
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে একদিকে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের চরম দুর্বলতা, অন্যদিকে সরকারের অভ্যন্তরীণ ব্যাংকঋণ বৃদ্ধি ও বৈদেশিক অর্থায়নে ঘাটতি এক বহুমুখী চাপের সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর ‘মেজর ইকোনমিক ইন্ডিকেটরস : মান্থলি আপডেট’ প্রতিবেদনে এই উদ্বেগের চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে নিট ২০ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। একই সময়ে নিট বৈদেশিক অর্থায়ন ঋণাত্মক দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ৩৩৯১ কোটি টাকায়। ফলে দুই মাসে সরকারের নিট ঘাটতি অর্থায়ন দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৮৪৪ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৫ শতাংশ বেশি।
অন্য দিকে, আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি সামান্য বেড়ে ৪.৭৫ শতাংশ হলেও তা ৫ শতাংশের নিচেই থমকে আছে। বিপরীতে, সেপ্টেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি আবার বেড়ে দাঁড়ায় ৮.৩৪ শতাংশে। সব মিলিয়ে উৎপাদন, বিনিয়োগ, বৈদেশিক লেনদেন ও পুঁজিবাজার- অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি প্রধান সূচকেই এখন দুর্বলতার ছাপ স্পষ্ট।
বেসরকারি খাতে স্থবিরতা, সরকারি ঋণে লাফ: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট শেষে বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৩০ হাজার ৬২ কোটি টাকা। এক বছর আগে এটি ছিল ১৭ লাখ ৪৭ হাজার ৯৫ কোটি টাকা। বার্ষিক হিসাবে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪.৭৫ শতাংশ (জুনে যা ছিল ৪.৪৮ শতাংশ)। উচ্চ সুদহার, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংকগুলোর ঋণঝুঁকি মূল্যায়নে অতিরিক্ত কঠোরতার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগ থেকে পিছিয়ে থাকছেন।
বিপরীত চিত্র সরকারি ঋণের ক্ষেত্রে। আগস্ট শেষে সরকারের নিট ব্যাংকঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ছয় লাখ ৭৭ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের (৪ লাখ ৯৬ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা) তুলনায় ৩৬.৪০ শতাংশ বেশি।
কেবল জুলাই-আগস্টেই সরকার ব্যাংক থেকে নিট ২০ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল মাত্র সাত হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা (প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৭৩ শতাংশ)। তবে সঞ্চয়পত্রসহ ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে অর্থায়ন হয়েছে পাঁচ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা, যা গত বছরের (৬ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকা) চেয়ে কম। ব্যাংকে তারল্য থাকলেও তা বেসরকারি উৎপাদনশীল খাতে না গিয়ে সরকারের ঘাটতি মেটাতে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না- তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বৈদেশিক অর্থায়ন ঋণাত্মক ও রিজার্ভের চাপ: অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সরকারের নিট বৈদেশিক অর্থায়ন মাইনাস বা ঋণাত্মক তিন হাজার ৩৯১ কোটি টাকায় নেমেছে। অর্থাৎ, নতুন বৈদেশিক ঋণ বা সহায়তার ছাড়ের চেয়ে ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে বাংলাদেশকে বেশি অর্থ দিতে হয়েছে।
বৈদেশিক খাতের অন্য সূচকগুলোতেও চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে: চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) রফতানি প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৬.৩৭ শতাংশে (গত বছর ছিল ৮.৩৫ শতাংশ)। বিপরীতে, জুলাই-আগস্টে আমদানি প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২.২০ শতাংশে। রফতানির তুলনায় আমদানি দ্রুত বাড়ায় বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে চাপ তৈরি হচ্ছে।
লেনদেন ভারসাম্য ও রিজার্ভ : জুলাই-আগস্টে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে ৯৩ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর শেষে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে দাঁড়িয়েছে ৩৬.০১ বিলিয়ন ডলারে (আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ইচগ৬ অনুযায়ী যা আরো কম)।
মূল্যস্ফীতি ও সুদের হারের অবস্থান: সেপ্টেম্বরে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৩৪ শতাংশে, যা আগস্টে ছিল ৮.২৬ শতাংশ। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির কারণেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অপরিবর্তিত বা ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে।
মূল্যস্ফীতি সামলাতে বাংলাদেশ ব্যাংক আগস্টে নীতি সুদহার (জবঢ়ড় জধঃব) ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯.৫০ শতাংশ করেছিল, যা অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। একই সাথে স্ট্যান্ডিং ল্যান্ডিং ফ্যাসিলিটি (ঝখঋ) ১১ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (ঝউঋ) ৭.৫০ শতাংশ বহাল রয়েছে।
ইন্টারব্যাংক বা আন্তঃব্যাংক বাজারে পর্যাপ্ত তারল্য থাকায় সেপ্টেম্বরে কলমানি রেট নেমে এসেছে ৮.৮১ শতাংশে। এ ছাড়া ৯১ দিন, ১৮২ দিন ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের গড় সুদহার যথাক্রমে ৮.৩৩ শতাংশ, ৮.৪৪ শতাংশ ও ৮.৫২ শতাংশে নেমে এসেছে। ব্যাংকিং খাতে আগস্টে মোট তারল্য সম্পদ বেড়ে সাত লাখ ৮১ হাজার ২১৪ কোটি টাকা হয়েছে এবং উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল তিন লাখ ৩৯ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। তবে ব্যাংকে এই বিপুল অর্থ জমা থাকা সত্ত্বেও বিনিয়োগ অনিশ্চয়তার কারণে বেসরকারি ঋণের চাকা ঘুরছে না।
রাজস্ব আদায়ে গতি ফিরলেও লক্ষ্যমাত্রায় ঘাটতি: গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর আদায় ১২.০৩ শতাংশ বেড়ে চার লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের বছর (২০২৪-২৫) ছিল মাত্র ২.২৩ শতাংশ। তবে বাজেটের পাঁচ লাখ তিন হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় হয়েছে ৮২.৬০ শতাংশ। ফলে ৮৭ হাজার ৫২৭ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি রয়ে গেছে।
অন্যান্য উৎস মিলিয়ে মোট কর রাজস্ব আদায় হয়েছে চার লাখ ২২ হাজার ২০১ কোটি টাকা। এর মধ্যে মূসক বা ভ্যাট থেকে ৩৭.৮৯ শতাংশ, আয়কর থেকে ৩৪.৪৬ শতাংশ এবং শুল্ক থেকে ৮.৫৩ শতাংশ রাজস্ব এসেছে। ব্যাংক আমানতের সুদ কমায় এবং পুঁজিবাজারে মন্দা থাকায় নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি বেড়েছে। জুলাই-আগস্টে নিট দুই হাজার ৪৬৩ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়, যা আগের বছরের চেয়ে ৫৬.৬৬ শতাংশ বেশি।
শিল্প উৎপাদন ও পুঁজিবাজারে মন্দাভাব: অর্থনীতির শ্লথগতির স্পষ্ট ছাপ পড়েছে শিল্প খাত ও পুঁজিবাজারে: শিল্প উৎপাদন: ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বৃহৎ শিল্পের উৎপাদন প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ২.২৩ শতাংশে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১৪.৫৪ শতাংশ। অর্থাৎ দেশে শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
পুঁজিবাজার: আগস্ট মাসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক (ডিএসইএক্স) ২৯৭.৫০ পয়েন্ট বা ৫.০৫ শতাংশ কমে পাঁচ হাজার ৫৯৮.০৮ পয়েন্টে নেমে আসে। একই সাথে বাজার মূলধন কমে দাঁড়ায় ছয় লাখ ৯৪ হাজার ২১৪ কোটি টাকায় এবং দৈনিক গড় লেনদেন আগের মাসের চেয়ে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হ্রাস পায়।
অর্থনীতির সার্বিক সমীকরণ ও করণীয়: বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যালোচনায় সার্বিকভাবে তিনটি প্রধান ঝুঁকি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে: ১. বেসরকারি ঋণ ও শিল্প উৎপাদনে মারাত্মক মন্দা। ২. অভ্যন্তরীণ ব্যাংকঋণের ওপর সরকারের অতিনির্ভরতা এবং বৈদেশিক নিট প্রবাহ ঋণাত্মক হওয়া। ৩. মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের উপরে থাকা এবং রফতানির তুলনায় আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক ব্যবস্থায় অলস তারল্য ফেলে না রেখে তা উৎপাদনশীল বেসরকারি খাতে প্রবাহিত করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, সরকারি ব্যয় ও ঋণে শৃঙ্খলা আনা, বৈদেশিক ঋণ ছাড় ত্বরান্বিত করা এবং রফতানি আয় বাড়ানোর সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








