কৃষি সম্প্রসারণের প্রকল্পে পরামর্শকের বহর
  •  এক প্রকল্পেই ৩৫ পদ, কর্মরত ২৫
  •  রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ, টেন্ডার ও ব্যবসায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ

 

Advertisement



কৃষকের উন্নয়ন ও কৃষি সম্প্রসারণের নামে নেয়া বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে গড়ে উঠেছে পরামর্শক, বিশেষজ্ঞ, কো-অর্ডিনেটর ও ফ্যাসিলিটেটরের বড় বহর। কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) অন্তত ৩১টি প্রকল্পের দাফতরিক নথি পর্যালোচনায় এসব পদে লোকবল নিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে। কোনো কোনো প্রকল্পে অনুমোদিত পরামর্শক পদের সংখ্যা ৩০ থেকে ৩৫টি পর্যন্ত। স্মলহোল্ডার অ্যাগ্রিকালচারাল কম্পিটিটিভনেস প্রজেক্টে ৩৫টি পদের বিপরীতে কর্মরত ২৫ জন। পার্টনার প্রকল্পে ১৩টি পদের সব ক’টিই পূর্ণ। বিশেষায়িত কারিগরি সহায়তার পাশাপাশি অর্থ ব্যবস্থাপনা, কেনাকাটা, প্রতিবেদন তৈরি, পরিবীক্ষণ ও মাঠপর্যায়ের সমন্বয়ের মতো কাজেও নিয়োজিত রয়েছেন একাধিক পরামর্শক। খামারবাড়ি সূত্রের দাবি, এসব পরামর্শকের বড় একটি অংশ নিয়োগ পেয়েছেন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে, যাদের অনেকে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পরও একই ধরনের বিবেচনায় নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে। একাধিক প্রকল্প পরিচালকের অভিযোগ, পরামর্শকদের কেউ কেউ প্রকল্পের কাজে মনোযোগ দেয়ার পরিবর্তে রাজনীতি, টেন্ডার প্রক্রিয়া ও ব্যবসায়িক স্বার্থে প্রভাববলয় গড়ে তুলতে ব্যস্ত। এতে ব্যাহত হচ্ছে প্রকল্পের স্বাভাবিক কার্যক্রম। বিভিন্ন খাতের উন্নয়ন প্রকল্পের এমন পরিস্থিতিতে গত ২৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) পরামর্শক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। যৌক্তিক কারণ ছাড়া প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে সময় ও অর্থ অপচয় হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনার নির্দেশও দেয়া হয়েছে। 
এক প্রকল্পেই ৩৫ পরামর্শক পদ : কৃষি সম্প্রসারণের বিভিন্ন প্রকল্পের মধ্যে স্মলহোল্ডার অ্যাগ্রিকালচারাল কম্পিটিটিভনেস প্রজেক্টের (এসএসিপি-দ্বিতীয় সংশোধিত) পরামর্শক কাঠামো অন্যতম বড়। প্রকল্পটিতে অনুমোদিত ৩৫টি পদের মধ্যে ২৫ জন কর্মরত এবং ১০টি পদ শূন্য রয়েছে। প্রকিউরমেন্ট, মনিটরিং অ্যান্ড নলেজ ম্যানেজমেন্ট, ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট এবং ক্লাইমেট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তবে এ প্রকল্পে অপেক্ষাকৃত জুনিয়র পর্যায়ের পদেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক লোকবল রয়েছে। জুনিয়র মনিটরিং অ্যান্ড রিপোর্টিং স্পেশালিস্ট পদে কর্মরত ১২ জন এবং জুনিয়র ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট স্পেশালিস্ট পদে রয়েছেন আরো ৯ জন। অর্থাৎ শুধু এ দুই ধরনের পদেই ২১ জন কর্মরত। এর বাইরে প্রকিউরমেন্ট স্পেশালিস্ট, এমঅ্যান্ডই-কেএম স্পেশালিস্ট, ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট স্পেশালিস্ট এবং ক্লাইমেট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট স্পেশালিস্ট পদেও লোকবল রয়েছে। একই প্রকল্পে সিনিয়র বিশেষজ্ঞের পাশাপাশি একাধিক জুনিয়র বিশেষজ্ঞ নিয়োগের ক্ষেত্রে দায়িত্বের বিভাজন, কাজের স্বাতন্ত্র্য এবং প্রত্যাশিত ফলাফল কতটা সুনির্দিষ্ট- তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রকল্প ব্যবস্থাপনার নিয়মিত কাজের জন্য এত বিস্তৃত পরামর্শক কাঠামো কতটা অপরিহার্য, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে। 
পার্টনারের ১৩ পদই পূর্ণ : প্রোগ্রাম অন অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনিউরশিপ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ (পার্টনার) প্রকল্পে অনুমোদিত ১৩টি পরামর্শক পদের সবকটিতেই লোকবল কর্মরত রয়েছে। এসব পদের মধ্যে মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন, ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট, প্রকিউরমেন্ট, আইসিটি, পরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা এবং জেন্ডার বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। এ ছাড়া সহকারী ফাইন্যান্স, সহকারী প্রকিউরমেন্ট ও সহকারী আইসিটি পদ রয়েছে। ডাটা অ্যানালাইসিসের জন্য নিয়োজিত রয়েছেন চারজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট। প্রকল্পটির নথিতে ডিএইর সাবেক কর্মকর্তাদেরও কয়েকটি বিশেষজ্ঞ পদে থাকার তথ্য রয়েছে। তবে তাদের নিয়োগেরপ্রক্রিয়া, যোগ্যতা ও কাজের কার্যকারিতা সম্পর্কে পৃথকভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য পাওয়া যায়নি। এ ক্ষেত্রে নিয়োগের শর্ত, দায়িত্ব এবং প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তাদের অবদান যাচাই করা প্রয়োজন। 
কক্সবাজারে ২৬ পদের ২৩ জন : কক্সবাজারে বাস্তবায়নাধীন ‘প্রো-অ্যাক্ট বাংলাদেশ : রেজিলিয়েন্স স্ট্রেনদেনিং থ্রো অ্যাগ্রি-ফুড সিস্টেম ট্রান্সফরমেশন’ প্রকল্পে অনুমোদিত ২৬টি পরামর্শক পদের মধ্যে ২৩ জন কর্মরত রয়েছেন। ইমার্জেন্সি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর ও প্রজেক্ট অপারেশনস স্পেশালিস্টের পাশাপাশি প্রোগ্রাম, যোগাযোগ, প্রকল্প সমন্বয়, ভ্যালু চেইন, বন, মৎস্য এবং এমইএএল- মনিটরিং, ইভ্যালুয়েশন, অ্যাকাউন্টেবিলিটি অ্যান্ড লার্নিং-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। এ ছাড়া তিনজন ফিল্ড ফ্যাসিলিটেটর, জুনিয়র ফাইন্যান্স অ্যান্ড অপারেশনস স্পেশালিস্ট, জুনিয়র লজিস্টিকস স্পেশালিস্ট, সিনিয়র প্রকিউরমেন্ট অ্যাসোসিয়েট, এইচআর অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং প্রোগ্রাম ও এমইএএল অ্যাসিস্ট্যান্ট পদেও লোকবল রয়েছে। 
টিএআরএপিএসের ১১ পদেই লোকবল : কৃষি রূপান্তরবিষয়ক টেকনিক্যাল অ্যাসিসট্যান্স (টিএআরএপিএস) প্রকল্পে অনুমোদিত ১১টি পরামর্শক পদের সব ক’টিতেই লোকবল কর্মরত। ই-ভাউচার, প্রকিউরমেন্ট, সিএসএ, ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট, কৃষি সহায়তা, পলিসি অ্যানালাইসিস এবং মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশনের জন্য বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। পাশাপাশি একজন সহকারী ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজার ও তিনজন জুনিয়র প্রজেক্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট কাজ করছেন। অন্যান্য প্রকল্পেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে। বিল্ডিং ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট লাইভলিহুডস প্রকল্পে কৃষি আবহাওয়া, ভ্যালু চেইন ম্যাপিং, অর্থ ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক সমন্বয়ের জন্য লোকবল রয়েছে। এ প্রকল্পে ১০ জন ফার্মারস অর্গানাইজেশন ফ্যাসিলিটেটর কাজ করছেন। ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্পে দু’জন পরামর্শক রয়েছেন। ক্ষুদ্র কৃষকদের আর্থিক ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ত্বরান্বিতকরণ (অ্যাকসেস) প্রকল্পে টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট কো-অর্ডিনেটর, ফাইন্যান্স অফিসার, ন্যাশনাল অপারেশনস অ্যাসোসিয়েট ও দু’জন ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর রয়েছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ সাসটেইনেবল রিকভারি প্রকল্পে প্রকিউরমেন্ট স্পেশালিস্ট, ফ্রিপ প্রকল্পে ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট স্পেশালিস্ট এবং মসলা প্রকল্পে ভ্যালু চেইন ও ক্রপ প্রোডাকশন বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন পদে পরামর্শক নিয়োজিত রয়েছেন। 
রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগের অভিযোগ: খামারবাড়ি সূত্রে জানা যায়, কৃষি সম্প্রসারণের বিভিন্ন প্রকল্পে নিয়োজিত পরামর্শকদের বড় একটি অংশ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ পেয়েছেন। তাদের অনেকের নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পেয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যেও অনেকে একইভাবে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পেয়েছেন বলে সূত্রটির দাবি। প্রকল্পের কাজ ছাপিয়ে টেন্ডার ও ব্যবসায় প্রভাবের অভিযোগ একাধিক প্রকল্প পরিচালক অভিযোগ করেছেন, পরামর্শকদের কেউ কেউ প্রকল্পের নির্ধারিত দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে পড়ছেন। তাদের অভিযোগ, প্রকল্পের কাজের চেয়ে টেন্ডার প্রক্রিয়া ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য প্রভাব বলয় গড়ে তোলার দিকে কারো কারো বেশি মনোযোগ রয়েছে। এতে প্রকল্পের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। 
প্রকল্প পরিচালকদের এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট পরামর্শকদের দায়িত্ব ও কাজের মূল্যায়ন, উপস্থিতি ও কার্যসম্পাদনের প্রতিবেদন, ক্রয়কার্যক্রমে তাদের ভূমিকা এবং স্বার্থের সঙ্ঘাতসংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। প্রকল্পের পরামর্শক কোনোভাবে দরপত্রের সিদ্ধান্ত, ঠিকাদার নির্বাচন কিংবা ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থে প্রভাব বিস্তার করছেন কি না, তা নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করা দরকার।
ছয় প্রকল্পে নতুন পিডি : এদিকে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে নতুন নেতৃত্ব এসেছে। সাম্প্রতিক নিয়োগ ও পদায়নে পার্টনার, টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন, মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, ক্লাইমেট স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট, কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ এবং স্মলহোল্ডার অ্যাগ্রিকালচারাল কম্পিটিটিভনেস প্রকল্পে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসেছেন।
নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা হলেন- পার্টনার প্রকল্পের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর ড. মো: সাখাওয়াত হোসেন শরীফ, টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক মো: আবুল বাসার মিয়া, মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের পরিচালক মো: মাসুদুর রহমান, ক্লাইমেট স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট প্রকল্পের পরিচালক ড. এম এম আব্দুর রাজ্জাক, কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের পরিচালক মো: জুলফিকার আলী এবং স্মলহোল্ডার অ্যাগ্রিকালচারাল কম্পিটিটিভনেস প্রজেক্টের পরিচালক মোহাম্মদ বাছিরুল আলম।