বেতন ফিক্সেশনের নামে প্রাথমিক শিক্ষকদের অর্থ লোপাট

শাহেদ মতিউর রহমান

Advertisement

নতুন পে-স্কেল ঘোষণার পর প্রাথমিক শিক্ষকদের হয়রানি শুরু হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণ বা বেতন ফিক্সেশনের নামে থানা শিক্ষা অফিসের একটি চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে বড় অঙ্কের টাকা। যদিও বেতন ফিক্সেশন একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। চাকরির ধরন, যোগদানের তারিখ, পদোন্নতি, জাতীয় বেতন স্কেল কিংবা প্রাপ্য বেতন-ভাতার হিসাব অনুযায়ী এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা। কিন্তু এই কাজকে কেন্দ্র করে কোনো কোনো থানা বা উপজেলা শিক্ষা অফিসের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই, বেতন নির্ধারণের হিসাব সংশোধন কিংবা ফাইল নিষ্পত্তির কথা বলে অর্থ দাবি করা হচ্ছে- এমন অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষক ও শিক্ষা খাতের পর্যবেক্ষকেরা।
অভিযোগগুলো সত্য হলে তা শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়; সরকারি কর্মচারীদের প্রাপ্য বেতন-ভাতা নিশ্চিত করার প্রশাসনিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন সৃষ্টি করবে। তবে কোন কার্যালয়ে, কার বিরুদ্ধে এবং কী পরিমাণ অর্থ আদায়ের ঘটনা ঘটেছে  এ বিষয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুছলেন না কোনো শিক্ষক। ভুক্তভোগী শিক্ষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন ফিক্সেশনের ক্ষেত্রে সার্ভিস বুক, যোগদানের তারিখ, পদ ও বেতন স্কেল, ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি ও প্রযোজ্য সরকারি আদেশের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। এসব তথ্যের কোনো অসঙ্গতি থাকলে সংশোধন বা পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজন হতে পারে। ফলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে একাধিকবার কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে হয়। আর এই ভয়েই এবং পরবর্তী কোনো ঝামেলা এড়াতেই মূলত প্রত্যেক শিক্ষক নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও ঘুষ দিয়ে শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে এই কাজটি সুচারুভাবে করার চেষ্টা করছেন। আর এই সুযোগটিই কাজে লাগাচ্ছেন অনেক থানা শিক্ষা অফিস। 
বেশ কয়েকজন শিক্ষকের অভিযোগ, উপজেলা ও থানা শিক্ষা অফিসের ওপর এ ধরনের নির্ভরশীলতার সুযোগ নিয়ে কোথাও কোথাও কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা বা ফাইলের জটিলতা কাটানোর কথা বলে অর্থ চাওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। তবে এই  অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ধর্তব্য হবে বেতন ফিক্সেশনের আবেদন গ্রহণ থেকে চূড়ান্ত অনুমোদন পর্যন্ত কোন কর্মকর্তা কী দায়িত্ব পালন করেন, কোন ধাপে ফাইল আটকে থাকে এবং অর্থ দাবি করার অভিযোগ থাকলে তার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কিনা। অবশ্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষককে নিয়মিত পাঠদান, দাফতরিক কাজ এবং ব্যক্তিগত দায়িত্বের পাশাপাশি বেতনসংক্রান্ত জটিলতা সামলাতে হয়। বেতন নির্ধারণে ভুল হলে প্রাপ্য অর্থ পেতে দেরি হতে পারে; আবার অতিরিক্ত অর্থ দাবি করার অভিযোগ সত্য হলে শিক্ষকদের ওপর আর্থিক চাপ আরো বাড়ে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন দূরবর্তী বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকারা। 
তদন্তে যেসব বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন
অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা অফিসের বেতন ফিক্সেশনসংক্রান্ত আবেদন রেজিস্টার, নথি চলাচলের বিবরণ, নিষ্পত্তির সময়, লিখিত নির্দেশনা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশ পরীক্ষা করা প্রয়োজন। ভুক্তভোগী শিক্ষকদের লিখিত অভিযোগ, বার্তা, লেনদেনের প্রমাণ কিংবা প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যও আমলে নিয়ে অনুসন্ধান করা যেতে পারে। সংশ্লিষ্টরা জানান সরকারি দফতরে অনুমোদিত ফি থাকলে তা স্পষ্টভাবে প্রকাশ এবং অর্থ গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারি রসিদ দেয়া বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। বেতন ফিক্সেশনের জন্য কোনো অর্থ প্রযোজ্য কিনা, কোন বিধি বা আদেশের ভিত্তিতে তা নেয়া হচ্ছে- শিক্ষকদের কাছে এ তথ্য সহজলভ্য থাকা প্রয়োজন। বিধিবহির্ভূত অর্থ দাবি করা হয়ে থাকলে তা বন্ধে প্রশাসনিক তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া দরকার।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের দাবি প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন ফিক্সেশন কোনো ব্যক্তিগত অনুগ্রহ নয়; এটি বিধি অনুযায়ী সম্পন্ন করার প্রশাসনিক দায়িত্ব। তাই এ প্রক্রিয়ায় অর্থ আদায়ের অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্টদের অবস্থানও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। স্বচ্ছ আবেদনপ্রক্রিয়া, নির্দিষ্ট সময়সীমা, ডিজিটাল অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষকদের হয়রানি কমবে, পাশাপাশি সরকারি দফতরের প্রতি আস্থাও বাড়বে।
এ বিষয়ে গত ১৯ অক্টোবর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে পাবনার বেড়া উপজেলার ১১২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৭০০ শিক্ষকের কাছ থেকে পে-ফিক্সেশন ও ডেটা এন্ট্রির নামে জনপ্রতি ৩০০ টাকা দাবি করার অভিযোগ এসেছে। এর ঠিক একদিন আগে দিনাজপুরের পার্বতীপুরেও ২০৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছ থেকে জনপ্রতি ২০০-৩০০ টাকা আদায়ের চাপ দেয়ার অভিযোগ এসেছে। গতকাল মঙ্গলবার বরিশালের বেশ কয়েকটি উপজেলার কয়েকজন শিক্ষক জানিয়েছেন তাদের নিকট থেকেও একই কাজে জনপ্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা দাবি করা হয়েছে। নেত্রকোনার কলমাকান্দার এক শিক্ষক  জাননা, বেতন ফিক্সেশনের নামে শিক্ষকপ্রতি ৩০০ টাকা আদায় করা হয়েছে। আর এই অভিযোগে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের তথ্যও  ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। 
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের তদন্ত ও শৃঙ্খলা বিভাগের উপ পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো: আতাউর রহমান নয়া দিগন্তকে জানান, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে অবশ্যই এ বিষয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে শিক্ষকরা নিজেরাই যেখানে ভিকটিম সেখানে একজন শিক্ষক কিভাবে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেবে এমন প্রশ্নের জবাবে এই কর্মকর্তা বলেন, শিক্ষকদের নাম উল্লেখ না করে শুধু জেলা বা উপজেলার নাম উল্লেখ করেও যদিও কোনো তথ্য আমাদের নজরে আসে তাহলেও আমরা বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করে দেখতে পারব। আর এ সংক্রান্ত কোনো রিপোর্ট যদি কোনো মিডিয়াতে প্রকাশ বা প্রচার হয়ে থাকে তাহলে সেটাও আমাদের ডিডিইর ডিজি মহোদয়ের নজরে আনলে আমাদের ব্যবস্থা নিতে সহায়ক হবে।