা যায় মহিষকে। তাদের আশপাশে খাবারের সন্ধানে ঘুরে বেড়ায় বক, মাছরাঙাসহ নানা পাখি। সন্ধ্যা নামলে শিয়ালও বের হয় খাবারের সন্ধানে। প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এসব দৃশ্য হতে পারে বিশেষ আকর্ষণ।
কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে উদ্বেগজনক কিছু চিত্র। বনের আশপাশে বিভিন্ন ধরনের নেশাজাতীয় দ্রব্যের বোতল পড়ে থাকতে দেখা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্জনতার সুযোগ নিয়ে সেখানে মাদকসেবীদের আনাগোনা বাড়ছে। এ ছাড়া খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার অভিযোগও রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড চলতে থাকলে দ্বীপটির জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ তিগ্রস্ত হতে পারে।
চর হেয়ারে নামাজের জন্য কাঠের মঞ্চে একটি ছাদ ও বেড়াবিহীন মসজিদও তৈরি হয়েছে। পর্যটকদের প্রয়োজন মেটাতে এমন উদ্যোগের পাশাপাশি পরিবেশ সংরণ, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তায় পরিকল্পিত ব্যবস্থা জরুরি।
প্রকৃতির সৌন্দর্য বাঁচিয়েই পর্যটনের বিকাশ
চর হেয়ার এখন আর শুধু জেলেদের অস্থায়ী আবাস নয়; এটি ক্রমেই পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠছে। তবে অপরিকল্পিত দোকানপাট, অপর্যাপ্ত শৌচাগার, রাত্রিযাপনের সীমাবদ্ধতা, মাদকসেবীদের আনাগোনা এবং পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ড দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপরে উচিত পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, শৌচাগার সচল রাখা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, বন্যপ্রাণীর আবাস রা করা এবং বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া। একই সাথে ভিমরুলের বাসার মতো প্রাকৃতিক আকর্ষণগুলো সংরণ করতে হবে সতর্কতার সাথে, যাতে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা বিঘিœত না হয়। চর হেয়ারের সৌন্দর্য তার স্বাভাবিক প্রকৃতিতে। সেই প্রকৃতিকে অত রেখেই যদি পর্যটনের বিকাশ ঘটানো যায়, তবে দ্বীপটি হয়ে উঠতে পারে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক গন্তব্য। ভয়ঙ্কর সুন্দর ভিমরুলের বাসা তখন শুধু রোমাঞ্চের উপকরণ হবে না, হয়ে উঠবে প্রকৃতির সাথে সহাবস্থানেরও এক শিা।