
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর ভাটারায় পুলিশ হাউজিং-১ এলাকায় গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অভিযানে অভিজাত একটি থ্রিপ্লেক্স বাড়ি থেকে আফগান নাগরিক ও ২৬ নারীসহ ৮৫ জনকে আটক করেছে ডিএমপি পুলিশ। সেখানে ডিজে পার্টি আয়োজনের আড়ালে চলত মাদক সেবন ও অসামাজিক কার্যক্রম। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, আড়াই তলার থ্রিপ্লেক্স ওই বাড়িটিতে প্রতিনিয়ত গভীর রাতে সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করে ডিজে পার্টি, অসামাজিক কার্যকলাপ ও মাদকের অবাধ কেনাবেচা চলত।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অনলাইনে স্বল্পমেয়াদি বাড়ি ভাড়ার প্ল্যাটফর্ম ‘এয়ারবিএনবি’র সাইনবোর্ড বাড়িটির ওপরে ঝুলিয়ে কভার দেয়া হলেও এই থ্রিপ্লেক্স বাড়িতে পরিচালিত অবৈধ ডিজে পার্টি, অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং মাদক বিক্রির মোট আয়ের ৭০ শতাংশ সরাসরি চলে যেত বাড়িওয়ালা পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহিরের পকেটে। শুধু তা-ই নয়, সোমবার দিবাগত মধ্যরাত থেকে গতকাল মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত চলা অভিযানে মাদক ও আলামতসহ চক্রের মূল পরিচালক বা কো-হোস্ট আটক হওয়ার পরও তাকে থানা থেকে ছাড়িয়ে নিতে ডিবি পুলিশের কর্মকর্তাদের ফোনে তদবির চালান এই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।
সোমবার রাত ১২টার পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উত্তরা বিভাগের একটি দল অতিরিক্ত কমিশনার মো: শফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে বাড়িটি ঘেরাও করে অভিযান শুরু করে। মঙ্গলবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত টানা অভিযান চালিয়ে ভবনটির ভেতর থেকে ২৬ জন নারী ও ৫৮ জন পুরুষসহ মোট ৮৫ জনকে আটক করা হয়। আটককৃতদের মধ্যে একজন আফগানিস্তানের নাগরিকও রয়েছেন। ঘটনাস্থল থেকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, গাঁজা, দেশী-বিদেশী মদ (৫ বোতল), ক্ষতিকর সিনথেটিক ড্রাগস, ইয়াবা সেবনের আধুনিক সরঞ্জাম এবং অসামাজিক কাজে ব্যবহৃত কনডম জব্দ করে ডিবি পুলিশ।
জানা যায়, পুলিশ সদর দফতরের পার্সোনাল ম্যানেজমেন্ট-২ (মেইনটেন্যান্স অ্যান্ড রিপেয়ার) শাখায় নিয়োজিত অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহির বাড়িটির প্রকৃত মালিক। আইনি ঝামেলা ও চোখের আড়াল বজায় রাখতে তিনি আন্তর্জাতিক বুকিং সাইট ‘এয়ারবিএনবি’ ব্যবহার করে ফ্ল্যাটটি ভাড়া দেয়ার একটি আইনি অবকাঠামো খাড়া করেন।
গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির জানান, বাড়িটি পরিচালনার জন্য একজন হোস্ট ও কো-হোস্ট রাখা হয়েছিল। ডিবির হাতে আটক কো-হোস্ট মাহবুবুল আলমের মাধ্যমে পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালিত হতো।
ডিবি জানায়, এয়ারবিএনবির নামে দেখানো ভাড়া থেকে অর্জিত বা অসামাজিক কারবার থেকে আসা মোট আয়ের ৭০ শতাংশ টাকা নিয়মিত পৌঁছে দেয়া হতো অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহিরের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে। অর্থাৎ নিজের সরকারি পদের প্রভাব বজায় রেখে তিনি এই অপরাধ আস্তানার মূল সুবিধাভোগী ও নীরব অংশীদার হিসেবে কাজ করতেন। অভিযানের সময় যখন ডিবি পুলিশের দল ঘটনাস্থল থেকে কো-হোস্ট মাহবুবুল আলমসহ বিপুল মাদক জব্দ করে ও আটকের প্রক্রিয়া শুরু করে, তখন অতিরিক্ত ডিআইজি নিজের নাম ও পদ ব্যবহার করে ডিবি কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা চালান।
ডিবির একটি দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে, আটক কো-হোস্ট মাহবুবুল আলমকে যেন কোনো মামলা ছাড়া বা আলামত এড়িয়ে ছেড়ে দেয়া হয়- সেজন্য অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহির একাধিক কর্মকর্তা ও ডিবি পুলিশ দলকে টেলিফোন করে জোরালো তদবির ও সুপারিশ করেন। তবে গোয়েন্দা পুলিশের আভিযানিক দল ওই তদবিরে সাড়া না দিয়ে আটক সবাইকে কার্যালয়ে নিয়ে যায় ও আইনি প্রক্রিয়া শুরু করে।
জানা গেছে, চক্রটি সাধারণ মানুষের চোখ ফাঁকি দিতে ফেসবুক ও বিভিন্ন অনলাইন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চটকদার ব্যানার ও বিজ্ঞাপন প্রকাশ করত। সেখানে নির্দিষ্ট অংকের ফি এবং অনলাইন রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট বয়সের তরুণ-তরুণী ও উচ্চবিত্তদের ভাটারা পুলিশ হাউজিংয়ের ওই বাড়িতে ডেকে আনা হতো। প্রবেশদ্বারে মাহবুবুল আলম নিজে উপস্থিত থেকে অতিথিদের নিরাপত্তা ও মাদক সরবরাহ তদারকি করতেন।
এ বিষয়ে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার মো: শফিকুল ইসলাম জানান, পুলিশের একজন কর্মকর্তার বাড়িতে এ ধরনের অপরাধ কর্মকাণ্ড অত্যন্ত গর্হিত কাজ। বাড়িটিতে অবৈধভাবে ডিজে পার্টি পরিচালনা ও অনৈতিক কাজে ব্যবহারের সত্যতা পাওয়ায় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে এবং আটকদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।
ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত ডিআইজি (পার্সোনাল ম্যানেজমেন্ট-২) আবদুল্লাহ আল জহিরের সরকারি ও ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








