
- ভীতি আর জামিনের ফাঁকে জিম্মি ভুক্তভোগীরা
- রূপ বদলালেও থামেনি চাঁদাবাজি
- দিনে হাজার কোটি টাকার সাম্রাজ্য গড়ার অভিযোগ
- রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বিস্তৃত অবৈধ আদায়
রাজধানীর পাইকারি বাজার থেকে মহাসড়ক, গণপরিবহন থেকে আবাসিক এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা-ব্যবসা-বাণিজ্য ও পরিবহন খাতের নানা স্তরে চাঁদাবাজির বিস্তারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পাইকারি বিক্রেতা, উদ্যোক্তা ও পরিবহন শ্রমিকদের অনেকের কাছে অবৈধ এ অর্থ আদায় কার্যত অলিখিত কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাঁদা না দিলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তালা লাগানো, ভাঙচুর, পণ্য খালাসে বাধা, এমনকি অগ্নিসংযোগ ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগও রয়েছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চাঁদাবাজির পুরনো কাঠামোর পরিবর্তন ঘটলেও এর অবসান হয়নি বলে অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা। কোথাও আগের প্রভাবশালী গোষ্ঠীর জায়গায় নতুন গোষ্ঠী সক্রিয় হয়েছে, কোথাও একটি সিন্ডিকেটের পরিবর্তে একাধিক পক্ষের মধ্যে চাঁদার ভাগবাঁটোয়ারা চলছে। ফলে চাঁদাবাজির ধরন ও নিয়ন্ত্রণকারী পক্ষ বদলালেও ভুক্তভোগীদের দুর্ভোগ কাটছে না।
আগুনের ভয় দেখিয়ে চাঁদা দাবি
চলতি মাসের ৬ অক্টোবর গাজীপুরের হাজী আবদুুর রহিম পাইকারি কাপড়ের মার্কেটের সাংগঠনিক সম্পাদক মিলটন হোসেনকে মোবাইল ফোনে কল করে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে পুরো মার্কেটে আগুন লাগিয়ে দেয়ার হুমকি দেয়া হয় বলে অভিযোগ।
ব্যবসায়ীকে আতঙ্কিত করতে চাঁদাবাজ ২০২২ সালের ২৫ ডিসেম্বরের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের প্রসঙ্গও তোলে। ওই অগ্নিকাণ্ডে বাজারের বিপুল পরিমাণ মালামাল পুড়ে যায়। আবার আগুন লাগলে ক্ষয়ক্ষতি আরো ভয়াবহ হবে বলে হুমকি দেয়া হয়।
মার্কেটের হাজারো ব্যবসায়ীর জীবন ও মূলধনের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে মিলটন হোসেন বিকাশের মাধ্যমে দুই দফায় পাঁচ হাজার টাকা পাঠান। বাকি টাকা দেয়ার আশ্বাস দিয়ে তিনি গোপনে বাসন থানায় মামলা করেন। পরে অভিযান চালিয়ে জুয়েল আহমেদ (২৬) নামে এক যুবককে গ্রেফতার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
আবাসিক এলাকা ও কাওরান বাজার
চাঁদাবাজির অভিযোগ কেবল বাজার কিংবা পরিবহন খাতে সীমাবদ্ধ নেই। রাজধানীর অভিজাত গুলশান আবাসিক এলাকায় গৃহস্থালি বর্জ্য অপসারণের কাজ পরিচালনা করে গুলশান সোসাইটি। অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৬ অক্টোবর ‘মাহাবুব ও রবিন গ্রুপ’ এবং ‘রুবি এন্টারপ্রাইজ’-এর পরিচয় ব্যবহার করে কয়েকজন ব্যক্তি সোসাইটির কর্মকর্তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করেন। এ সময় প্রতি মাসে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং তা না দিলে প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় পরে তিনজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আবাসিক এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো নাগরিক সেবামূলক কার্যক্রমেও এ ধরনের অবৈধ হস্তক্ষেপের অভিযোগ নগর ব্যবস্থাপনা ও জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিদিন শত শত ট্রাক ও পিকআপে শাকসবজি, মাছ, মসলা ও অন্যান্য কৃষিপণ্য আসে রাজধানীর কাওরান বাজারসহ বড় পাইকারি আড়তগুলোতে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এসব পণ্য রাজধানীতে পৌঁছানোর পরও পরিবহন ও খালাসের বিভিন্ন পর্যায়ে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়।
কাওরান বাজারের ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পণ্যবাহী ট্রাক প্রবেশের পর অন্তত দুই ধাপে অর্থ আদায় করা হয়। প্রথমে গাড়ি রাখার জন্য ২০০ থেকে ৩০০ টাকা এবং পরে পণ্য খালাসের জন্য ট্রাকপ্রতি সর্বনিম্নœ এক হাজার টাকা দিতে হয়। শেষ পর্যন্ত এ ব্যয়ের চাপ বহন করেন কৃষক, আড়তদার ও ভোক্তারা-যদিও এর প্রকৃত ভাগ কার ওপর কতটা পড়ছে, তা নির্ধারণে বিস্তারিত অনুসন্ধান প্রয়োজন।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর গবেষণায় বাজারব্যবস্থার মধ্যবর্তী স্তরে অতিরিক্ত ব্যয় ও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবের বিষয়টি উঠে এসেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কৃষক যে দামে পণ্য বিক্রি করেন, রাজধানীর খুচরা বাজারে সে পণ্য কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি হওয়ার ঘটনা প্রায়ই দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে, কৃষক পর্যায়ে ১৫ টাকায় বিক্রি হওয়া পেঁয়াজ বা বেগুন ঢাকার বাজারে ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রির কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে কৃষক ও ভোক্তার দামের এ ব্যবধানের পুরোটা চাঁদাবাজির কারণে তৈরি হয়-এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে পরিবহন ব্যয়, সংরক্ষণ, পচন, আড়ত ও খুচরা পর্যায়ের মুনাফা এবং সরবরাহের ঘাটতিসহ অন্যান্য উপাদানও বিবেচনায় নেয়া জরুরি।
ফুটপাথ থেকে বছরে হাজার কোটি টাকা
রাজধানীর ফুটপাথ ও অস্থায়ী বাজারে চাঁদাবাজির অভিযোগও দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার ফুটপাথগুলো থেকে বছরে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। এ হিসাবে দৈনিক গড় আদায়ের পরিমাণ আট কোটি টাকার বেশি।
গুলিস্তান, নিউমার্কেট, মতিঝিল, পল্টন, শাহবাগ, খিলক্ষেত, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, গুলশান, ওয়ারী ও লালবাগসহ রাজধানীর অন্তত ২৭৯টি স্থানে ফুটপাথ ও অস্থায়ী বাজারকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি সক্রিয় থাকার অভিযোগ রয়েছে। এসব এলাকায় স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ধারীদের নাম সামনে আসছে।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ফুটপাথ দখল এবং চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। সম্প্রতি এ ধরনের অভিযোগে ৭২ জনের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা দায়েরের তথ্যও রয়েছে। তবে নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান সত্ত্বেও ফুটপাথ দখল ও অবৈধ অর্থ আদায় বন্ধ না হওয়ায় হকারদের পুনর্বাসন, নির্ধারিত বিক্রয়স্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
পরিবহন খাতে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা
গোয়েন্দা তথ্য ও পরিবহন খাতের বিভিন্ন সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের প্রায় তিন হাজার স্থানে প্রতিদিন চাঁদা আদায় হয়। এসব সূত্রের একটি হিসাব অনুযায়ী, দৈনিক আদায়ের পরিমাণ সর্বনিম্ন ১০০ কোটি টাকা হতে পারে। সে হিসাবে মাসে প্রায় তিন হাজার কোটি এবং বছরে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকার চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা বিভিন্ন পরিবহন উপখাতের হিসাবও উদ্বেগজনক। রাজধানীর প্রায় আট হাজার সিটি বাস থেকে দৈনিক গড়ে ৮০০ টাকা হারে প্রায় ৬৪ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। দেশের ৬০ হাজার দূরপাল্লার বাস থেকে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ টাকা হিসাবে প্রায় তিন কোটি টাকা আদায়ের হিসাব দেয়া হয়েছে।
এ ছাড়া রাজধানীর রিকশা, অটোরিকশা, লেগুনা, টেম্পো ও পণ্যবাহী ট্রাক থেকেও বিভিন্ন নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনের হিসাবে, প্রায় চার লাখ ট্রাক থেকে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার টাকা করে আদায় করা হলে অঙ্কটি দাঁড়ায় ৪০ কোটি টাকা। ঢাকার প্রায় ১০ লাখ রিকশা থেকে দৈনিক ১৫০ টাকা করে আদায়ের হিসাব ১৫ কোটি টাকা।
তবে এসব পরিসংখ্যানের উৎস, নমুনা, হিসাবপদ্ধতি এবং একাধিক খাতের মধ্যে সম্ভাব্য পুনরাবৃত্তি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া জরুরি। যাচাই ছাড়া সব উপখাতের অঙ্ক যোগ করে জাতীয় পর্যায়ে চাঁদাবাজির মোট পরিমাণ নির্ধারণ করলে প্রকৃত চিত্র সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
তালিকায় হাজারো চাঁদাবাজ
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে তিন হাজার ৮৪৯ জন চাঁদাবাজের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর এলাকায় রয়েছে এক হাজার ২৫৪ জন। পুলিশের দাবি, তালিকাভুক্তদের প্রায় ৯০ শতাংশই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত।
এ দিকে ঢাকা মহানগর এলাকায় গোয়েন্দা সংস্থার প্রস্তুত করা ৫৪৫ জন শীর্ষ চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীর তালিকা ধরে ১ থেকে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত পরিচালিত অভিযানে প্রায় পাঁচ হাজার ব্যক্তিকে গ্রেফতারের তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রেফতার ব্যক্তিদের সবাই ওই তালিকাভুক্ত অপরাধী কি না, তা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির ১৫টি ব্যাটালিয়নের তথ্য বিশ্লেষণে সারা দেশে তিন হাজার ৫৮৬ জন চাঁদাবাজের নাম পাওয়া গেছে। জেলা হিসেবে নারায়ণগঞ্জ প্রথম এবং চট্টগ্রাম দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিভিন্ন সংস্থার তালিকায় সংখ্যার পার্থক্য থাকলেও এসব তথ্য থেকে চাঁদাবাজির বিস্তার এবং অপরাধীদের শনাক্ত করতে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়। তবে তালিকাভুক্তির মানদণ্ড, তথ্যের হালনাগাদ অবস্থা এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নেওয়া আইনি পদক্ষেপ প্রকাশ করা না হলে এসব তালিকার কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা কঠিন।
মামলা করতে ভয়, জামিনে মুক্তির শঙ্কা
আইন ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অভিযান চললেও ভুক্তভোগীদের বড় অংশ মামলা করতে ভয় পান। অভিযোগকারীর পরিচয় প্রকাশ হয়ে যাওয়া, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, পরিবারের নিরাপত্তাহীনতা এবং মামলা করার পর প্রতিশোধের আশঙ্কা তাদের পিছিয়ে দেয়।
অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ ও প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর অভাবে মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। আবার অভিযুক্ত ব্যক্তি গ্রেফতারের পর জামিনে মুক্ত হয়ে এলাকায় ফিরে এলে অভিযোগকারী নতুন করে হুমকির মুখে পড়তে পারেন-এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
এ কারণে চাঁদাবাজির অভিযোগকারী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন রাখা, নিরাপদে অনলাইনে অভিযোগ দাখিল, দ্রুত তদন্ত এবং ঝুঁঁকিতে থাকা ব্যবসায়ীদের সুরক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। পাশাপাশি সাক্ষী ও অভিযোগকারী সুরক্ষায় আইনগত কাঠামো আরও শক্তিশালী করার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস পুলিশের
ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দীন আহমদ বলেছেন, চাঁদাবাজ ও ভূমি দখলকারীরা যে পরিচয় বা অবস্থানেই থাকুক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে কোনো শিথিলতা দেখানো যাবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি ঢাকা মহানগরীর প্রতিটি এলাকায় বিট পুলিশিং কার্যক্রম আরো গতিশীল করার কথা বলেছেন।
তবে ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধেŸ ওঠে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া এবং তদন্তের অগ্রগতি প্রকাশের মতো পদক্ষেপ ছাড়া কেবল অভিযান দিয়ে চাঁদাবাজির স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
পণ্যের দামের অজুহাতও খতিয়ে দেখা দরকার
ক্যাবের সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন নয়া দিগন্তকে বলেন, পণ্য পরিবহন ও বাজারে চাঁদাবাজি যে হচ্ছে না, তা নয়; চাঁদাবাজি নিশ্চিতভাবেই হচ্ছে। তবে ব্যবসায়ীরা অনেক সময় এ চাঁদাবাজিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অস্বাভাবিক ও অযৌক্তিক দাম আদায় করেন।
তিনি বলেন, সব জায়গায় ব্যবসায়ীরা যেভাবে চাঁদাবাজির কথা বলেন, বাস্তবে তা একই মাত্রায় ঘটে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা নিজেদের সুবিধার জন্য রাজনৈতিক দল বা চাঁদাবাজদের সাথে সমঝোতা করেন এবং পরে সে ব্যয়ের কথা বলে ভোক্তাদের কাছ থেকে বাড়তি অর্থ আদায় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাজের হোসাইনের মতে, গণপরিবহনে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার কাঠামো থাকলেও পণ্য পরিবহনের ব্যয় ও ভাড়া নির্ধারণে একই ধরনের স্বচ্ছতা নেই। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় ক্রয় রসিদ চালু, পরিবহন ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ এবং সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ক্যাশলেস ব্যবস্থার প্রস্তাব
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো: মোজাম্মেল হক চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধে ক্যাশলেস ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা চালুর জন্য সড়ক পরিবহনমন্ত্রীর কাছে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
তার মতে, স্মার্ট ও নগদবিহীন লেনদেনব্যবস্থা চালু করা গেলে চাঁদাবাজি, অনিয়ম এবং পুলিশের অনৈতিক প্রভাব অনেকাংশে কমানো সম্ভব। রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন পরিবহনকেন্দ্রে নানা অজুহাত ও ভিন্ন ভিন্ন নামে অর্থ আদায়ের কারণে পরিবহন খাতে বিশৃঙ্খলা, রেষারেষি, বাকবিতণ্ডা, ঘুষ ও দুর্নীতির পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তবে নগদবিহীন লেনদেনের পাশাপাশি কোন খাতে কত টাকা বৈধভাবে আদায় করা যাবে, কারা তা আদায় করবে এবং অর্থ কোথায় জমা হবে-এসব বিষয়ে স্বচ্ছ নীতিমালা ও ডিজিটাল নজরদারি নিশ্চিত করাও জরুরি।
আড়ালের হোতারা অধরা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মো: রেজাউল করিম সোহাগ নয়া দিগন্তকে বলেন, অনেকে জনসেবার উদ্দেশ্যে রাজনীতিতে যুক্ত না হয়ে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের লক্ষ্য নিয়ে সক্রিয় হন। পরে তারা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন এবং নানা খাতে চাঁদাবাজি শুরু করেন। কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সাথে যোগসাজশের মাধ্যমে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তার মতে, সড়ক পরিবহন ও ব্যবসায়িক খাতে চাঁদাবাজির প্রবণতা বেশি। এ অপরাধ বন্ধ না হওয়ার অন্যতম কারণ হলো, মাঠপর্যায়ে অর্থ আদায়কারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলেও পেছন থেকে নির্দেশদাতা ও মূল পৃষ্ঠপোষকেরা অনেক সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান।
রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, কেবল ছোটখাটো চাঁদাবাজদের গ্রেফতার করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। আড়ালে থাকা মূল হোতা ও মদদদাতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি অভিযোগের ভিত্তি ও প্রমাণ যাচাই করে অপরাধীদের বিষয়ে তথ্য প্রকাশ এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার
চাঁদাবাজির বিস্তার রোধে নিয়মিত অভিযান ও গ্রেফতারের পাশাপাশি অর্থ আদায়ের অবৈধ নেটওয়ার্ক ভেঙে দেয়া জরুরি। পরিবহন টার্মিনাল, বাজার, ফুটপাথ, পণ্য খালাসকেন্দ্র এবং নাগরিক সেবামূলক কার্যক্রমে কারা অর্থ আদায় করছে, কী পরিচয়ে করছে এবং সে অর্থ কোথায় যাচ্ছে-তা শনাক্ত করতে সমন্বিত তদন্ত প্রয়োজন।
একই সাথে অভিযোগকারীদের নিরাপত্তা, দ্রুত বিচার, অবৈধ অর্থের উৎস ও গন্তব্য অনুসন্ধান, পরিবহন ও বাজার ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল লেনদেন এবং স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব যেন অপরাধীদের দায়মুক্তির ঢাল না হয়, তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যথায় চাঁদাবাজির পুরনো গোষ্ঠীর জায়গায় নতুন গোষ্ঠী আসবে, অভিযানে কিছু ব্যক্তি গ্রেফতার হবে, কিন্তু সড়ক থেকে আড়ত-অর্থনীতির নানা স্তরে অবৈধ অর্থ আদায়ের চক্র বহাল থেকে যাবে। এর চূড়ান্ত মূল্য দিতে হবে কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক ও সাধারণ ভোক্তাকে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








