পরমাণু প্রযুক্তির চিকিৎসা যাচ্ছে রাজধানীর বাইরে
  •  পুরো ৫৩৫.৫৪ কোটি টাকা সরকারি কোষাগার থেকে
  •  চার বছরে ৫ মেডিক্যাল কলেজে ইনমাস স্থাপন

মরণব্যাধি ক্যান্সারসহ জটিল রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় পরমাণু প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে দেশের পাঁচটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ক্যাম্পাসে ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস (ইনমাস) স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য প্রস্তাবিত ব্যয় ৫৩৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের জন্য গড়ে ১০৭ কোটিরও বেশি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা। পুরো অর্থই জোগান দেয়ার কথা সরকারি কোষাগার থেকে। অনুমোদন পেলে আগামী ২০৩০ সালের জুনে প্রকল্পটি সমাপ্ত হবে বলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন। আগামী রোববার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য পেশ করা হবে।  
প্রকল্প দলিলের তথ্য থেকে জানা গেছে, পরমাণু প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের মাধ্যমে ১৯৬০ সাল থেকে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বাপশক) বিভিন্ন ধরনের পরমাণু চিকিৎসাসেবা প্রদান করে আসছে। এ দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন দেশের ১৩টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ক্যাম্পাসে (ঢাকা, মিটফোর্ড, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, খুলনা, ফরিদপুর, বগুড়া, সিলেট, কুমিল্লা, বরিশাল) ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস (ইনমাস) স্থাপন করা হয়েছে। আর বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেসসহ (নিনমাস) ১৪টি ইনস্টিটিউট স্থাপন করে অত্যাধুনিক পরমাণু প্রযুক্তির চিকিৎসাসেবা প্রদান করে আসছে। ইতোমধ্যে আরো সাতটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ক্যাম্পাসে (সোহরাওয়ার্দী, পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর, সাতক্ষীরা, গোপালগঞ্জ, কক্সবাজার) এবং মহাখালী বক্ষ্যব্যাধি হাসপাতাল ক্যাম্পাসে ইনমাসসহ সর্বমোট ২২টি ইনস্টিটিউট স্থাপনের মাধ্যমে রোগীদের সেবা প্রদান করা হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ৩৭টি মেডিক্যাল কলেজ বিদ্যমান। উল্লিখিত ৩৭টি মেডিক্যাল কলেজের মধ্যে ২২টি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল ক্যাম্পাসে ২২টি ইনমাসের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের পরমাণু চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার ভৌগলিক অবস্থান, জনসংখ্যা এবং স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত বিষয়গুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় পর্যায়ক্রমে অন্যান্য মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল ক্যাম্পাসে ইনমাস স্থাপন করা আবশ্যক।
পাঁচ জেলায় নতুন ইনমাস
প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় পাঁচটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ক্যাম্পাসে নতুন করে ইনমাস স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। সেগুলো হলো- সুনামগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নোয়াখালী, পটুয়াখালী ও কিশোরগঞ্জ। প্রকল্পের এলাকা-হিসেবে সুনামগঞ্জকে সিলেট বিভাগের, টাঙ্গাইলকে ঢাকা বিভাগের, নোয়াখালীকে চট্টগ্রাম বিভাগের, পটুয়াখালীকে বরিশাল বিভাগের এবং কিশোরগঞ্জকে ঢাকা বিভাগের অন্তর্ভুক্ত দেখানো হয়েছে।
প্রকল্পের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা ও স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত প্রয়োজন বিবেচনা করে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল ক্যাম্পাসেও ইনমাস স্থাপন করা প্রয়োজন। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে বেছে নেয়া হয়েছে। 
কী কী পরিষেবা মিলবে?
প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য থাইরয়েড, কিডনি, লিভার, হৃদরোগ এবং বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারসহ জটিল রোগের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নির্ণয় ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি, পরমাণু চিকিৎসাবিজ্ঞানে গবেষণা এবং বিশেষজ্ঞ জনবল তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রকল্পের উদ্দেশ্য হিসেবে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। প্রথমত. পরমাণু প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নিউক্লিয়ার মেডিসিনের মাধ্যমে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা পরিষেবা সম্প্রসারণ। দ্বিতীয়ত. দেশের সাধারণ ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের দোরগোড়ায় আধুনিক, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেয়া। তৃতীয়ত. চিকিৎসাবিজ্ঞানে গবেষণা এবং বিশেষজ্ঞ জনবল তৈরি করা।
প্রকল্পের কাজের ক্ষেত্র
প্রস্তাবিত প্রকল্পের প্রধান কাজের মধ্যে রয়েছে ইনমাস ভবন নির্মাণ, নিউক্লিয়ার মেডিসিন পরিষেবা চালুর জন্য স্থানীয় ও বিদেশী যন্ত্রপাতি কেনা, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানবসম্পদের উন্নয়ন, যানবাহন সংগ্রহ, জনবল নিয়োগ ও আসবাবপত্র কেনা। অর্থাৎ শুধু ভবন নির্মাণ নয়, যন্ত্রপাতি সংগ্রহ থেকে শুরু করে পরিষেবা চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও আনুষঙ্গিক ব্যবস্থাও এই প্রকল্পের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
পুরো অর্থ সরকারি কোষাগার থেকে
প্রকল্পের দলিলের তথ্য বলছে, মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩৫ কোটি ৫৪ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। এর মধ্যে পুরো অর্থই সরকারি অর্থায়নে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে কাজ শুরু করে ২০৩০ সালের জুনে শেষ করার লক্ষ্য নেয়া হয়েছে। সেই হিসাবে চার বছরে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে পরমাণু চিকিৎসার পরিকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীকেন্দ্রিক চিকিৎসার চাপ অনেকটাই কমে আসবে। ঢাকার বাইরে দেশের মানুষগুলো সহজে এই জটিল রোগের চিকিৎসা পাবে। প্রকল্পের যুক্তি, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরমাণু চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারিত হলে রোগীদের উন্নত রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য দূরের প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমবে। বিশেষত ক্যান্সার এবং থাইরয়েড, কিডনি ও লিভারের মতো রোগের ক্ষেত্রে আধুনিক রোগ নির্ণয় পরিষেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সাথে চিকিৎসা গবেষণা ও বিশেষজ্ঞ জনবল তৈরির মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যও রয়েছে।

Advertisement