
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
সব মিলিয়ে বিএনপি সরকারের প্রথম আট মাস উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বহুমুখী সঙ্কট মোকাবেলা এবং নতুন প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকার কিছু প্রাথমিক সাফল্য পেলেও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার, রাজনৈতিক সহনশীলতা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। সার্বিকভাবে সরকারের প্রথম আট মাস ও বর্তমান পরিস্থিতি একটি মিশ্র চিত্র তুলে ধরে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে এবং মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে। তার পরও মূল্যস্ফীতির ধকল সইতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। কারণ তারা বর্তমান আয় দিয়ে আগের চেয়ে কম পরিমাণ পণ্য কিনতে পারছেন। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েই চলেছে, ব্যবসায়ীরা এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে। গণপিটুনি বা সহিংসতা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় তারেক রহমান মাত্র ১১ দিন ধরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি ১৭ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতা গ্রহণ করেন আর ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে আক্রমণ চালায়। মার্চের মধ্যেই জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশকে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হয়, যা অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। উচ্চ সুদের হার, জ্বালানি সঙ্কট ও চাহিদার ঘাটতির কারণে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে সতর্কতা অবলম্বন করছেন। অন্য দিকে বাজেটের বিশাল লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব আয় কম হওয়ায় সরকারি ব্যয় নির্বাহেও টান পড়ছে।
তবে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ভারতের সাথে শেখ হাসিনার উপস্থিতি ও প্রত্যর্পণ নিয়ে সম্পর্কের জটিলতা বজায় থাকলেও চীন সরকারের সাথে মোংলা বন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নিয়ে সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রসারিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে এবং পোশাক খাতের ওপর শুল্ক চাপ কমাতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে বিশাল অঙ্কের বোয়িং বিমান ক্রয়ের চুক্তি করা হয়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে বহুত্ববাদী পরিবেশ ফেরানোর দাবি উঠলেও কিছু ক্ষেত্রে এখনো কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রয়েছে। বিরোধী দলগুলোর সাথে সরকারের নীতিগত মতবিরোধ ও সঙ্ঘাতের ঘটনা ঘটছে। সাইবার নিরাপত্তা আইন এবং মানবাধিকার কমিশন ও গুমসংক্রান্ত নতুন আইন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদিত সাংবিধানিক সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এখনো চলমান। প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের ১০ বছরের সীমা নির্ধারণের মতো সংস্কার নিয়ে আলোচনা চললেও সংসদের সংস্কার কমিটি ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে পদ্ধতির বিষয়ে অনৈক্য রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক রদবদল হলেও কাঠামোগত সংস্কারের অভাবে প্রকৃত পরিবর্তন নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় রয়ে গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশ্লেষক ড. মো: তৌহিদুল হক ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’-কে বলেন, গত দেড় বছরের তুলনায় পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি না হলেও বলা যায় না যে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে খারাপ হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশ এখনো রাজনীতিকরণমুক্ত হয়নি। এর অভ্যন্তরীণ কাঠামোও অনেকাংশে অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।
আশাব্যঞ্জক খবর দিয়েছেন বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশীরা। গত মার্চ থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে রেমিট্যান্স প্রবাহ ১৮.৯৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ১৩.১ শতাংশ বেশি। এই অর্থ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠনে সহায়তা করেছে এবং বিদেশ থেকে অর্থ গ্রহণকারী পরিবারগুলোর প্রয়োজনে সহায়ক হয়েছে। রেমিট্যান্সের এই ঊর্ধ্বগতি বিএনপি ক্ষমতায় আসার আগেই শুরু হয়েছিল।
শিল্প অর্থনীতিবিদ, নীতি বিশ্লেষক ও ‘নলেজ হাব ইনস্টিটিউট’-এর প্রেসিডেন্ট ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’-কে বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল প্রবৃদ্ধি ও ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব অর্থনৈতিক স্থবিরতার ইঙ্গিত। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়ে সরকার খুব কম আগ্রহ দেখিয়েছে। সমস্যা হলো এসব কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সরকারের প্রয়োজনীয় রাজস্ব সহায়তা নেই। খন্দকার মোয়াজ্জেম সতর্ক করে বলেন, এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা ও সেবার মানের সংস্কার না করে এত বিপুলসংখ্যক বিমান কেনা হলে তা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ঋণের বোঝা তৈরি করতে পারে, যা পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে। তিনি আরো বলেন, এমন একসময়ে নতুন নতুন ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি চাপ সৃষ্টি করছে, যখন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারগুলো এমনিতেই হিমশিম খাচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের উচ্চ ব্যয় এবং অনিশ্চিত ব্যবসায়িক পরিবেশ বেসরকারি বিনিয়োগকেও নিরুৎসাহিত করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ এম শাহান ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’-কে বলেন, আমরা এমন কিছু প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সূচনা হতে দেখছি, যা বিরোধী পক্ষ ও ভিন্নমতাবলম্বীদের দুর্বল করার কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন মনে করেন, আট মাস সময়কাল কোনো চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট নয়; তবে আওয়ামী লীগ শাসনামলের তুলনায় তিনি কিছুটা উন্নতির লক্ষণ দেখছেন। কিছু ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা দেখা গেছে। তা সত্ত্বেও আরো কঠোর পদক্ষেপ নেয়া ছাড়া তাদের সামনে অন্য কোনো বিকল্প নেই।
লিটনের মতে, রাজনৈতিক স্বাধীনতাও এখনো অনিশ্চিত। সাম্প্রতিক আইনি পরিবর্তনগুলো রাষ্ট্রীয় অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের সুরক্ষাকে আরো দুর্বল করে তুলবে কি না, সরকারকে ভেবে দেখতে হবে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং গুমের ঘটনাসংক্রান্ত নতুন আইনগুলোকে আগের আইনগুলোর তুলনায় দুর্বল বলে সমালোচনা করেন তিনি।
নির্বাচনের পরপরই সংস্কার প্যাকেজ নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দেয়। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল, যদিও তা সবসময় প্রতিশ্রুত পরিবর্তনের সমতুল্য ছিল না। আগস্ট মাসে নতুন নিয়োগের মাধ্যমে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নেতৃত্ব পুনর্বহাল করা হয়, যা ১৬৮ দিন ধরে শূন্য ছিল। এর ফলে কমিশন জমে থাকা অভিযোগ ও তদন্তের কাজ আবার শুরু করতে পারে। তবে এসব নিয়োগ প্রচলিত আইন মেনেই দেয়া হয়েছিল। ‘সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ’-এর ‘রিফর্ম ওয়াচ’ উল্লেখ করেছে যে, এর মাধ্যমে সনদে পরিকল্পিত ‘স্বাধীন নিয়োগপ্রক্রিয়া’ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কোনো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সচল করা এবং তার ওপর থেকে রাজনৈতিক প্রভাব কমানো- এই দু’টি ভিন্ন বিষয়।
এ ছাড়া নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে জড়িত ঘটনাগুলোর তদন্তের দায়িত্ব স্বাধীন কমিশনের পরিবর্তে সরকারের পছন্দমতো অন্য একটি বাহিনীর ওপর ন্যস্ত করা হয়। ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ যুক্তি দেয় যে, এটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে প্রবর্তিত সুরক্ষাব্যবস্থাকে উল্টে দিয়েছে। তারা কমিশনের সরাসরি নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ড তদন্ত করার ক্ষমতার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় সরকারি প্রভাব আবার ফিরিয়ে আনারও সমালোচনা করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শাহান বলেন, নির্বাচন আয়োজন করাটা গণতন্ত্র পুনর্গঠনের পথে কেবল প্রথম ধাপ। সরকারি ক্ষমতার ওপর নজরদারি চালানোর জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতারও প্রয়োজন রয়েছে। সরকার প্রকৃতপক্ষে কিভাবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তুলতে চায়, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা আমি দেখতে পাচ্ছি না। চূড়ান্ত কোনো মন্তব্য করার জন্য আট মাস সময়টা খুবই কম; তবে স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থাকে দুর্বল করার পদক্ষেপগুলো উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ফেব্রুয়ারির গণভোটে ভোটাররা সংস্কারের পক্ষে রায় দিলেও, বিএনপি হয়তো তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থ অনুযায়ী সংস্কারের বিষয়গুলো বেছে নেবে। তিনি সুপ্রিম কোর্টের জন্য একটি পৃথক প্রশাসনিক কার্যালয় গঠনের প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল সরকারের ওপর আদালতের নির্ভরশীলতা কমানো। অধ্যাপক শাহান বলেন, ‘আমার মনে হয়, শেষ পর্যন্ত বিএনপি তাদের নিজস্ব পছন্দ ও অগ্রাধিকার অনুযায়ীই কাজ করবে।’ (সংক্ষেপিত)
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








