
গাজীপুর মহানগর প্রতিনিধি
সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের নামে সরকারি দফতরে আমন্ত্রণপত্র পৌঁছে দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি, চাহিদামতো অর্থ না পেলে কর্মকর্তাদের নানাভাবে হেনস্তা এবং পরে সংবাদ প্রকাশের হুমকি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে গাজীপুরে। এ ঘটনায় জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, সাংবাদিক পরিচয়ধারী কয়েকজনের এমন আচরণে দাফতরিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কেউ কেউ কর্মস্থল থেকে অন্যত্র বদলির কথাও ভাবছেন।
ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের অভিযোগ, গাজী মামুন নামের এক ব্যক্তি কখনো বিভিন্ন সংগঠনের সভাপতি, কখনো একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি পরিচয়ে সরকারি দফতরে যোগাযোগ করেন। বিভিন্ন উপলক্ষে তিনি তিনটি পৃথক অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে পৌঁছে দেন। প্রতিটি অনুষ্ঠানের জন্য তিনি মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন। তবে দাবি অনুযায়ী টাকা না দেয়ায় পরবর্তী সময়ে তার আচরণ আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ তাদের।
সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২০ জুন, ২০ জুলাই ও ১৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখে তিনটি পৃথক অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র ওই দফতরে পৌঁছে দেয়া হয়। প্রতিবারই অনুষ্ঠানের নামে অর্থ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর খাদ্য বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন প্রশ্নে বিব্রত করা, মানসিক চাপ সৃষ্টি এবং হুমকি দেয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।
অভিযোগ রয়েছে, গত ১৫ অক্টোবর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে অনুমতি ছাড়াই জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কক্ষে প্রবেশ করেন গাজী মামুন। সেখানে তিনি বিভিন্ন প্রশ্ন করতে থাকেন এবং গোপনে মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ করেন বলে অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বিষয়টি নজরে এলে তাকে ভিডিও ধারণ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়। এ নিয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরে তিনি কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। ঘটনাটির ভিডিও এবং এর আগে কয়েকবার দপ্তরে ‘আমন্ত্রণপত্র’ নিয়ে আসার সিসিটিভি ফুটেজ রয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
এরপর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় ও দুই কর্মকর্তাকে জড়িয়ে বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। প্রকাশিত প্রতিবেদনে ‘সাংবাদিকদের হেনস্থা’ করার অভিযোগে থানায় অভিযোগ দায়েরের কথাও উল্লেখ করা হয়। তবে ঘটনাস্থলে অন্য কোনো সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন না এবং মুঠোফোন ভাঙচুরের অভিযোগও ভিত্তিহীন বলে দাবি তাদের।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বিভিন্ন ভূঁইফোড় সংগঠন কিংবা সংবাদমাধ্যমের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ কেউ দলবদ্ধভাবে সরকারি দপ্তরে গিয়ে অর্থ দাবি করেন। দাবি অনুযায়ী টাকা না পেলে নানা প্রশ্ন, দুদক ও ঊর্ধ্বতন অফিসে অভিযোগ ও সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের চাপে রাখার চেষ্টা করা হয়। এতে স্বাভাবিক দাপ্তরিক পরিবেশ বিঘিœত হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা নিয়মিত এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছি। কতটা বিব্রতকর অবস্থায় কাজ করতে হয়, তা বাইরে থেকে বোঝানো কঠিন।’
দফতরের এক কর্মকর্তা তার কাছে থাকা দুই বান্ডিল ভিজিটিং কার্ড দেখিয়ে বলেন, বিভিন্ন পরিচয়ে যোগাযোগ করা ব্যক্তিদের কারণে তারা দীর্ঘদিন ধরে বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন। তার অভিযোগ, অনুষ্ঠান ও সংগঠনের নামে অর্থ দাবি করা হয়; টাকা না দিলে নানা ধরনের চাপ তৈরি করা হয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কর্মকর্তাদের মানসিক চাপ বাড়ছে এবং কেউ কেউ গাজীপুর থেকে অন্যত্র বদলির কথাও ভাবছেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সাংবাদিকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট পেশা। অনিয়ম-দুর্নীতি তুলে ধরা এবং সরকারি দফতরের জবাবদিহি নিশ্চিত করা সাংবাদিকদের দায়িত্ব। কিন্তু সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায় কিংবা অর্থের জন্য কাউকে হেনস্তা করা হলে তা পেশাটির মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাদের মতে, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি প্রকৃত সাংবাদিকদেরও এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন।
চাঁদা বা অর্থ দাবির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন গাজী মামুন। তার দাবি, তথ্য জানতে অফিসে গেলে কর্মকর্তারা তার সাথে দুর্ব্যবহার করেছেন। তিন মাসে
ব্যবধানে তিনটি পৃথক অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, ‘আমি কি আমন্ত্রণ জানাতে পারি না?’ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তার পূর্বপরিচিত কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা তার পূর্বপরিচিত বলেই আমন্ত্রণপত্র দিয়েছেন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








