মক্কা-মদিনা ছাড়া সৌদি আকাশসীমা অনিরাপদ ঘোষণা হাউছিদের

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

Advertisement

সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা ও মদিনা শহর দু’টি ছাড়া দেশটির বাকি সমস্ত আকাশসীমাকে সম্পূর্ণ ‘অনিরাপদ’ বলে ঘোষণা করেছে ইয়েমেনের হাউছি বিদ্রোহীরা। একই সাথে সৌদির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর সমস্ত তেল স্থাপনা এবং অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলো থেকে সাধারণ কর্মী ও নাগরিকদের অবিলম্বে দূরে থাকার কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছে বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি। খবর রয়টার্স, সৌদি প্রেস এজেন্সি, এএফপি ও আল জাজিরার।
হাউছিদের নিয়ন্ত্রণাধীন সংবাদ সংস্থা সাবা হাউছিদের সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, পবিত্র মক্কা ও মদিনা বাদে সমগ্র সৌদি আকাশসীমা এখন থেকে তাদের দৃষ্টিতে অনিরাপদ। এই সতর্কতা অবহেলা করলে পরবর্তীতে কোনো  ধরনের অজুহাত গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি আরামকোর শেয়ারহোল্ডারদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে হাউছি সূত্রটি বলেছে, বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি এড়ানোর স্বার্থে সময় থাকতেই যেন শেয়ারহোল্ডাররা তাদের শেয়ার বিক্রি করে দেন। 
এর আগে সৌদি আরবের নাজরান শহরের একটি আবাসিক এলাকায় অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ছয়জন সাধারণ নাগরিক আহত হওয়ার সংবাদ প্রকাশ করেছিল দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ। একই সময়ে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটও নিশ্চিত করে যে, খামিস মুশাইত শহরকে লক্ষ্য করে ছোড়া হাউছিদের দু’টি  ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তারা সফলভাবে মাঝআকাশে প্রতিহত ও ধ্বংস করেছে। চলতি অক্টোবরের শুরু থেকেই সৌদি জোট এবং হাউছি বিদ্রোহীদের মধ্যে পারস্পরিক সামরিক উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি রক্তক্ষয়ী সংঘাত নতুন রূপ নিয়েছে। হাউছিদের সামরিক সক্ষমতা চিরতরে গুঁড়িয়ে দিতে বড় পরিসরে সর্বাত্মক অভিযান চালানোর ঘোষণা দিয়েছে সৌদি জোট; অন্য দিকে এর পাল্টা জবাব হিসেবে সৌদির বিমানবন্দর ও কৌশলগত স্থাপনাগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রেখেছে হাউছি বিদ্রোহীরা।
সৌদি আরব নেতৃত্বাধীন যৌথ সামরিক জোট গতকাল মঙ্গলবার জানিয়েছে যে, দেশটির রাজধানী রিয়াদকে লক্ষ্য করে হাউছি বিদ্রোহীদের নিক্ষেপ করা একটি ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে মাঝআকাশে ধ্বংস করা হয়েছে। এর আগে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাজধানীতে সম্ভাব্য বিমান হামলার বিষয়ে জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালকি সামাজিক মাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানান, সন্ত্রাসী হাউছি মিলিশিয়াদের মাধ্যমেই রিয়াদের দিকে এই ক্ষেপণাস্ত্রটি ছোড়া হয়েছিল। 
এ দিকে ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শাবওয়া প্রদেশে সরকারি বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে হাউছিদের ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় হতাহতের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে ৫৮ জনে দাঁড়িয়েছে। এই আকস্মিক হামলায় আহত হয়েছেন আরো প্রায় দুই শতাধিক মানুষ। সরকারি বাহিনীর দায়িত্বশীল এক মুখপাত্র জানান, শাবওয়া প্রদেশের আল-আলম সামরিক প্রশিক্ষণকেন্দ্রে সোমবার সকালে যখন নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত তরুণ সেনাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছিল, ঠিক তখনই ইরান সমর্থিত হাউছিরা এই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ইয়েমেনের প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের প্রধান রাশেদ আল-আলিমি হতাহতের এই ভয়াবহ চিত্র নিশ্চিত করে বলেন, এই হামলায় প্রাণ হারানো ব্যক্তিরা প্রত্যেকেই নতুন তালিকাভুক্ত সেনাসদস্য। তিনি এই বর্বরোচিত ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে কঠোর প্রতিশোধ নেয়ার জোরালো ঘোষণা দেন।
আল-আলিমি আরো মন্তব্য করেন যে, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত সামরিক তরুণদের সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যবস্তু বানানোর মধ্য দিয়েই এটি পরিষ্কার হয়ে যায় যে হাউছি মিলিশিয়ারা কোণঠাসা ও চাপে পড়লেই কেবল এ ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রমের পথ বেছে নেয়। সানার আলজাজিরার সংবাদদাতা ইউসুফ মাওরির তথ্য অনুযায়ী, হাউছি পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে এই হামলার সম্পূর্ণ দায় স্বীকার করেছে। হাউছি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি জানান, তাদের হামলার মূল টার্গেট ছিল মূলত সৌদি সমর্থিত একটি প্রধান সামরিক ঘাঁটি, যেখানে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করছিলেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সৌদি আরব সমর্থিত সামরিক সেনারা যেখানেই অবস্থান করবে, সেখানেই এই ধরনের হামলা অব্যাহত থাকবে এবং সেগুলোকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এর বিপরীতে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী জানায়, তারা তাইজ শহরের দক্ষিণাঞ্চলীয় আল-আকরুধ, আল-শাকাব ও আল-সারারি এলাকায় হাউছিদের বিভিন্ন জমায়েত, সামরিক যানবাহন এবং অস্ত্রভাণ্ডার লক্ষ্য করে পাল্টা সাঁড়াশি হামলা চালিয়েছে। চলমান এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের কারণে সমগ্র তাইজ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ তীব্র জ্বালানি সঙ্কট ও নিত্যপণ্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
ইয়েমেনের বিশাল ভূখণ্ড বর্তমানে হাউছিদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় সেই অঞ্চলগুলো পুনরুদ্ধারের জন্য দীর্ঘদিন ধরে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সেনাবাহিনী। এই পদক্ষেপে তাদের নিয়মিত সহায়তা দিচ্ছে সৌদি আরব। এর ফলে সৌদির সাথে হাউছিদের দীর্ঘদিনের পুরনো বৈরিতা নতুন মাত্রা লাভ করেছে এবং সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি ভূখণ্ডে হাউছিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। এই বহুমুখী নিরাপত্তা সঙ্কটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে খোদ সৌদি আরবের অর্থনৈতিক পরিকল্পনাতেও। ইয়েমেনের ইরানপন্থী হাউছি মিলিশিয়াদের ক্রমবর্ধমান বিমান হামলার তীব্র আশঙ্কার মুখে দেশটির অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ প্রধান বিনিয়োগ সম্মেলন এ বছর আর অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। আয়োজক কর্তৃপক্ষ আগামী বছর পর্যন্ত এই বার্ষিক আয়োজন স্থগিত রাখার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ বা সংক্ষেপে এফআইআই নামের বিশ্বখ্যাত এই বিনিয়োগ সম্মেলন চলতি মাসের শেষের দিকে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা নির্ধারিত ছিল এবং এতে যোগ দিতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শীর্ষস্থানীয় নির্বাহীদের রিয়াদে পৌঁছানোর কথা ছিল। যদিও আয়োজকেরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যুক্ত হওয়ার বিকল্প সুযোগ রাখার চিন্তাভাবনা করেছিলেন, তবুও সার্বিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বার্ষিক এই মেগা আয়োজন স্থগিতই রাখা হয়। আজ মঙ্গলবার প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবরের নির্ধারিত এফআইআই সম্মেলন আপাতত বাতিল করা হয়েছে এবং আগামী বছর ঠিক কবে নাগাদ এই আসর বসতে পারে, সেই নির্দিষ্ট তারিখ খুব দ্রুত জানিয়ে দেয়া হবে। এফআইআই ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাহা বিনতে মিশারি আল সৌদ জানান, এই সিদ্ধান্তটি তাদের সমস্ত অংশীদার, সদস্য, সম্মানিত বক্তা এবং প্রতিনিধিদের প্রতি দায়িত্বশীলতার গভীর অঙ্গীকারেরই বাস্তব প্রতিফলন। তিনি আরো যোগ করেন, যেহেতু এটি তাদের দশম আয়োজন, তাই তারা নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন যেন এবারের আসরটি অত্যন্ত পূর্ণাঙ্গ, অসাধারণ মানের এবং স্মরণীয় হয়।
এ দিকে ইয়েমেনের হাউছি বিদ্রোহীদের ক্রমবর্ধমান ও লাগাতার হামলার মুখে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করতে সামরিক সহায়তা নাটকীয়ভাবে বাড়ানোর ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছে ব্রিটেন। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সৌদি ভূখণ্ড এবং দেশটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামোকে আকাশপথের যেকোনো সম্ভাব্য হামলা থেকে সুরক্ষিত রাখতে ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর টাইফুন যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে প্রতিরক্ষামূলক টহল ও অভিযান পরিচালনা করা হবে। তবে ব্রিটিশ সরকার স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে তাদের যুদ্ধবিমানগুলো হাউছিদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের সরাসরি আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানে অংশ নেবে না। আজ যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক সুনির্দিষ্ট বিবৃতিতে এই সামরিক সহায়তার রূপরেখা প্রকাশ করা হয়।
বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, নতুন এই সহায়তার আওতায় সৌদি আকাশসীমায় নিয়মিত প্রতিরক্ষামূলক আকাশ টহল পরিচালনার পাশাপাশি সামরিক সরঞ্জাম ও লজিস্টিকস পরিবহনে একটি এ-৪০০এম সামরিক পরিবহন বিমান সরবরাহ করবে লন্ডন। পাশাপাশি সৌদি সামরিক কর্মকর্তাদের কৌশলগত সহায়তা দিতে দক্ষ ব্রিটিশ সামরিক উপদেষ্টারাও কাজ করবেন। পাশাপাশি সৌদি আরবের সামগ্রিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করার লক্ষ্যে পূর্বে মোতায়েন করা সামরিক সরঞ্জাম ও ব্রিটিশ বিশেষজ্ঞদের সহায়তাও অব্যাহত রাখা হবে। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে সৌদি অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির প্রতিরক্ষামূলক বিমান অভিযানে আকাশে জ্বালানি সরবরাহের জন্য ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানবাহিনীর ভয়েজার ট্যাংকার বিমান দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিল লন্ডন। আজকের নতুন সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সেই সহায়তার পরিধি আরো বহুগুণ বিস্তৃত করা হলো।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং কড়া ভাষায় মন্তব্য করে বলেছেন, সৌদি আরবের ওপর হাউছিদের এই ধারাবাহিক ও নির্বিচার হামলা অত্যন্ত নিন্দনীয়। বিশেষ করে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে লক্ষ্যবস্তু করার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরো বিপজ্জনক করে তুলেছে। যুক্তরাজ্যের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলে এই ধরনের সহিংসতা বৃদ্ধি পেলে তার নেতিবাচক প্রভাব বিশ্ববাজারের পাশাপাশি খোদ ব্রিটিশ অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা পরবর্তীতে জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ব্রিটিশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। 
তা ছাড়া ইয়েমেনের চলমান গৃহযুদ্ধে গত ১ আগস্ট থেকে ১৭ অক্টোবরের মধ্যে দেশটির অভ্যন্তরে নতুন করে আড়াই লাখের বেশি মানুষ নিজ বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসঙ্ঘ। জেনেভায় জাতিসঙ্ঘের শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) মুখপাত্র ম্যাথিউ সল্টমারশ সাংবাদিকদের এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।