মূল্যস্ফীতির চাপে শ্রমিকের সংসার ব্যয়ের সাথে আয়ের ফারাক বিস্তর

শাহ আলম নূর

Advertisement

মাসের আয় দিয়ে মাসের খরচ মেটানো তৈরী পোশাক শিল্পের একজন শ্রমিকের জন্য এই সাধারণ হিসাবটিই এখন বড় প্রশ্ন। নির্ধারিত সময়ে বেতন পেলেও খাবার, বাড়িভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ও সন্তানের পড়াশোনার ব্যয় মেটাতে কতটা অর্থ হাতে থাকে, তার ওপর নির্ভর করছে একটি পরিবারের আর্থিক স্বস্তি। এমন পরিস্থিতিতে শিল্পের বর্তমান ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবি উঠেছে। এতে এক দিকে শ্রমিকের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা, অন্য দিকে কারখানার উৎপাদন ব্যয় বহনের সামর্থ্য- দুইয়েরই বাস্তব হিসাব সামনে চলে এসছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
২০২৩ সালের নভেম্বরে তৈরি পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর হয় ওই বছরের ১ ডিসেম্বর। আগের কাঠামোর তুলনায় বৃদ্ধির হার ছিল ৫৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। বর্তমান সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন ৬ হাজার ৭০০ টাকা। এর সাথে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত ও খাদ্য ভাতা মিলিয়ে মোট মাসিক মজুরি দাঁড়ায় ১২ হাজার ৫০০ টাকা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন এই মজুরি ৩০ হাজার টাকায় উন্নীত করার দাবি বাস্তবায়িত হলে মাসে বাড়তি দিতে হবে ১৭ হাজার ৫০০ টাকা। বর্তমান মজুরির তুলনায় বৃদ্ধি দাঁড়াবে ১৪০ শতাংশ। অর্থাৎ শ্রমিকদের দাবির পরিমাণ বর্তমান ন্যূনতম মজুরির দ্বিগুণেরও বেশি। তবে এই অঙ্ক শ্রমিকদের দাবির হিসাব; এটি মজুরি বোর্ডের সুপারিশ বা সরকারের অনুমোদিত নতুন মজুরি নয়।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মজুরি বাড়ানোর দাবির যৌক্তিকতা যাচাই করতে প্রথমেই দেখতে হবে, বর্তমান আয় দিয়ে একটি শ্রমিক পরিবারের ন্যূনতম প্রয়োজন কতটা মেটে। পরিবারের সদস্যসংখ্যা, বাসস্থানের ধরন, কর্মস্থলে যাতায়াতের দূরত্ব এবং চিকিৎসা ও শিক্ষার প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যয়ের হিসাব ভিন্ন হয়। তাই একটি নির্দিষ্ট অঙ্ককে সব শ্রমিক পরিবারের প্রকৃত ব্যয় ধরে নেয়ার সুযোগ নেই। 
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ২২ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। এই হারগুলো আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মূল্যস্তরের পরিবর্তন বোঝায়; এগুলো দিয়ে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত মোট ব্যয় বৃদ্ধির হার সরাসরি নির্ণয় করা যায় না।
এ দিকে তিন বছরে মজুরির ক্রয়ক্ষমতা কতটা পরিবর্তিত হয়েছে, তা বুঝতে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের ভোক্তা মূল্যসূচক এবং ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের সূচক তুলনা করতে হবে। সেই সাথে খাবার, বাড়িভাড়া, পরিবহন, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কারণ জাতীয় গড় মূল্যস্ফীতির সাথে একজন পোশাক শ্রমিকের পরিবারের প্রকৃত ব্যয়ের পরিবর্তন এক নাও হতে পারে। খাদ্য ও বাসস্থানে আয়ের বড় অংশ ব্যয় হয় এমন পরিবারের ওপর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
অন্য দিকে মজুরি বৃদ্ধির প্রভাব শুধু একজন শ্রমিকের বেতন বাড়ানোর হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়। একটি কারখানায় কত শ্রমিক কাজ করেন, ত
াদের কোন গ্রেডে বেতন দেয়া হয় এবং মোট মজুরি ব্যয় উৎপাদন খরচের কত অংশ এসব তথ্যের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ নির্ভর করে। সর্বনিম্ন গ্রেডের মজুরি বাড়ানোর পাশাপাশি অন্য গ্রেডগুলোর বেতনকাঠামোও সমন্বয় করতে হলে মোট ব্যয় আরো বাড়তে পারে। তবে কতটা বাড়বে, তা নির্ধারণে কারখানাভিত্তিক শ্রমিকসংখ্যা ও মজুরি কাঠামোর তথ্য প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
একই সাথে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কারখানামালিকদের আর্থিক অবস্থাও একইভাবে যাচাই করা দরকার। পোশাক রফতানি করে পাওয়া অর্থ থেকে কাঁচামাল, শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, পরিবহন, ব্যাংকঋণের সুদ, যন্ত্রপাতির অবচয়, মাননিয়ন্ত্রণ এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় মেটাতে হয়। এসব খরচ বাদ দেয়ার পর কারখানার হাতে কতটা মুনাফা থাকে, সেটিই মজুরি বৃদ্ধির আর্থিক সক্ষমতা মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
তবে সব কারখানার ব্যয় ও মুনাফার কাঠামো এক নয়। বড় রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান, মাঝারি কারখানা এবং ছোট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন দক্ষতা, অর্থায়নের সুযোগ ও ক্রেতাদের সাথে দর-কষাকষির ক্ষমতায় পার্থক্য থাকতে পারে। তাই একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাব দিয়ে পুরো শিল্পের আর্থিক সক্ষমতা নির্ধারণ করা যাবে না। বিভিন্ন আকারের কারখানার আর্থিক নথি, উৎপাদনশীলতা এবং শ্রমিকপ্রতি ব্যয়ের তুলনামূলক বিশ্লেষণ প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু নয়া দিগন্তকে বলেন, শ্রমিকদের মজুরি পর্যালোচনায় নতুন বোর্ড গঠনে বিজিএমইএর আপত্তি নেই। তবে বোর্ড গঠনের সময় নির্ধারণ সরকারের বিষয়। নতুন মজুরিকাঠামো কার্যকর করতে মালিকদের সময় প্রয়োজন হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এ দিকে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম নয়া দিগন্তকে বলেন, পোশাকশিল্প বর্তমানে কঠিন সময় পার করছে। রফতানি আদেশ কমছে, উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অথচ বিদেশী ক্রেতাদের কাছ থেকে সেই অনুপাতে দাম পাওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থায় মজুরি বাড়লে অনেক কারখানার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। 
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখানে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে পাওয়া পণ্যমূল্যের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ক্রেতারা পণ্যের মান, সরবরাহের সময়, নকশা ও বিভিন্ন মানদণ্ড নির্ধারণ করেন। এসব শর্ত পূরণে কারখানার অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে। আবার ক্রেতাদের সাথে দর-কষাকষিতে কারখানার অবস্থান ও পণ্যের ধরন অনুযায়ী রফতানি মূল্যও ভিন্ন হতে পারে। ফলে শ্রমিকের মজুরি বাড়ানোর সুযোগ কতটা, তা বুঝতে ক্রয়াদেশের মূল্য, উৎপাদন ব্যয় এবং কারখানার প্রকৃত মুনাফার হিসাব একসাথে দেখতে হবে।
তারা বলছেন, বকেয়া বেতন ও ভাতা পরিশোধের বিষয়টিও মজুরি বিতর্কের বাইরে নয়। নির্ধারিত সময়ে বেতন না পেলে শ্রমিকের আয়-ব্যয়ের হিসাব ভেঙে পড়ে। কিন্তু বকেয়া বেতনের অভিযোগ কতটা বিস্তৃত, তার নির্ভরযোগ্য চিত্র পেতে শ্রম অধিদফতর, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতর, শিল্প পুলিশ এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর তথ্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।