জনমত যাচাইয়ে আইপিও রুলসের সংশোধিত বিধিমালা প্রকাশ

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহের জন্য প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) ও পুনঃপ্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আরপিও) সংক্রান্ত সংশোধিত বিধিমালা জনমত যাচাইয়ের জন্য গণমাধ্যমে প্রকাশ করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
অতীতের অভিজ্ঞতা ও বর্তমান বাস্তবতাকে সামনে রেখে সংগৃহীত মূলধন ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি। প্রস্তাবিত বিধিমালা অনুযায়ী, পাবলিক অফারের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় করা যাবে। আগের কমিশন কর্তৃক করা বিধিমালায় ঋণ পরিশোধে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ ব্যয় করার সুযোগ রাখা হয়েছিল। কিন্তু অংশীজনদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে কমিশন সংশোধিত বিধিমালায় তা ৫০ শতাংশ রাখার প্রস্তাব করেছে।
গত রোববার ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (পাবলিক অফার অব ইকুইটি সিকিউরিটিজ) রুলস, ২০২৫-এর সংশোধিত খসড়া জনমত গ্রহণের জন্য প্রকাশ করেছে বিএসইসি। খসড়াটির বিষয়ে মতামত, পরামর্শ ও আপত্তি জানানোর শেষ সময় আগামী ২ নভেম্বর। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম।
প্রস্তাবিত খসড়ায় বলা হয়েছে, ঋণ পরিশোধের জন্য বরাদ্দ অর্থ নির্দিষ্ট প্রকল্প বা ব্যবসার ভারসাম্য রক্ষা, আধুনিকীকরণ, পুনর্বাসন ও সম্প্রসারণের (বিএমআরই) কাজে ব্যয় করতে হবে। ঋণের অর্থ নির্ধারিত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা নিরীক্ষকের প্রতিবেদনের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পরিশোধযোগ্য ঋণখেলাপি কিংবা পুনঃতফসিলকৃত হওয়া চলবে না। এ শর্ত পূরণের প্রমাণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অথবা প্রধান নির্বাহীর স্বাক্ষরযুক্ত প্রত্যয়নপত্র বিএসইসি ও স্টক এক্সচেঞ্জে জমা দিতে হবে।
এ ছাড়া উত্তোলিত মূলধনের ৭০ শতাংশ যৌথ উদ্যোগ, সহযোগী প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ কিংবা ব্যবসা অধিগ্রহণে ব্যয় করা যাবে। একই সাথে অর্থ ব্যবহারে পৃথক এসক্রো হিসাব খোলা, আর্থিক তথ্য যাচাই এবং নিরীক্ষিত প্রতিবেদন দাখিলের বাধ্যবাধকতা যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। যৌথ উদ্যোগ গঠন, সহযোগী প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ কিংবা ব্যবসা অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের ধরন ও এর সম্ভাব্য সুবিধা প্রসপেক্টাসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। পাবলিক অফারের সংগৃহীত অর্থের সম্পূর্ণ ব্যবহার শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে বিএসইসির প্যানেলভুক্ত নিরীক্ষকের মাধ্যমে নিরীক্ষিত প্রতিবেদন কমিশন ও স্টক এক্সচেঞ্জে জমা দেয়ার বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া পাবলিক অফারের অর্থ পরিচালনার জন্য তফসিলি ব্যাংকে পৃথক এসক্রো হিসাব খোলার বাধ্যবাধকতা আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। প্রসপেক্টাসে ঘোষিত উদ্দেশ্যের বাইরে ওই হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলন বা অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না।
আইপিও রুলসের সংশোধনীতে আইপিওর আবেদন জমা দেয়ার আগেই বিএসইসির প্যানেলভুক্ত নিরীক্ষকের মাধ্যমে কোম্পানির আর্থিক ও অন্যান্য তথ্য যাচাই বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। এ যাচাই কার্যক্রমে কোম্পানির আয়, পাওনা, মজুদপণ্য, ঋণ, সংশ্লিষ্ট পক্ষের সাথে লেনদেন, করসংক্রান্ত বিষয়, আইনি ঝুঁকি এবং জালিয়াতির আশঙ্কাসহ বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করতে হবে। কোম্পানির সার্বিক আর্থিক অবস্থা যাচাই প্রতিবেদন প্রসপেক্টাসের সাথে সংযুক্ত করার পাশাপাশি আবেদনপত্রের সাথেও জমা দিতে হবে।
তা ছাড়া কোম্পানির সর্বশেষ আর্থিক বছরে মূল ব্যবসা থেকে মুনাফা অর্জন এবং আইপিও আবেদনের সময় পুঞ্জীভূত লোকসান না থাকার শর্তও যুক্ত করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। তবে নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান, অন্তত ৫০০ কোটি টাকার সম্পদসম্পন্ন মূলধনসম্পন্ন কোম্পানি এবং নতুন প্রকল্পনির্ভর কোম্পানির ক্ষেত্রে কমিশন শর্তসাপেক্ষে ছাড় দিতে পারবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এসব কোম্পানিকে তালিকাভুক্তির পর সাধারণত দুই বছরের মধ্যে মুনাফায় পৌঁছানোর মতো আর্থিক পরিকল্পনা প্রকাশ করতে হবে।
আইপিওর বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে কোন কোম্পানির শেয়ারের নির্দেশক মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রেও নতুন শর্তের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ পদ্ধতিতে মূল্য নির্ধারণের জন্য অন্তত চারটি মূল্যায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। এর মধ্যে দু’টি পরম মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং বাকি দু’টি আপেক্ষিক মূল্যায়ন পদ্ধতি হতে হবে। সাধারণ বিনিয়োগকারী ও অনিবাসী বাংলাদেশীদের জন্য শেয়ারের চাহিদা বরাদ্দের তুলনায় বেশি হলে লটারির মাধ্যমে শেয়ার বণ্টন এবং স্বয়ংক্রিয় বরাদ্দব্যবস্থা চালুর প্রস্তাবও রয়েছে সংশোধিত বিধিমালায়। প্রস্তাব অনুযায়ী, লটারি ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও এর অ্যালগরিদম বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মাধ্যমে যাচাই করতে হবে।
অন্য দিকে আইপিওর মাধ্যমে নতুন শেয়ার ইস্যু এবং বিদ্যমান শেয়ার বিক্রির সমন্বিত ব্যবস্থায় কোম্পানির তালিকাভুক্তির সুযোগ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ পদ্ধতিতে আইপিওর মাধ্যমে কোম্পানিকে অন্তত ৫ শতাংশ শেয়ার ছাড়তে হবে। উদ্যোক্তা বা বিদ্যমান শেয়ারধারীদের বিক্রির জন্য প্রতিশ্রুত শেয়ারের অন্তত ২৫ শতাংশ প্রথম লেনদেনের দিন বিক্রি করতে হবে। বাকি শেয়ার পরবর্তী ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে বিক্রি করার বিধান রাখার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের বরাদ্দ পাওয়া শেয়ারের ৫০ শতাংশ প্রথম দিন থেকেই লেনদেনের জন্য উন্মুক্ত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। অবশিষ্ট শেয়ারের মধ্যে ২৫ শতাংশের ওপর ৬০ দিন এবং আরো ২৫ শতাংশের ওপর ৯০ দিনের বিক্রয়-নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখার কথা বলা হয়েছে।
কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের ধারণ করা শেয়ারের ক্ষেত্রে দুই বছরের বিক্রয়-নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের তারিখ থেকে তিন বছর অথবা তালিকাভুক্তির পর দুই বছর এই দুই সময়ের মধ্যে যেটি পরে শেষ হবে, সেই সময় পর্যন্ত শেয়ার বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। কমিশনের প্রস্তাবিত এসব সংশোধনী এখনো খসড়াপর্যায়ে রয়েছে। জনমত গ্রহণের পর প্রাপ্ত মতামত, পরামর্শ ও আপত্তি পর্যালোচনা করে বিধিমালা চূড়ান্ত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন যা পরবর্তীতে বিধিমালা আকারে গেজেটভুক্ত করা হবে।

Advertisement