
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
বাংলাদেশের চলমান আইনশৃঙ্খলা সঙ্কটের পেছনে কী রয়েছে? এ প্রশ্নের উত্তরে বলা যায় সরকারকে অবশ্যই পুলিশ বাহিনীর ওপর জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হবে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে হবে।
২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশে রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর স্থানীয় কর্তৃত্ব দখলের লড়াই এক অন্তহীন সংঘাতের চক্র তৈরি করেছে। সরকার যেন পুলিশ বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না; আবার পুলিশ নিজেও দুর্বল এবং এই সমস্যা সমাধানের মতো নৈতিক কর্তৃত্ব তাদের নেই। সবচেয়ে বড় কথা, এই প্রক্রিয়ায় সংঘাতগুলো একে অপরকে আরো উসকে দিচ্ছে।
বিএনপি সরকারের এখনই সময় দেশের ভয়াবহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকে নজর দেয়ার। তাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত পুলিশ বাহিনীর ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ পুনরায় প্রতিষ্ঠা না করেই পুলিশের কর্তৃত্বকে পুনর্গঠন করা।
পুলিশ বাহিনীর প্রতি আস্থা তৈরি করা একটি কঠিন কাজ ছিল। পূর্ব পাকিস্তান এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত, এমনকি সাদরে গৃহীত ঔপনিবেশিক পুলিশি সংস্কৃতির কারণে শুরু থেকেই পুলিশ বাহিনীর প্রতি আস্থা ছিল সামান্যই। পরপর আসা সরকারগুলো শুরুতে পুলিশকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার চেয়ে ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে বেশি ব্যবহার করত। পুলিশ বাহিনীর মধ্যে রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং দুর্নীতিই পেশাগত উন্নতি নির্ধারণ করত। ফলে, বাংলাদেশ পুলিশ কোনোভাবেই একটি পেশাদার বাহিনী ছিল না।
২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে প্রায় ১০ হাজার বিরোধীদলীয় কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়, এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড দমনপীড়নের নিয়মিত হাতিয়ারে পরিণত হয়। জানা যায়, প্রায় ৭০৮টি গুমের ঘটনায় পুলিশ কর্তৃপক্ষ জড়িত ছিল। কেউ কেউ নারীদের কথা না শুনলে ধর্ষণের হুমকিও দিত।
হাসিনা সরকার তার বিরোধীদের দুর্বল করতে পুলিশকে ব্যবহার করত, এবং যেহেতু অনেক কর্মকর্তা সরকারের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল, তাই পদোন্নতির সিঁড়ি কঠোর পরিশ্রমের চেয়ে সরকারের প্রতি আনুগত্য এবং তার এজেন্ডা পূরণের বিষয়ে বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, ৩৪৯ জন পুলিশ কর্মকর্তা পুরস্কার পেয়েছিলেন, যার মধ্যে সরকারের সমালোচনার জন্য ফটোগ্রাফার শহিদুল আলমকে গ্রেফতার করার স্বীকৃতি পেয়েছিলেন।
এই ভাঙা ও অবিশ্বস্ত ব্যবস্থা কয়েক দিন, সপ্তাহ বা এমনকি মাসেও ঠিক করা সম্ভব নয়। হাসিনা-বিরোধী বিক্ষোভ শেষ হলে, পুরো পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় জনগণ রাস্তায় নেমে আসে।
বাংলাদেশে এমনকি নিত্যনৈমিত্তিক পুলিশি কার্যক্রমও একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে কর্মকর্তারা আগে শক্তিশালী রাজনৈতিক সমর্থনে কাজ করতেন, তারা এখন সংঘর্ষে হস্তক্ষেপ করতে গিয়ে ব্যাপক ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছেন। যদিও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার এবং থানাগুলোর কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করতে হস্তক্ষেপ করেছিল, তবুও পুলিশের ওপর আস্থা রাখা জনগণের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
পুলিশের পোশাকের রঙ এবং পুলিশ বাহিনীর লোগো দুইবার পরিবর্তন করা হয়েছিল, কিন্তু এই বাহ্যিক পরিবর্তনগুলো পুলিশ সম্পর্কে জনগণের ধারণার ওপর সামান্যই প্রভাব ফেলেছিল। এরপর পুলিশ বাহিনী পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে, ২০২৪ পরবর্তী সময়ে গঠিত পুলিশ সংস্কার কমিশনের একজন সদস্য ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’কে বলেছেন যে, পুলিশ সংস্কারের সুপারিশগুলোকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গুরুত্বের সাথে নেয়নি। তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনী সংস্কারের দিকে একটিও পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এর ফলে পুলিশ বাহিনী সম্পর্কে জনগণের ধারণার তেমন উন্নতি হয়নি। ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের এক জরিপ অনুযায়ী, ৫২ শতাংশ উত্তরদাতা পুলিশের কর্মকাণ্ডে অসন্তুষ্ট, যেখানে ৪৫ শতাংশ সন্তুষ্ট। জরিপকৃত বাংলাদেশের সব সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পুলিশ বাহিনী সর্বনিম্ন জনসমর্থন পেয়েছে।
বাংলাদেশের দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরেকটি কারণ হলো তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনশীল কাঠামো। আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে, স্থানীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব মূলত শাসক দলের সাথে সংযুক্ত অত্যন্ত সুসংগঠিত নেটওয়ার্কের মধ্যে কেন্দ্রীভূত ছিল। পরিবহন টার্মিনাল, বাজার, নির্মাণ চুক্তি, জমি এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রায়ই অভ্যন্তরীণভাবে আলোচনা ও পারস্পরিকভাবে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হতো। ফলে বিভাজন এবং পদমর্যাদার ক্রম স্পষ্ট ছিল।
আওয়ামী লীগের পতন এই ক্ষমতার কাঠামোকে ওলটপালট করে দিয়েছে। স্থানীয় ক্ষমতার বলয় থেকে আগে বাদ পড়া ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগুলো এখন সেই সব পদ ও সম্পদের দখল নিতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে, যা একসময় নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। ক্ষমতার নতুন দাবিদার হওয়ার লড়াই শুরু হয়েছে; আর স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন চাঁদাবাজি, সম্পত্তি দখল, বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং এলাকাভিত্তিক প্রভাব বিস্তারের মতো বিরোধের সাথে জড়িয়ে পড়েছে। কেবল মে মাসেই ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ রাজধানীতে ১,২৮০ জন সক্রিয় চাঁদাবাজকে শনাক্ত করেছে, যার মধ্যে ১৪৮ জন সশস্ত্র অপরাধীও রয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ৬০০টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যাতে ১৫৮ জন নিহত এবং ৭ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। এসব সংঘাতের অনেকগুলোই ছিল স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার ও অর্থনৈতিক সম্পদ দখলের লড়াই।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পরও এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা অব্যাহত রয়েছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে এইচআরএসএসের নথিবদ্ধ ১৮৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনার মধ্যে ৬৯টি ছিল বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলজনিত, আর ৯২টি ঘটনা ঘটেছে বিএনপির সদস্য ও অন্যান্য রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে। একই রাজনৈতিক দলের ভেতরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টায় লিপ্ত বিভিন্ন পক্ষ তৃণমূল পর্যায়ে সংঘাত ও সহিংসতার একটি বড় উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‘পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ’-যার উদ্দেশ্য ছিল পুলিশের ওপর তদারকি ও জবাবদিহিতা জোরদার করা- তা এখন আর কার্যকর নেই। এর অর্থ হলো, পুলিশের আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য যে আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল, তা এখন অকার্যকর হয়ে পড়েছে এবং তদারকি ব্যবস্থাগুলোও আর কার্যকর নেই। প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা না থাকলে পুলিশ আবারো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে, আর স্থানীয় সম্পদ দখলের প্রতিযোগিতা সহিংসতাকে উসকে দিতেই থাকবে।
বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে হলে কেবল পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানো বা বিচ্ছিন্নভাবে অপরাধীদের গ্রেফতার করাই যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন হবে জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা এবং স্থানীয় গোষ্ঠীগুলোকে রাজনৈতিক সংযোগ ব্যবহার করে জবরদস্তিমূলক অর্থনৈতিক ক্ষমতা গড়ে তোলা থেকে বিরত রাখা। তা না হলে, জুলাই অভ্যুত্থানে যে আইনের শাসনের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তা প্রতিষ্ঠিত না করেই, দেশটি হয়তো রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত এক ব্যবস্থার পরিবর্তে অন্য আরেকটি একই ধরনের ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








